SAHA ANTAR

Published:
2020-12-22 19:01:31 BdST

রোগীর কাহিনিপরিশ্রমের সাড়ে ৪ কোটি টাকা না পেয়ে দিশাহারা মানসিক রোগীর ঘুরে দাঁড়ানোর কাহিনি


 


ডা. সুলতানা এলগিন


সহযোগী অধ্যাপক
মনোরোগ বিদ্যা বিভাগ
কনসালটেন্ট , ওসিডি ক্লিনিক ও জেরিয়াট্রিক ক্লিনিক
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় , ঢাকা
________________________________

গোবেচারা ধরণের চেহারা। তাকে দেখে ঠিক মনে হয়নি , তার মধ্যে এমন অদম্য প্রতিভা ও যোগ্যতা লুকানো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিবিএ করে লন্ডনে আরও পড়াশোনা। তারপর দিল্লীতে বায়ারদের সঙ্গে কাজ শুরু করলেন। থাকতেন নয়ডায়। সে খানে কলকাতার এক তরুণীর সঙ্গে প্রেম। বিয়েও করে ফেললেন। দুজনার দুই ধর্ম। একজন ধর্মান্তরিত হলেও সমস্যা কাটলো না। বউয়ের পরিবার বিয়ে মানলো না। লন্ডন না ফিরে বরং ফিরে এলেন ঢাকাতে। ভাবলেন তার নিজের আত্মীয় স্বজন দু:সময়ে পাশে দাঁড়াবেন। কিন্তু মানুষ চায় এক। হয় আরেক।
সলিমুল্লার ( প্রকৃত নাম নয় ) আত্মীয় স্বজন তাকে দূর দূর করলেন। পুরাণ ঢাকার ধনাঢ্য পরিবারের সন্তান শুধু প্রেমের বিয়ের অপরাধে সব ধরণের সম্পদ থেকে বঞ্চিত হলেন। কানাকড়িও দিল না তাকে। বলল, লন্ডনে পড়িয়েছে , সেই ঢের।

যাই হোক, সলিমুল্লা নিজেই এক প্রতিষ্ঠান।
বায়ার হ্যান্ডেলে সে অতি পারদর্শী। বায়িং হাউসে কাজ পেলেন । কয়েকটি বায়িং হাউসের চাকুরি করে মন ধরল না। নিজেই স্বাধীন প্রতিষ্ঠান করল।
বায়ার হ্যান্ডেল করে কাজ এনে দেয় সে। বনানীতে ভাড়া বাড়িতে থাকার জায়গা , গাড়ি সব হল।
এর মধ্যে দিল্লীতে থাকতে যোগাযোগ হওয়া পুরানা এক বায়ার তার সঙ্গে ঢাকায় যোগাযোগ করল।


বিশাল এক কাজের অর্ডার পেলো সেই বায়ারের কাছ থেকে।
নিজে যেসব প্রতিষ্ঠানে কাজ করত , তার মধ্যে একটিকে সে কাজটা দিল। তাদের মধ্যে চুক্তি হল। কাজ শেষে শুধু তারই কমিশন আসবে ৫ কোটি টাকা। যে গারমেন্টস কাজ নিল ; তারা ওই কমিশন দিতে এক পায়ে খাড়া।
অর্ডার মত কাজ হল। শিপমেন্ট সহ যাবতীয় কাজ সুন্দরভাবে হল।
সলিমুল্লা তার কমিশনের মধ্যে ৫০ লাখ টাকা পেলও নিয়মিত।
কিন্তু শেষে গারমেন্ট কম্পানি তার সঙ্গে বিশ্বাস ঘাতকতা করল। তারা বাকি টাকা আর তাকে দিল না। সলিমুল্লা বিশ্বাস করে ঠকল।


গার্মেন্টএর মালিক বলল, সলিমুল্লাহ তার কম্পানি র কর্মচারি। নিয়মমত তার বেতন ভাতা দেয়া হয়েছে। তারপর আবার কিসের টাকা। ৫০ লাখ টাকা দিয়েছে সেই তো বেশী। সলিমুল্লাহ লিখিত এগ্রিমেন্ট দেখাতে পারল না।
কয়েকদিনের মধ্যে সলিমুল্লাহর জীবনে নেমে এল অন্ধকার। মারাত্মক হতাশায় ভেঙে পড়ল। ঘাড় উচু মানুষটার ঘাড় ভেঙে গেল।
তার প্রিয়তমা স্ত্রী সবসময় তার পাশে ছিল। সলিমুল্লাহর আত্মীয়রা কেউ এগিয়ে না এলেও বউ পাশে ছিল।


সলিমুল্লার শুরুতে বড় বড় হাসপাতালে বড় বড় চিকিৎসা হল। কিন্তু কোন লাভ হল না। বরং জমানো টাকা পয়সা সব জলে গেল। সর্বসান্ত হল দম্পতি।
এই সময়ে তারা দিল্লীতে অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিকেল সায়েন্সে ( এইইমস) এ নিয়ে গেল তার স্ত্রী। সেখানে ডাক্তাররা জানালেন , সলিমুল্লার অন্য কোন মেজর রোগ নেই। যেটা হয়েছে সেটা মানসিক রোগ। কলকাতার বউটি সঙ্গে করে সোনার গয়না গাটি যা এনেছিল , সব খরচ হল। এইমস থেকে রেফার্ড হয়ে সলিমুল্লা যায় নিমহ্যানস এ। সৌভাগ্যক্রমে সেখান থেকে এই রোগী অধ্যাপক ডা. রেড্ডির হয়ে রেফারেন্স নিয়ে আসে আমার কাছে।
নিমহ্যানস ( The National Institute of Mental Health and Neuro-Sciences) ভারতবর্ষের মানসিক রোগ ও মস্তিষ্ক রোগের মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়সম। একসময় অনারারাী কাজ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে সেখানে ডা. রেড্ডী স্যারের অধীনেই ।

সলিমুল্লার মানসিক রোগের মেডিকেল বিবরণ দিলাম না। তার চিকিৎসা করতে পেরে নিমহ্যানস এর ডা. রেড্ডির কাছে আমি কৃতজ্ঞ।
বিচিত্র এক জীবন কাহিনি শুনলাম তার স্ত্রীর বয়ানে; সলিমুল্লার কাছে। সলিমুল্লা যখন প্রথম আমার কাছে আসে , তথন সে ভয়ঙ্কর চুপচাপ। বিষন্ন। হতোদ্যম।
ধারাবাহিক চিকিৎসা, কাউন্সেলিং এ তাকে সুস্থ করে তোলা সম্ভব হয়েছে।
সলিমুল্লা আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। তার মানসিক সমস্যা গুলো আর নেই। তবে তাকে ফলোআপে থাকতে হবে। করোনাকালেও সে ফলো আপ নিচ্ছে অনলাইনে।
তার ব্যাক্তিগত কম্পানি আবার সচল। তার বউটি তার সঙ্গে আছে কাজে । দুজনে দারুণ সক্রিয়।
ভীষণ ভাল খবর হল, তাকে সবচেয়ে বেশী সহযোগিতা করেছে সেই ইউরোপীয় কম্পানি। তারা তার সঙ্গে আছে।সলিমুল্লাকে ঠকানো ফ্রড কম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নিয়েছে।
সলিমুল্লা বিভিন্ন সেশনে আমাকে তার প্রতিজ্ঞা জানিয়েছে, এবার যখন ঘুরে দাঁড়িয়েছে। আর সে দমবে না। পথ যতই কঠিন হোক, সে বউয়ের সঙ্গে হাত মিলিয়ে পাড়ি দেবেই।


শেষ কথা: মানসিক রোগ হলে লুকোবেন না। ভেঙে পড়বেন না। মানসিক রোগ লুকোলে অন্য ডিসিপ্লিনের ডাক্তারদের অজান্তেই ভুল চিকিৎসার শিকার হতে পারেন। প্রচুর অপচয় হতে পারে। যেমনটা হয়েছে সলিমুল্লার ক্ষেত্রে। তার স্ত্রী ছিল একা। বুঝতেই পারে নি তার স্বামীর কি রোগ হয়েছে। মানসিকরোগ হলে নিয়মিত চিকিৎসা নিন। বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে সাহসের সঙ্গে সবল সুন্দর সুস্থ জীবন যাপন করবেন আপনিও। একটু সময় লাগলেও আপনি হবেন দারুণ সুস্থ। #

আপনার মতামত দিন:


মন জানে এর জনপ্রিয়