SAHA ANTAR, Kolkata

Published:
2022-06-26 12:06:01 BdST

একের পর এক মরণঝাঁপ: অবহেলা না করে দুর্ঘটনার আগেই চিকিৎসা নিন






সংবাদ সংস্থা ও অন্তর সাহা
_______________________


একের পর এক মরণঝাঁপ চলছে। এপার বাংলা ও ওপার বাংলায় ; দুই বাংলাতেই। মর্মান্তিক সব ঘটনা ঘটছে।
কখনও করোনার সঙ্গে লড়তে লড়তে, কখনও কোলের সন্তানের মৃত্যুর পরে, কখনও আবার রোগগ্রস্ত বাবার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে ঝাঁপ। বিগত কয়েক বছরে বহুতল ভবন , বাসা বাড়ি হাসপাতাল থেকে ঝাঁপ দিয়ে মৃত্যুর ঘটনার কমতি নেই।

ঢাকায় জাপান গার্ডেন সিটির বহুতলের ছাদ থেকে মরণঝাঁপ দিয়ে কদিন আগেই মারা গেল এক তরুণি। দারোয়ান ছিল। কিন্তু তরুণীকে সে রুখতে পারে নি। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মারা গেছে অনেকে। অবহেলায় । অগোচরে। আবার মৃত্যুর সময়ে কেউ কেউ জানান দিয়ে মারা গেছে। ঢাকায় এক অভিনয়শিল্পীর শ্বশুর রীতিমত ঘন্টাব্যাপী লাইভ টেলিকাস্ট করে আত্মহত্যা করলেন। সবাই বক্তব্য এনজয় করেছে। বাঁচাতে ছুটে যায় নি কেউ।

                                   -------------------------

                  

ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ও সাইকোথেরাপি প্রধান ডা. সুলতানা এলগিন বলছেন, দুই বাংলাতেই একের পর এক অনাকাঙ্খিত মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে । আপনারা যাকে বলছেন মরণঝাঁপ বা স্বেচ্ছামৃত্যু । আমি এসবকে শুধু মরণঝাঁপ বা স্বেচ্ছামৃত্যু বলবো না। বলবো স্বজন পরিজনদের অবহেলাও।

বিশেষজ্ঞ মতামতের সবিস্তারে না গিয়েই বলবো, এখন শিক্ষিত মধ্যবিত্ত , উচ্চ বিত্ত, নিম্ন বিত্ত সব লেভেলেই মনোরোগ নিয়ে সচেতনতা অনেক বেড়েছে। অনেকেই এখন ওঝা , হুজুর , মোল্লা মৌলভী , ভন্ড সাধু তান্ত্রিকদের কাছে না গিয়ে মানসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাছে মনোরোগীদের নিয়ে আসছেন। সুস্থ হচ্ছেন।

যারা অকালে মারা গেলেন,
এই মানসিক রোগীদের যথাসময়ে মানসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাছে আনা হলে , তাদের নিয়মিত চিকিৎসা হলে এদের অকাল মৃত্যু ঘটতো না। আমরা তাদের বাঁচাতে পারতাম।

তাই সবিনয়ে বলব, আপনাদের স্বজনদের দিকে নজর রাখুন। তার মধ্যে কোন মানসিক অস্বাভাবিকতা দেখতে হাসপাতালে মানসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তারদের কাছে নিয়ে আসুন।
এদেরকে বাঁচান।

মানসিক রোগ আর দশটা রোগের মত সাধারণ রোগ। নিয়মিত চিকিৎসায় তারাও স্বাভাবিক জীবন যাপন করতে পারেন। এবং চিকিৎসা নিয়ে পারছেনও।

অনেক সময় দেখবেন , আপনার সন্তান বা স্বজন নানারকম বিচিত্র আচরণ করছে। ফেসবুকে , সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অস্বাভাবিক কোন বার্তা দিলো। অস্বাভাবিক কোন আচরণ করল। তার মন ভাল নেই , তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে বলে ঘোষণা দিল।
এগুলোকে অবহেলা করবেন না। এগুলো ফান বা মৌজ মাস্তি মনে করে পাশ কাটিয়ে যাবেন না। বলা হয়, প্রতিটি অস্বাভাবিক ঘটনার ঘটানোর আগে মনোরোগী নানা বার্তা দেয়। সেসব খেয়াল রাখুন। তার চিকিৎসা করাতে ভুলবেন না।

----------------------

 

একই প্রবণতা সেতু বা মা উড়ালপুল থেকে ঝাঁপের ক্ষেত্রেও। দিল্লিতে উঁচু মেট্রো স্টেশন থেকে এক মূক ও বধিরতরুণী ঝাঁপ দেওয়ার পরে তাঁর পকেট থেকে উদ্ধার হয় চিরকুট— ‘আমি বড় একা। একা বেঁচে থাকার চেয়ে না থাকা ভাল।’

শনিবার মল্লিকবাজারের ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্সেসের আটতলা থেকে পড়ে গিয়ে সুজিত অধিকারী নামে এক রোগীর মৃত্যুর ঘটনাতেও শোরগোল পড়েছে। সময় পেলেও কেন তাঁকে উদ্ধার করা গেল না— সেই প্রশ্ন উঠেছে। তাঁর এমন আচরণের কারণ নিয়েও আলোচনা চলেছে দিনভর। তিনি অবসাদগ্রস্ত ছিলেন কি না, তা-ও জানার চেষ্টা চলছে। পুরনো ঘটনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অবশ্য তদন্তে উঠে এসেছে এই অবসাদের দিকটিই।

এ দিনের ঘটনার সঙ্গে ২০১৯ সালের নাগেরবাজারের একটি বেসরকারি হাসপাতালের ঘটনার মিল রয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। সেখানে বছর একষট্টির এক প্রৌঢ় হাসপাতালের সাততলা থেকে ঝাঁপ দেন। তার পরেরদিনই তাঁর অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। মল্লিকবাজারের এই ঘটনায় হাসপাতাল জানিয়েছে, সুজিতবাবুকে সেখান থেকে রবিবারই ছুটি দেওয়ার কথা ছিল। চলতি বছরে আর জি করের পাঁচতলা থেকে ঝাঁপ দিয়ে মারা যান বনগাঁর বছর ষাটেকের এক প্রৌঢ়। সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর পা ভাঙে। হাসপাতালে ভর্তির পরে তাঁর ব্রেন টিউমার ধরা পড়ে। পরিবার জানিয়েছিল, এর জেরে তিনি অবসাদে ভুগছিলেন। সেবছরেই বীরভূমের রামপুরহাট হাসপাতালের ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়েছিলেন এক যুবক।

২০২১ সালে বাবার মৃত্যুর পরে হাসপাতালে গিয়ে আত্মঘাতী হন দুর্গাপুরের এক যুবক। বাবার মৃত্যুর জন্য নিজেকে দায়ী করে, দাদাকে মেসেজ পাঠিয়ে হাসপাতালের ছাদ থেকে ঝাঁপ দেন তিনি। মেধাবী ওই ছাত্রের তার কয়েক মাসের মধ্যেই বেঙ্গালুরুর একটিকলেজে পড়তে যাওয়ার কথা ছিল। ওই বছরেই শিয়ালদহের বি আর সিংহ হাসপাতালে পাঁচতলার জানলার কাচ ভেঙে পড়ে মৃত্যু হয় এক রোগীর। হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত ওই রোগী এতটাই ছটফট করছিলেন যে, কেউ তাঁকে ধরে রাখতে পারেননি। কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কর্তব্যে গাফিলতির অভিযোগ তুলে রুজু করা মামলা এখনও চলছে।

চলতি বছরে এমন মৃত্যুর ঘটনা ঘটে মা উড়ালপুলেও। ডাক্তার দেখাতে যাচ্ছেন বলে জানিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে উড়ালপুল থেকে ঝাঁপ দেন এক প্রৌঢ়। পুলিশি তদন্তে জানাযায়, কয়েক মাসের মধ্যেই তাঁর মেয়ের বিয়ে হওয়ার কথা ছিল। ব্যবসায় মন্দার জেরে আর্থিক অনটনের কারণেই ওই সিদ্ধান্ত। মেয়ের বিয়ের টাকা জোগাড়ের চাপেই তাঁর এই পদক্ষেপ কি না, সেই প্রশ্ন উত্তরহীনই রয়ে যায়।

মনোরোগ চিকিৎসক অনিরুদ্ধ দেব বলছেন, ‘‘কেউ দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভুগলে, তাঁর মাথায়বিভিন্ন ধরনের চিন্তা আসে। তাই ওই রোগের চিকিৎসার সঙ্গে তাঁর মানসিক স্বাস্থ্যেরও খোঁজ নেওয়া দরকার। পরিবারের পাশাপাশি সকলের উচিত তাঁর সঙ্গে কথা বলা, তিনি যাতে নিঃসঙ্গ বোধ না করেন সে দিকে খেয়াল রাখা।’’

তবে হাওড়া সেতু থেকে অসমের যুবককে নামাতে অবশ্য সফল হয়েছিল পুলিশ। ডিব্রুগড়ের বাসিন্দা ওই যুবক মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন দিল্লি থেকে। কিন্তুসর্বক্ষণ নেশা করে থাকতেন। সঙ্গীদের পাল্লায় পড়ে কলকাতায় এলেও কিছুই করতে না পেরে শেষে হাওড়া সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মঘাতী হওয়ার পরিকল্পনা করেন। দীর্ঘ চার ঘণ্টা ধরে তাঁর সঙ্গে পুলিশের মনস্তাত্ত্বিক লড়াই চলে। তিনি যত বলেন, ‘‘মদ দাও, সিগারেট দাও’’, পুলিশ ততই কেক ও চা-বিস্কুট এগিয়ে দেয়। শেষে ওই যুবককে নামাতে পারেন পুলিশকর্মীরা। মাসখানেক চিকিৎসার পরে তাঁকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় পরিবারের কাছে।

 

আপনার মতামত দিন:


মন জানে এর জনপ্রিয়