SAHA ANTOR

Published:
2020-10-10 12:50:53 BdST

"কিসের মেন্টাল ! আমার ছেলেকে মেন্টাল বললে সবাইকে দেখে নেব "


 

 

ডা. সুলতানা এলগিন


সহযোগী অধ্যাপক
মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ
কনসালটেন্ট , ওসিডি ক্লিনিক ও জেরিয়াট্রিক ক্লিনিক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় , ঢাকা


__________________

 

কদিন আগের কথাই বলি। এক উচ্চশিক্ষিত উচ্চ চাকুরি করা মানুষ কিছুতেই মানতে চাইছিলেন না , তার সন্তান মনোরোগে ভুগছে।
তিনি বার বার বলছিলেন, কিসের মেন্টাল ! কিসের মেন্টাল ! আমার ছেলেকে মেন্টাল বললে সবাইকে দেখে নেব।

অথচ তার সন্তানকে কেউ মেন্টাল বলে নি। মানসিক রোগে ভোগা আর কথিত " মেন্টাল" যে এক নয় , কে তাদের বোঝাবে।

অথচ তার মেধাবী সন্তান নিজেই বুঝেছে, সে মানসিক কিছু সমস্যায় ভুগছে। সেজন্য মানসিক রোগের ডাক্তার দেখানো দরকার। তার পড়াশোনায় ব্যঘাত ঘটছে।
সে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞর পরামর্শ মত ওষুধ খেয়ে সুস্থ হয়ে আরও বেশী করে লেখাপড়ায় মন দিতে চায়। খুব ভাল রেজাল্ট করতে চায়। ডাক্তারি পড়া একান্ত লক্ষ্য। সে জন্য সে তার মা ও বড় বোনকে কনভিন্স করে নিজেই তাদের নিয়ে আমার ভিডিও চেম্বারে যোগ দেয়।
কিন্তু বাপ তো রেগে মেগে কাঁই। তার মতে, এ সব কিছু লেখাপড়া না করার বাহানা। সে মেন্টাল নয়।

 

শাকিব খান বা ডিপজলদের সিনেমা দেখে বা তাদের কথিত সংলাপে মেন্টাল গালি শুনে তো মানসিক রোগের সাধারণ জরুরি সেবা হবে না।
মানসিক রোগ হলে পরিবারে , সমাজে তাকে পাগল বলে কটুক্তি করেই আমরা খালাস। তাকে চিকিৎসা না দিয়ে নানারকম মানসিক নির্যাতন করে জটিল রোগী বানিযে ফেলছি আমরা।
অথচ সময়মত চিকিৎসা করালে আর দশ রোগের রোগীর মত তাকেও সম্পূর্ণ সুস্থ করা সম্ভব।

২.


মহামারির কারণে মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে । এটা গত শুক্রবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সবাইকে পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছে।
কিন্তু আমরা কি করছি । আমরা কি আদৌ জানি, মানসিক স্বাস্থ্যের যত্ন ও সেবা কতটা দরকার। বাংলাদেশে জনগোষ্ঠির প্রায় ১৭ শতাংশ মানসিক রোগে ভুগলেও এর অতি অল্প সংখ্যক মনোরোগ সেবা পাচ্ছে। বাকিরা এই সমাজে রাষ্ট্রে অবহেলায় , অনাদরে তাচ্ছিল্যে জীবন যাপন করছে। মানসিক সমস্যার সমাধানই হচ্ছে না।


৩.
মন,মানসিক রোগ এবং মানসিকতা --- শব্দ ৩টি যেন এক সুতায় বাধা।মনের গতিপ্রকৃতি সহনশীল চাপমুক্ত থাকলে মানসিকভাবে আমরা সুস্থ থাকি। আার এই গতিপ্রকৃতি যখনই বাধাপ্রাপ্ত হয়,মনে ঝড়ের আভাস পাওয়া যায় তখনই মানসিক রোগেরসৃষ্টি হয় মানসিক স্বাস্থ্যের হানি হয়।বরাবরই মানসিক স্বাস্থ্য সবার অবহেলার বিষয় ছিল। আজ এই করোনা প্যান্ডেমিকে মানুষকে চারদিক থেকে নানাপ্রকার উদ্বেগ আশংকা হতাশা পেয়ে বসেছে। কেউ চাকরী হারিয়েছে,কেউ আপনজন হারিয়েছে,কেউসন্তানের ভবিষ্যৎ,বয়স্ক বাবামার স্বাস্থ্যচিন্তা নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন। আইসোলেশনে থাকতে গিয়ে সামাজিক/শারীরিক দূরত্ব মানতে গিয়ে মানুষ আরও একা হয়ে পড়ছে। স্বাস্থ্যকর্মীরা প্রতিদিন করোনা আতংকে দিন কাটাচ্ছে। তাই এবারের বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসের শ্লোগান সবার জন্য “মানসিক : স্বাস্থ্য অধিক বিনিয়োগ,অবাধ সুযোগ ” যুক্তিযুক্ত হয়েছে।বাংলাদেশে ১৬.৭% মানুষ মানসিক রোগে ভুগছে। বর্তমানে করোনা প্যান্ডেমিক প্রেসিপিটেটিং ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করছে। আবালবৃদ্ধবনিতা কেউ বাদ যাচ্ছে না। কিন্তু আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন না হলে যতই সুযোগ বাড়ানো হোক না কেন মানুষের সাহায্যে আসবে না।
বিশ্বব্যপী মানসিক স্বাস্থ্যসচেতনতা বাড়ছে। অনলাইন মেন্টাল হেলথ সার্ভিস চলছে । তারপরও মানুষ চেম্বারে আসার জন্য অগ্রহ প্রকাশ করছে।যেটা অনেকাংশে সে বাসায় বসেই নিতে পারে। শিক্ষামন্ত্রণালয় স্কুলশিক্ষকদের মানসিক¯ স্বাস্থ্য নিয়ে একটা প্রজেক্ট শুরু করেছেন। তাতে ছাত্রছাত্রী তথা পরিবার উপকৃত হবে। কিন্তু মানসিক ভাবে প্রস্তুত হতে হবে যে মানসিকরোগের চিকিৎসা আছে। চিকিৎসা নিতে হবে । কোন গাফিলতি চলবে না। আমাদের স্কিল ম্যান পাওয়ার তৈরী করতে হবে যাতে সবার কাছে আমরা এই মানসিক¯ স্বাস্থ্য সেবা ও সচেতনতা পৌছে দিতে পারি।
বিনিয়োগ যত বাড়বে সেবাদান/সেবাগ্রহীতার সুযোগ তত বাড়বে । সচেতনতা বাড়বে।


৪.
‘সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্য: অধিক বিনিয়োগ অবাধ সুযোগ’ স্লোগান নিয়ে আজ শনিবার বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালিত হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, করোনাভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্বব্যাপী মানুষের মানসিক স্বাস্থ্যে মারাত্মক ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে। গত জুন থেকে আগস্ট মাসে ৯৩টি দেশে পরিচালিত জরিপের উল্লেখ করে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা গতকাল শুক্রবার সতর্কতা জারি করে বলেছে, করোনাভাইরাসের সংকটময় সময়ে মানসিক স্বাস্থ্য উপেক্ষা করা হয়েছে।

মানসিক স্বাস্থ্যখাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আহ্বান জানিয়ে আজ শনিবার ডব্লিউএইচও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘দ্য বিগ ইভেন্ট ফর মেন্টাল হেলথ’ নামে এক অনুষ্ঠানের আয়োজন করছে।

এএফপির খবরে জানা যায়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জরিপের অন্তর্ভুক্ত ১৩০টি দেশের ৮৩ শতাংশ করোনা মহামারী বিষয়ক পরিকল্পনায় মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি অন্তুর্ভুক্ত করেছে। তবে এর মধ্যে মাত্র ১৭ শতাংশ তাদের প্রয়োজনীয় পূর্ণ তহবিলের বরাদ্দ দিয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক পরিচালক দেভোরা কেসটেল ভার্চুয়াল মিডিয়া ব্রিফিংয়ে মানসিক স্বাস্থ্যখাতে অবিলম্বে তহবিল বাড়ানোর তাগিদ দেন। তিনি বলেন, এটি কোভিড ১৯ এর উপেক্ষিত দিক।

 

ডব্লিউএইচও বলেছে, করোনা মহামারির আগে বিভিন্ন দেশ জাতীয় স্বাস্থ্য বাজেটে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ২ শতাংশরও কম বরাদ্দ রাখে। করোনার কারণে মানসিক স্বাস্থ্যে বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বিবৃতিতে বলছে, শোক, আইসোলেশন, আয় কমে যাওয়া, ভয় মানসিক স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলে। অনেকে অ্যালকোহল ও মাদকসেবন বাড়িয়ে দিয়েছে। অনিদ্রা ও উদ্বেগ বাড়ছে।

ডব্লিউএইচও বলছে, মানসিক স্বাস্থ্যে করোনার প্রভাব নিয়ে আরও তথ্য ও গবেষণা প্রয়োজন।

_________

ADD.

আপনার মতামত দিন:


মন জানে এর জনপ্রিয়