Ameen Qudir

Published:
2017-06-08 09:48:12 BdST

ডাক্তার হয়েও ডাক্তারদের ব্যবহার নিয়ে কিছু কষ্টের অভিজ্ঞতার কাহিনী


 

 

 

 

ডা. মিথিলা ফেরদৌস

____________________________

 

থার্ড ইয়ারে পড়ার সময় আম্মাকে একবার এক অর্থোপেডিক্সের স্যারের কাছে নিয়ে গেলাম,আমি সাধারণত পরিচয় দিতে চাই না।কিন্তু স্যার নিজেই বললেন,
---তুমি আমাদের স্টুডেন্ট না?
তখন উত্তর দিলাম।সন্ধানী করার সুবাদে অনেকেই চিনতেন।এরপর উনি আম্মাকে একটা এক্সরে করতে দিলেন কোন চিকিৎসা দিলেন না।কিন্তু ভিজিটের পুরা টাকাই নিলেন।আম্মার সমস্যা কোন গুরুতর কিছু ছিলো না।যাই হোক টাকার জন্যে না।কিছু টা মন খারাপ হয়েছিল,একজন মেডিকেল স্টুডেন্ট হিসেবে একটু স্নেহ তো আশা করতেই পারি,আর তখন বয়স কম ছিল তাই মায়ের কাছে নিজে যে কিছু অর্জন করেছি তা দেখাতে ইচ্ছা করেছিল?তাছাড়া তখন এথিক্স গুলাও কিছু পড়া ছিলো।এই স্যার পরে আমার জীবনের ভয়ংকর দুইটা দুর্ঘটনার জন্যে দায়ী ছিলেন,তা আর উল্লেখ করতে চাইনা।

 

ডাক্তার হবার পর একজন নামকরা শিশু বিশেষজ্ঞের কাছে লম্বা সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে,তারপর বাবুকে স্যারকে দেখাইছিলাম,তিনিও আমার স্যার আমাকে চিনতেন।তারপরও ভিজিট নিয়েছিলেন।কিন্তু রংপুরের আরও দুইজন বিখ্যাত স্যার বাবুকে নিয়মিত দেখতেন,অনেকসময় আমি নিজেও যাইনি তবুও ভিজিট তো নেন নাই,আবার বাবুকে খুব আদর করতেন,তারা হলেন,নুরুল আবছার স্যার আর বিকাশ মজুমদার স্যার।স্যার, সারাজীবন আমি আপনাদের ঋণ কখনওই শোধ করতে পারবোনা।

ঢাকায় আমার শ্বাশুড়ির দুই বার অপারেশন হয় একবার চোখের ক্যাটারেক্ট,আরেকবার হিস্টারেক্টমি,দুইবারেই সার্জন পুরা টাকাই নিয়েছিলেন।যদিও আমার জামাইরা দুই ভাই ডাক্তার।

সার্জারি এর এক ভাইয়া মারা গিয়েছিলেন মাল্টিপল মায়োলোমায়,তার বউ ও ডাক্তার। একদিন আপু আমার কাছে খুব কেদে গল্প করেছিলেন,নাম করা একজন প্রফেসার কে দেখাতে রাত দুইটা পর্যন্ত সিরিয়ালে বসে থাকতে হয়েছিলো অসুস্থ স্বামী নিয়ে।অনেক অনুরোধ শর্তেও স্যার আগে দেখেননি।

একজন ডাক্তার দু:খ করে বলেছিলেন,তার বাবাকে নিয়ে কোন স্যারকে হাসপাতালে দেখাতে রুমে ঢুকেছেন,ঠিক ওইসময় কোন একজন পুলিশের এস আই আসাতে,উনার বাবাকে বের করে তাকে দেখেছিলেন।এইটা কি ধরনের আচরণ?

একই অবস্থা শিকার হয়েছিলাম আমি। একবার আমার শ্বশুরকে নিয়ে।বেচারা বয়স্ক অসুস্থ মানুষ ছটফট করছিলেন,না পারতে পরিচয় দিয়েছিলাম,একটু আগে দেখার জন্যে,ভিজিটের জন্যে না,কিন্তু সিরিয়ালেই তাকে বসে থাকতে হয়েছে,কিন্তু তার সিরিয়ালের ঠিক আগেই কোথা থেকে কোন বাংলা সিনেমার নায়ক আসলো, তাকেই আগে স্যার দেখলেন।তখন ডাঃ হবার জন্যেই কষ্ট হচ্ছিলো।

 

পিজিতে আমার ডাঃ বান্ধবী একবার ভর্তি হয়েছিলো,দেখি বাথরুমের কাছে ওয়ার্ডে তার সিট,আমি বললাম,' কেবিন নাওনি কেন?'জানলাম পিজি, ঢাকা মেডিকেলের ভি আই পি কেবিন, আই সি ইউ, নাকি ভি আই পি দের ড্রাইভার,কেয়ার টেকার আত্মীয়স্বজনদের জন্যে বরাদ্দ।অথচ আমার বান্ধবী,তার হাজবেন্ড দুইজনেই ডাঃ। ওর হাজবেন্ড পিজিতেই থিসিস পার্টে ছিলেন তখন,তাও তাকে কেবিন দেয়া হয়নি।আমরা ডাক্তার রা ডাক্তাদের জায়গাগুলাতেই ভি আই পি হতে পারিনা।এই টাই আমার সবচেয়ে বড় দু:খ।

 

আমার শ্বাশুড়ির একবার মাথা ফেটে গেলো,ঢাকা মেডিকেল জরুরী বিভাগে ডাঃ কে বললাম আমার মা, আমি কিছুদিন আগে এখানেই ট্রেনিং করে গেছি।দেখলাম খুব একটা কেউ গুরুত্ব দিলো না।

আমি একজন ওয়ার্ড বয়কে নিয়ে স্টিচ দেওয়ালাম,নিজেই দিতে পারতাম,কিন্তু আমার হাত পুরা কাপতেছিলো।শ্বাশুরির রক্তার্ত মুখ দেখে আমি কাঁদতে ছিলাম।তাই ওয়ার্ডবয়কেই এসিস্ট করলাম।অথচ জীবনে কত মানুষের হেড ইঞ্জুরীতে স্টিচ দিয়েছি।ফেরার পথে একজন আমাকে চিনে,বলে 'আপা আগে বলবেন না,আপনি ডাঃ?' আমি আর তখন কি বলবো?

 

যেকোন হাস্পাতালে যান,ডাক্তার পরিচয়ে দিয়ে দেখেন,আপনার স্বজাতি জুনিয়র অথবা সিনিয়র কিছু আছে তাদের ব্যাবহার দেখলে খুব অবাক হবেন।এরা কখনই ভাবেনা এদেরও কখনও কারো দরকার হতেই পারে।বিশেষ করে ইদানিং জুনিয়রদের ব্যাবহার দেখলে বেশি খারাপ লাগে।

কিন্তু আপনি যদি ডাক্তার ছাড়া অন্য পরিচয় দেন মনে করেন,ডিজি অফিসের কেরানী,গণভবনের কেরানী,ওয়ার্ড কমিশনার, সাংবাদিক,পুলিশ তাহলে দেখবেন তারা কি করে?এদের মান সন্মান বোধ দেখেলে নিজেরও লজ্জা লাগে।

সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কোন এক মেডিকেল কলেজে এক ডাক্তার দম্পতি গিয়েছিলেন ইঞ্জুরি নিয়ে।তখন নাকি সেখানকার মেডিকেল অফিসার বা ইন্টার্ন অন্য রুগী নিয়ে খুব ব্যাস্ত ছিলেন।ওই ডাক্তার নিজেই তার বউ এর ইঞ্জুরীতে স্টিচ দিতে চেয়েছিলেন,সেটাও কেউ এরেঞ্জ করে দেয়নি।খুব দুখজনক ঘটনা।এইটা ডাক্তার না হয়ে উপরোক্ত যাদের বর্ননা দিয়েছি তারা হলে কি করতো তারা?স্যার স্যার করে সব ফালায় করে দিতে বাধ্য হতো।

 

আমি প্রতিদিন গড়ে ৮/১০জন ডাক্তার বা ডাক্তারের আত্মীয়স্বজন দেখি।খুব যত্ন নিয়েই দেখার চেস্টা করি।চেষ্টা করি হাস্পাতালের পরিক্ষায় ডায়াগ্নসিস কনফার্ম করতে। একান্ত যদি হাস্পাতালে না হয়,যদি বাইরে পরিক্ষা করাতে হয়, যতদূর সম্ভব ডিসকাউন্ট লিখে দেই।আমার পক্ষ থেকে চুড়ান্ত আন্তরিকতা দিবার চেষ্টা করি।কেনো জানেন?

 

এই ডাক্তাররা প্রতি পদে পদে হেনস্তার স্বীকার হয়।ডিজি অফিসে ফাইল যারা নিয়ে যায়, তাদের সাথে কথা বলতে ১০০ টাকা হাতে ধরায় দিতে হয়,কাজের জন্যে আলাদা হিসাব।আর কেরানীদের কথা কি বলবো।নাম বলবো না।আপনারা সবাই চিনেন।বদলী বাণিজ্যে এদের রমরমা অবস্থা।এরা ডাক্তাদের মানুষ মনে করেনা।ডাক্তারাও পারলে এদের স্যার ম্যাডাম ডাকে।আমি নিশ্চিত এরা যেকোন ডাক্তারকে দেখাতে সিরিয়াল বা ভিজিট লাগেনা।এই হইলাম আমরা।কতটা নির্লজ্জ ভাবতে পারেন?

মিনিস্ট্রি এর রেট তো আরও চড়া।এ প্রসঙ্গে আরেকটা জায়গার কথা না বললেই না,সেই টা হলো,বিসিপিএস এর কেরানী।ওহ!মাগো কি আর বলবো,আমাদের টাকায় তাদের ফুটানী।এত দু:খের কথা লিখতে গেলে মহা কাব্য হয়ে যাবে।

 

যাই হোক ডাক্তার পরিচয়ে যান আপনার ওয়ার্ড কমিশনারের কাছে কি করে দেখেন?মোট কথা ডাক্তার পরিচয় দিলে সবাই আপনার কাছে ফ্রী কিভাবে চিকিৎসা নেয়া যায় তার ধান্দা করবে।আরে আপনি তো নিজের প্রোফেশানের লোকদের কাছেই সুবিধা পান না।অন্যদের আর কি দোষ দিবেন?

আমাদের প্রোফেশনের লোকদের জন্মগত মেরুদন্ডেই সমস্যা।ডাক্তাররা ডাক্তারির জায়গা গুলোতেই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয়।নিজেদের মধ্যে একতা বোধ তো নাই সন্মানবোধও নাই।যা সব প্রফেসানেই ক
আমাদের প্রোফেশনের লোকদের জন্মগত মেরুদন্ডেই সমস্যা।ডাক্তাররা ডাক্তারির জায়গা গুলোতেই সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হয়।নিজেদের মধ্যে একতা বোধ তো নাই সন্মানবোধও নাই।যা সব প্রফেসানেই কম বেশি আছে।

 

এইজন্যেই সবাই আমাদের নিয়ে মজা পায়,স্বাভাবিক।আপনারা তো নিজেরাই নিজেদের সন্মান দেন না অন্যরা কেনো দিবে?

আমি জানি, এই লেখাতে কিছুই হবেনা,স্বভাব কি পালটানো যায়?তবুও অনুরোধ করবো জুনিয়রদের। হ্যা ডিগ্রী হইছে তাই বলে সিনিয়রদের অসন্মান করার ডিগ্রীও কি ফ্রি দিয়ে দেয় নাকি?সবাই অবশ্য এমন না।এখানে পারিবারিক শিক্ষার একটা ব্যাপার থাকেই।

আর সিনিয়রদের কাছে অনুরোধ করবো,স্যার আপনারা ভিজিট নেন অসুবিধা নাই,পরিচয় দিলে সিরিয়ালেও যদি আগায় নিতে না পারেন, তবে অন্তত পিছায় দিয়েন না।কিছু জায়গায় সিস্টেম পাল্টান।অন্তত বি এস এম এম ইউ, ডি এম সি এইচ এইসব জায়গায় কেবিন বা আইসিইউ তে ডাক্তারদের সিটের জন্যে হয়রানি যাতে বন্ধ হয় তা নিশ্চিত করুন,ডিজি অফিস,বিসিপিএস,ছোটবড় সব হাসপাতালে চিকিৎসকদের সন্মান নিশ্চিত করুন।নাহলে নিজেদের পতন এভাবে নিজেদের দিনের পর দিন দেখে যেতে হবে।

_________________________

ডা. মিথিলা ফেরদৌস। লোকসেবী চিকিৎসক ও কথাশিল্পী ।

আপনার মতামত দিন:


মন জানে এর জনপ্রিয়