Dr.Liakat Ali

Published:
2022-09-10 10:51:31 BdST

" ৫ বার সুইসাইড ট্রাই করেছি , তারপরও মরতে পারি নাই "


লেখক :অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ, কনসালটেন্ট ওসিডি ক্লিনিক এবং জেরিয়াট্রিক ক্লিনিক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় , ঢাকা

 


অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন
মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ,
কনসালটেন্ট ওসিডি ক্লিনিক এবং জেরিয়াট্রিক ক্লিনিক,
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় , ঢাকা

_________________________________

" ৫ বার সুইসাইড ট্রাই করেছি , তারপরও মরতে পারি নাই। মরণ আমার কপালে লেখা নাই মেডাম। "
ভীষণ হতাশা ও বিষন্নতা নিয়ে কথাগুলো বললেন তিনি।
তিনি বললেন, "মরতে না পেরে আমার বড় কষ্ট। প্রত্যেকবার মরতে যাই , আজরাইল আলাইহিসসালাম জান কবজ করতে একদম গলা টিপা পর্যন্ত ধরে। কিন্তু তারপরও কোন না কোন উসিলায় বেঁচে যাই। কখনও ডাক্তাররা জান বাঁচায়। কখনও মায় বাঁচায় , কখনও বউ , কখনও সন্তানে। নাউজুবিল্লাহ। এ নিয়া বড় পেরেশানিতে আছি। একদম বাঁচতে ইচ্ছা করে না। একদম না। আপনি আমার কথা শুনছেন তো ! নাকি ইন্টারেস্ট পাইতেছেন না। "
কোমল কন্ঠে আস্তে করে বললাম : শুনছি। বলে যান।
রোগী সাহেব দেখতে একদম ফিটফাট। ধোপ দুরস্ত। মার্জিত ভাব। দামি জামা কাপড় পরে এসেছেন। মুখে সুন্দর দাঁড়ি রেখেছেন। দেখতে তুর্কি সিরিয়ালের সুদর্শন অভিনেতাদের মত।

জানালেন, ঢাকার একটি মাল্টি ন্যাশনাল কম্পানির চাকুরে। ভাল বেতন পান। গাড়ি; বাপের বাড়ি আছে। বউ সুন্দরী সুশীলা। একটা কন্যা সন্তান অছে । যে কিনা একদম তার মত দেখতে।
বোঝা গেল , ভদ্রলোক , তার কন্যাকে বড় ভালবাসেন। বাবা নেই। মা আছেন বাড়িতে। মা এখনও রান্না করে ভাল ভাল খাওয়ান।

আমি বললাম, সবই তো বেশ ভাল। তাহলে সমস্যা কি।
ভদ্রলোক বললেন , বেশি ভালো না। সেটাই বড় সমস্যা। দেখেন , আম্মা এখনও জিন্দা। আলামদুলিল্লাহ , তিনি ১০০ বছরে বাঁচবেন । কিংবা তারও বেশি। কিন্তু তারপরও তো মরবেন। মালিকুল মউত আজরাইল আলাইহিসসালাম তো
মওতের দাওয়াত নিয় আসবেন। আম্মা যদি এন্তেকাল করেন , তারপর আমার কি হবে! আমার ভাল ভাল খাওয়া দাওয়ার কি হবে। আমাকে রান্না করে কে খাওয়াবে। নাউজুবিল্লাহ । মুখ ফসকে এসব কি বলছি। আমি আম্মার দীর্ঘ হায়াত চাই।
তারপর ধরেন, আমার বউ যদি মরে যায়। তাহলে আমার কি হবে। বাচ্চার কি হবে। সংসারের কি হবে।আমি আবার নিকাহ করলাম, সেই নতুন বউ কেমন হবে। তার সন্তানরা কেমন হবে।আম্মার সঙ্গে রিলেশন মহব্বতী হবে তো।"

বুঝলাম, তার সমস্যার ফিরিস্তির শেষ নাই। এরকম রোগী প্রতিদিন দেখতে হয়। আগডুম বাগডুম দুশ্চিন্তার শেষ নাই তাদের।

ভদ্রলোক বলেই চললেন, প্রথম বার স্লিপিং পিল চল্লিশ টা নিয়ে সুইসাইড করতে গিয়েছিলেন। ৪টা পর্যন্ত খেয়ে অতল ঘুমে চলে যান। বাড়ির লোকজন তাকে তাড়াতাড়ি হাসপাতালে নিয়ে যায়। ওয়াশ করায়। ভেবে ছিল, বেশি করে ট্যাবলেট খেয়েছে।
ট্যাবলেট ট্রাই করেছেন তিন বার। ওয়াশের সময় কঠিন জাহান্নামের আজাব দিয়েছে ডাক্তার। কিন্তু তারা জান ফিরিয়ে দিয়েছেন। শুকরিয়া আদায় করেছি মসজিদে। আম্মার কথায় তারপর রসুল পাকের সুন্নতের লাইন ধরে চলছি। ৫ ওয়াক্ত নামাজ পড়ি। তাহাজ্জুদ পড়তেছি। দোয়াদরুদ সব পড়তেছি। হুজুরদের সবরকম তদবির মানতেছি।
কোন বাদ নাই। খালি মরতে ইচ্ছা করে। আরও দুবার বাড়ির পুকুরে, মালয়েশিয়া গিয়া সাগরে ঝাপিয়ে পড়ে মরতে চেষ্টা করেছি। লোকজন, বন্ধু রা টেনে তুলে বাচিয়েছে আমাকে। বন্ধু রা, অফিসের কলিগরা হাসি মশকরা করে। বলে, মরন তোমার কপালে নাই। এবার এভারেস্টে গিয়ে লাফ দাও। ২০০ পারসেন্ট নিশ্চিত মৃত্যু। কেউ বাঁচাতে পারবে না।
আমার এখন যন্ত্রণা র শেষ নাই। মরাও হবে না। মশকরারও শেষ নেই।
ভদ্রলোককে প্রয়োজন অনুযায়ী ওষুধ দিয়ে ও পরামর্শ দিয়ে বিদায় করলাম। আরও কয়েকবার ফলোআপ এ এসেছেন। নিয়মিত কাউন্সেলিং সেশন নিতে বলেছি। নিচ্ছেন ও।
এখন বেশ ভালো আছেন।

কথা গুলো লিখলাম আজকের

আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস এর পরিপ্রেক্ষিতে।


বিশ্বব্যপী ১০ই সেপ্টেম্বর আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ২০০৩ সাল থেকে পালিত হয়ে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় “কর্মের মাধ্যমে করি আশার জাগরণ”। অসময়ে এই অকাল মৃত্যু রোধ করা । সামাজিক,পারিবারিক সচেতনতা তৈরীর লক্ষ্য এবারের পদক্ষেপ । প্রতি ৭ঘন্টায় ১জন আত্মহত্যা করে আর ২৫ জন আত্মহত্যাকারীর মধ্যে ১জন আত্মহত্যা করতে সক্ষম হন( আামেরিকান ফাউন্ডেশন অফ সুইসাইড প্রিভেনশন)। বাংলাদেশে আত্মহত্যার হার ২.৭৮% বেড়ে ২০১৯ সালে দাড়িয়েছে ৩.৭% । করোনাপরবর্তী পরিস্থিতিতে সুইসাইড ,আত্মঘাতী প্রবণতা অনেক বেড়ে গেছে।আঁচল ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ পরিচালিত সমীক্ষায় দেখা গেছে ২০২১ সালে ১০১জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন । যা ২০২০ সালে ছিল ৭৯। আরও দেখা যায় যারা দিনে ৩-৭ঘন্টা ফোনের স্ক্রীনের দিকে তাকিয়ে থাকেন তাদের ৮৮ % বিষন্নতায় ভোগেন।
কেন আত্মহত্যা প্রবণতা বাড়ছে ?

আত্মহত্যা প্রবণতার পিছনে মনোসামাজিক,পারিপার্শ্বিক চাপ এবং মানসিকরোগ একটা বড় ভুমিকা রাখে। অর্থনৈতিক ক্রাইসিস,বেকারত্ব,পেশাগত হতাশা,ইনসোমনিয়া,পরিবার এবং সামাজিক প্রত্যাশা বৃদ্ধি ,একাকীত্ব মানুষের মধ্যে চরম হতাশা তৈরী করে। বুলিং,নির্ঘুম রাত,প্রেমে সম্পর্কে টানাপোড়েন , বাবামায়ের প্রতি অভিমান,রেজাল্ট খারাপ -শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার অন্যতম কারণ। কিশোর, মহিলা আর বৃদ্ধদের মধ্যে এই আশংকা বেশী দেখা যায়।
আর মানসিক রোগের কারণেও আত্মহত্যার হার বাড়ছে যা আমাদের অগোচরে রয়ে যাচ্ছে। বিষন্নতা,মাদকাসক্ত এবং সিজোফ্রেনিয়ারোগীদের মধ্যে আত্মহত্যার আশংকা ৫%-৮% বেশী। সাথে শুচীবায়ুর লক্ষণ, উদ্বিগ্নতা ,ইনসোমনিয়াও দেখা যায়। সাইকোলজিকাল অটোপসীতে দেখা যায় আত্মহত্যাকারীদের ৯০% মানসিকরোগী । সবচেয়ে বেশী ছিলেন মাদকাসক্ত( মদ) আর তারপরেই ৬০% মুড ডিসঅর্ডার বিষন্নতা,বাইপোলার রোগে ভুগছিলেন।
নিকটাত্মীয়/পরিচিতজনদের যারা সাক্ষী হয়ে থাকেন:
ডব্লিউএইচও এর জরীপে জানা যায় প্রতিদিন ৩০০০ মানুষ আত্মহত্যার চেষ্টা করে। আর ২০ জনের মধ্যে আত্মহত্যা করার তীব্র প্রবণতা থাকে । আর তাদের অকাল মৃত্যু নিকটাত্মীয়দের মাঝে ঝড়ো হাওয়া বইয়ে দিয়ে যায়।
আরেক জরীপে দেখা গেছে প্রতি ১জন আত্মহত্যাকারীর সাথে গড়ে ১৩৫জন ব্যক্তি জড়িয়ে থাকে। তা হতে পারে নিজের পরিবারের একান্ত আপনজন ,বন্ধুবান্ধব,সহকর্মী ,ক্লাসমেট এবং আরও অনেক নিকটজন । যারা বেঁচে থাকেন তাদের মধ্যে মারাত্মক মনঃপীড়া,কষ্ট,আত্মগ্লানি,লজ্জা,কুসংস্কার, সামাজিক নিন্দার ভয় কাজ করে। যারা এই পরিস্থিতির সাথে খাপ খাওয়াতে পারেন না তারা মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েন । পরবর্তীতে তাদের মধ্যেও মানসিকসমস্যা বিষন্নতা, পোস্টট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার, আত্মহত্যার চিন্তা / প্রবণতা দেখা দেয়।
ব্রেনে কি পরিবর্তন দেখা যায়?
সিরোটনিনের মাত্রা এসকল মানসিক রোগীদের মধ্যে মারাত্মকভাবে কমে যায়। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও কমে যায়।

যা করণীয়:
মনোসামাজিক,পারিপার্শ্বিক চাপগুলোকে ণির্ণয় করা আর তা রোধ করার মধ্য দিয়ে এই অকালমৃত্যু রোধ/কমিয়ে আনা সম্ভব ।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গুলোতে মনোরোগের স্ক্রীনিং নিয়মিত চালু রাখা উচিত। যাতে দ্রুত রোগনির্ধারণ এবং চিকিৎসা সম্ভব হয়।
মানসিকরোগকে অন্যান্য শারীরিকরোগের মতই নিয়মিত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরী।
যারা তাদের নিকটাত্মীয়কে এই অকালমৃত্যুতে হারিয়েছেন তাদের জন্য:
এই অস্বাভাবিক মৃত্যুকে মেনে নিন। নিজের প্রতি মনোযোগ দিন। যারা এরকম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন তাদের সাথে যোগাযোগ বাড়ান । তাতে সমব্যথীদের সাথে মনের কষ্ট কিছুটা হলেও কমবে। লোকজনের সাথে কখা বলেন। একাকীত্ব হতাশা বাড়ায় কথাটি ভুলে গেলে চলবে না। প্রয়োজনে পেশাজীবি মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক,সাইকোলজিস্টদের সাহায্য নিন।

সচেতনতা বাড়ানোর জন্য:
অভিভাবক,শিক্ষক,প্রশাসনের ব্যক্তিদের সাথে গোলটেবিল বৈঠক উন্মুক্ত আলোচনা জরুরী।
যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের উপর বিশেষ অনুষ্ঠান করে সেসব পরিবারের সাথে থাকা যেতে পারে।
স্কুলকলেজের শিক্ষার্থীদের সাথে শিক্ষকদের যথেষ্ট আন্তরিক সম্পর্ক রাখা প্রয়োজন।
আত্মহত্যার পদ্ধতি ফোকাস না করে কিভাবে নিজেকে সুস্থ রাখা যায় তার উপর জোর দেয়া প্রয়োজন।

আপনার মতামত দিন:


মন জানে এর জনপ্রিয়