Dr. SAYEED ENAM

Published:
2022-06-06 08:51:33 BdST

ইউরোপ,আমেরিকার ভিক্ষুক সমাচার:'গিভ মি সাম ডলার/ইউরো প্লীজ'


সানফ্রান্সিসকোতে ভিক্ষুক

 

ডা. সাঈদ এনাম
সহকারী অধ্যাপক, সাইকিয়াট্রি
সিলেট মেডিকেল কলেজ
____________________________

সানফ্রান্সিসকোতে সাইকিয়াট্রি সেমিনারে স্পিকার হিসেবে গিয়েছিলাম। থাকতাম একটা হোটেলে। বেশ কয়েকজন অংশগ্রহণ কারীও উঠেছিলেন সে হোটেলে।

হোটেলের পার্ট টাইম ম্যানেজার মাদাগাস্কার এর। অনলাইনে তার মাধ্যমেই হোটেল বুকিং করি। তিনি বছর বিশেক আগে এসে স্থায়ী হয়েছেন। বিশ বছরে অনেক গুলো পার্ট টাইম কাজ করে থিতু হয়েছেন এখানে। এটাই তার জীবনের সব চেয়ে ভালো জব৷ ১২ ঘন্টা ঠায় বসে থাকার কাজ। কন্টিনিউয়াস কাস্টমার সার্ভিস। অফলাইন অনলাইন, দুটোই। আমি অরবিজ এর মাধ্যমে সে হোটেলে বুকিং দেই।

একটা সিমকার্ড দরকার। তার কাছে জেনে নিলাম কোথায় সিমকার্ড পাবো। বাহিরের দেশে মোবাইল, সিমকার্ড, ইন্টারনেট, গুগল ম্যাপিং ইত্যাদি ছাড়া চলা দুষ্কর, অনিরাপদ।

টি- মোবাইল এর শো-রুম ছিলো দশ মিনিটের ওয়াকিং ডিসটেন্স। তারপরও ভয় হচ্ছিলো যদি পথ হারাই। গিয়ে দেখলাম, সে শো-রুম আমেরিকার সবচেয়ে বড়।

হোটেলের পাশে ছিলো একটা কফি শপ। সেটা চালাতেন দুই ভাই। তারা তুরষ্ক থেকে এসে স্থায়ী হয়েছেন। একজন ডাক্তার। প্রতিদিন বিকেলে কফি বা নাস্তা খেতে যেতাম তাদের ওখানে।

একটা পিজা পুরোটা খেতে পারতাম না। তাই আগেই অর্ধেক করে নিতাম। আসার সময় কফি শপের পাশে দুজন ভিখিরি দাঁড়িয়ে থাকতে দেখতাম। একজন পুরুষ একজন মহিলা। ওদের দিতাম। প্রায়ই হাত পেতে দাড়িয়ে থেকে বলতো, 'গিভ মি সাম ডলার স্যার'। আমেরিকায় রাস্তায় ''আমেরিকান ভিক্ষুক" দেখে ধাক্কা খেলাম।

ইউরোপে গিয়ে ও রাস্তায় ভিক্ষুক পাই। রাস্তার ইউরোপিয়ান ভিক্ষুক, 'গিভ মি সাম ইউরো প্লীজ'। ভিক্ষুক কেবল বাংলাদেশেই নয়।

আমেরিকার সব জায়গায়ই ভিক্ষুক আছে। সানফ্রান্সিসকোতে মনে হয় বেশী। মায়া লাগতো। জিন্স প্যান্ট, ধবধবে লাল-সাদা স্মার্ট লুক, অথচ হাত বাড়িয়ে বলছে, 'গিভ মি সাম ডলার, প্লীজ'। কিছু খাচ্ছেন, সামনে এসে দাড়িয়েছে, পকেটে চেঞ্জ মেই হাতের খাবারটাই ইশারা করেন। খুশি হয়ে নেবে। ক্ষুধারে। আরেক দল আছেন, রাস্তার পাশে গান গেয়ে, বাদ্য বাজিয়ে জীবিকা নির্বাহ করেন।

প্রথম প্রথম ভিখিরিদের দেখলে ভয় করতো। এড়িয়ে যেতাম। কখন যে ধরে বসে। এদের কয়েকজন রাতে হোটেলের গেইটের সামনেই শুয়ে থাকতো। কনকনে শীত আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টি, অভাবেই পড়ে আছে। আমি আর বের হতাম না, একটা ভয় কাজ করতো।

একটা ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে দৈনন্দিন কিছু দরকারি জিনিসপত্র কিনতে যেতাম। সেখানে দুজন নেপালী ছেলে, স্যালস ম্যান। একজন সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার কিন্তু স্যালসম্যান। দেখে খারাপ লাগতো, কেনো, কেসের আশায়? তাহলে এতো পড়াশোনা কি কারনে?

সেমিনার হল গুলির এক পাশে আমাদের ব্যাগ বা হ্যান্ডস রাখার রুম। তদারকি করতেন দুজন মহিলা। পার্টটাইম জব। চুক্তি ভিত্তিক। যতদিন সেমিনার ততদিন কাজ। সেমিনার শেষ অন্যখানে একই কাজে নিয়োগ হবে। উনারা সম্পর্কে 'মা ও মেয়ে'। মেয়ের এটা পার্টটাইম। ও দিয়ে কোন মতে তার পড়ার খরচ উঠায়। জাপান থেকে এসছেন ভাগ্য বদলাতে।

টি-মোবাইল শোরুম এ গিয়ে সিমকার্ড নিলাম। স্যালস বয় এর বাড়ি থাইল্যান্ড। পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ করে। থাকে একটা হোস্টেলে, শেয়ারে। ১২ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার কাজ। যা পায় তাই দিয়ে কোন মতে চলে, পারলে দেশে পাঠায়। অফ! কি কস্টের জীবন!

নিউইয়র্কে এসে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক সমস্যা হচ্ছিলো।

বাসার কাছেই একটা টি-মোবাইল শপ গুগল করে পেলাম। গেলাম। এক বাঙালী সেলসগার্ল। জিগ্যেস করলাম, 'বাড়ি কোথায়? বললো, 'বগুড়া'। এতটুকুই কথাবার্তা। কারো সময় নাই।পার্ট টাইম কাজ। ১২ ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকার কাজ। বসা বা বিশ্রামের সুযোগ নেই। সিসি ক্যামেরা তাক করা। সোজা হয়েই চলতে হবে। কাস্টমার নাখোশ হলে সোজা 'ফায়ার'। ফায়ার মানে 'আউট'।

এক পরিচিত বন্ধু উবার চালান। দেশে ছিলেন স্বনামধন্য ব্যাক্তিত্ব, অত্যন্ত ভালো চাকুরে। অথচ সেখানে উবার চালাতে চালাতে তার কোমরে ব্যাথা, আঙুল গুলো লোহার মতো হয়ে গেছে। যাত্রীর ব্যাগটাও অনেকে সময় কাঁধে নিয়ে নিজে ভ্যানে ঢুকাতে হয়। এতে টিপস বেশী হবে। আহা, কি কস্টের জীবন। টিপসের কালেকশনে দিয়ে এক সময় দেশে বিশাল প্যালেস।

গালি পাড়লাম, ক্যানো দেশের রাজকীয় জীবন ছেড়ে আসলি? ফ্যাল ফ্যাল করে কেবল তাকালো। নিরুত্তর।পাওয়া না পাওয়ার হিসাবে গরমিল, চোখ ছলোছল। ফেইসবুকের চাকচিক্যময় ছবির সাথে বাস্তবের বিশাল ফারাক।

হোটেলের ম্যানেজার মহিলা সিঙ্গেল। চল্লিশোর্ধ্ব। অভাবের তাড়নায় এসছিলেন। এখন অভাব নেই, প্রিয়জনেরাও নেই। যে যার মতো হারিয়ে গেছে। চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে প্রচন্ড গরমিল। চারিদিকে কেবল শুন্যতা আর শূন্যতা।

অনেক চড়াই উৎরাই পেরিয়ে লাখে একজন খানিকটা সফল হলেও ভীন দেশে বেশির ভাগ স্বজন বন্ধুবান্ধবদের জীবন কস্টের জীবন। যা স্বচক্ষে না দেখলে কল্পনা করা যাবেনা। অথচ সেই সব দেশে যাবার জন্যে আপন মানুষ গুলোর কি হাহাকার, আর্তনাদ। সহায়- সম্বল, ঘটিবাটি, সব বিক্রি করে হলেও যেতে হবে।
Writes Dr-Muhammad Sayed Inam Walid

আপনার মতামত দিন:


ভ্রমণ এর জনপ্রিয়