Ameen Qudir

Published:
2019-03-19 10:07:53 BdST

ওসিডি কেসস্টাডি ও চিকিৎসা : ১৮ স্যারের সন্দেহ, তার বউ পকেট থেকে টাকা চুরি করে: তাই তক্কে তক্কে থাকেন ধরার জন্য


ডা. সুলতানা আলগিন
_____________________

সহযোগী অধ্যাপক , মনোরোগবিদ্যা বিভাগ। কনসালটেন্ট, ওসিডি ক্লিনিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
_____________________________

মধ্যবয়স্ক দম্পতি চেম্বারে ঢুকলেন । স্বামী পারলে স্ত্রীর যাবতীয় দুখকষ্ট নিজেই বলে দিতে চাচ্ছিলেন। না পেরে উনাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম যে উনিতো কথা বলতে পারেন। সংসার চালান বাচ্চাদের দেখাশোনা করেন । উনি নিজেই বলতে পারবেন । উনাকে বলতে দিন। লোকটি একটু নড়েচড়ে বসলেন। মহিলা তার ঘুমের সমস্যা শরীরে ব্যথা ভুলে যাওয়া --- এসব সমস্যাগুলো বললেন। আমি জিজ্ঞাসা করলাম আর কোন সমস্যা ? একটু ইতস্তত করে বললেন তার স্বামী তাকে সারাক্ষণ সংসারের কাজকর্ম নিয়ে খোটা দিতে থাকেন । বাচ্চারা কেন ঘর এলোমেলো করে ? তা কেন স্ত্রী দেখে রাখেন না ? বাচ্চাদের সাথে প্রচন্ড খারাপ ব্যবহার। যখন তখন ওদের গায়ে হাত তোলে। ওরা কেন ওদের পড়ার টেবিল গুছিয়ে রাখে না। বাসায় ফিরে ঘর আগোছালো দেখলে চিৎকারে ঘরে থাকা দায়। বাচ্চাদের টিউটর পর্যন্ত বলেন যে ওদের বাবার এত বদমেজাজ -- আপা উনার চিকিৎসা করান। আমরাতো রীতিমত আতংকে থাকি।
এবার পাশে বসা ভদ্রলোকটির দিকে তাকাই।
উনি বললেন বাচ্চাদের গুছিয়ে থাকতে বলাটা কি অন্যায় ? আপনিই বলেন?
আমি বললাম না অন্যায় নয়। তবে আপনি যে অতিরিক্ত উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন তা রীতিমত অন্যায়। আপনি কি মনে করেন ? মাথা ঝকিয়ে জানালেন হয়তোবা আমি একটু বেশী রিএ্যক্ট করে ফেলি। কিন্তু এলোমেলা জিনিষ নোংরা পরিবেশ আমার কাছে অসহ্য লাগে। এটা বলে বোঝাতে পারবো না।
এরপর স্ত্রী একটু সাহস পেয়ে বলেন আপা আমাকে উনি যে কতভাবে যে অপমান করে চিন্তা করতে পারবেন না।
লোকটি বলল এতদিন এত ডাক্তার দেখিয়েছি কাউকে কিছু বলি নাই । আপনাকে না বলে পারছি না।
এইযে আপা ডাক্তার দেখানোর খোটার মত বিভিন্ন খোটা আমার উঠতে বসতে শুনতে হয়।সাথে সাথে স্ত্রী বলে উঠলেন।
বলেন । শুনি।
এরকম একজন চোর টাইপের মহিলার সঙ্গে এত বছর ধরে সংসার করছি। কাউকে জানাই নাই । আপনাকেই প্রথম বললাম।
তাই নাকি ? তা কি কি চুরি করেছে এত বছর ধরে ? কার জন্য চুরি করেছে ?স্বামীটি বললেন আপা আমি পেশায় শিক্ষক। আমার আয় সীমিত । বাসায় ঢুকে সার্টপ্যান্ট খুলে বাথরুমে যাই। প্রায়ই দেখি ৫০০, ১০০০ টাকা মিসিং। ব্যপার কি । আমি তো কোথাও যাই না । তাহলে টাকা যায় কই ? এরপর থেকে আমি তক্কে তক্কে থাকি । আমার আলমারির পিছনে দাড়িয়ে থাকি । দেখি আমার স্ত্রী নোটগুলো সরিয়ে শাড়ীর আচলে গুজে ফেলল নিমিষে ।
আমি বের হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম এইমাত্র টাকা সরিয়েছ আমি নিজ চোখে দেখেছি। তারপরও সে অস্বীকার করে চলে । কিছুতেই স্বীকার করাতে পারি নাই।
সামনে বসা মহিলার মুখ অপমানে লজ্জায় এতটুকু হয়ে গেছে আমি টের পাচ্ছিলাম ।
মহিলাটি কেঁদে বলছিলেন আপা উনি কখনও কোন হাত খরচ দেন না । বাইরে গেলে সংসারে টুকিটাকি কত কিছু লাগে আপনিতো বোঝেন। বাচ্চারদের ভেলপুরী,ফুচকা ,ঝালমুড়ি কখনও ফাস্টফুড মাঝেমধ্যে কিনে দেই। উনি কখনও কাউকে বাইরের খাবার খেতে দিবেন না বা বাইরের ভালমন্দ কিছু আনেন না। বাচ্চাদের সবসময় বুঝিয়ে পারা যায় না । তথন আমি টাকা কোথায় পাবো ? বাসার কাজের লোকের কাছেও টাকা থাকে কিন্তু আমার হাতে উনি কখনও বাড়তি টাকা দেন না।
আপা উনি স্কুলহেডমাস্টারের সাথে সবসময় ঝগড়া করেন ।
জিজ্ঞাসা করলাম কেন ?
এবার ভদ্রলোক নড়েচড়ে উঠলেন। বললেন আমি ইংরেজীর শিক্ষক। শিক্ষক হিসাবে আমার সুনাম আছে । আমি জানি। হেডস্যার যে ক্লাশে আমাকে পড়াতে বলেছেন সেই ক্লাশে গ্রামের পাগলবাড়ীর দুটি ছেলে পড়ে। ওরা থাকলে আমি পড়াব না বলে দিয়েছি।
পাশে বসা স্ত্রী আরও জানালেন তার স্বামী তাদের বাচ্চাদের মাঠে খেলতে যেতে দেয় না। নিজেও বাড়ীর পিছনের রাস্তা দিয়ে ঘুরে স্কুলে আসে যায়।
বললাম কেন ?
স্ত্রী জানালেন মাঠটি পড়েছে ঐ ছেলে দুটির বাড়ীর সামনে। ওদেরকে দেখলে বা ওদের বাড়ীর কাউকে উনি সহ্য করতে পারেন না।
ভদ্রলোকটির দিকে তাকালাম । বললাম আপনি একজন শিক্ষিত মানুষ। আপনি কিভাবে এরকম ভাবেন ?
তখন সে জানাল যে তার এই চিন্তা থেকে তিনি বের হতে পারছেন না। তার মনে হয় তার বাচ্চারা বা পরিবারের লোকজন পাগল হয়ে যাবে। যদিও তা ঠিক না । ওদের সাথে গ্রামের সবাই মিশছে । অন্যান্য টিচাররা ওদের ক্লাশ নিচ্ছে ।।সবই বুঝি কিন্তু নিজের সাথে যুদ্ধ করে চলেছি। এজন্য মাঝে মাঝে ইয়াবা খাই। ভুলে থাকার জন্য।
বললাম সবইতো বুঝলাম। চিকিৎসাতো আপনার দরকার । সবাইকে এভাবে দোষারোপ করে কতদিন চলবেন ? চিকিৎসা শুরু করেন । দেখবেন আপনার সমস্যাগুলো কমে আসবে । শিক্ষক হিসেবে আপনার সুনাম ফিরে পাবেন। বুঝিয়ে বললাম এই রোগের নাম ওসিডি। । তাকে আস্তে করলাম চিকিৎসার বিকল্প নেই। নিয়মিত সঠিক ডোজে ওষুধ খেতে হবে। কিন্তু ওষুধ চালিয়ে যাবেন।
______________________________

ডা. সুলতানা আলগিন ।
সহযোগী অধ্যাপক , মনোরোগবিদ্যা বিভাগ। কনসালটেন্ট, ওসিডি ক্লিনিক। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

____________________

কতগুলো কমন অজুহাত আছে ।

যেমন *একটু ভাল বোধ করলে ওষুধ আনার কেউ ছিল না বা পাওয়া যায় নাই বা *আপনার কাছে আসার সময় হয়ে গেছে তাই নতুন কোন ওষুধ যদি দেন আর কেনা হয় নাই। প্রেসক্রিপশনে লেখা আছে কোন ওষুধ চলবে কোনটা কতদিন পর বন্ধ হবে তারা কেউ একবারও চোখ বুলায় না বা কাউকে জিজ্ঞাসা পর্যন্ত করে না। আবার ওষুধ বাজারে কিনতে গিয়ে হারিয়ে ফেলা নিয়মিত একটা ব্যপার। অথচ প্রথম দিনের ইন্টারভিউটা যে কত প্রয়োজনীয় বুঝতে চায় না।


ওসিডি একটা ক্রনিক রোগ। মানসিক চাপের কারনে রোগের বাড়তি কমতি থাকবে । ধৈর্য ধরে ওষুধ খেতে হবে। নিয়মিত ফলোআপে থাকতে হবে।


___________________________

 

 


কিছু দরকারি পরামর্শ


বি:দ্র: সিরোটনিন সমৃদ্ধ খাদ্যের একটা ছোট তালিকা দেয়া হলো। এসব খাবার আমাদের দেশে সবখানেই পাওয়া যায়। তবে কারও যদি কোন খাবারে নিষেধ থাকে তবে সেগুলো বাদ দিয়ে অন্যান্য আইটেম আপনার প্রতি বেলার খাবারে রাখতে পারেন। ওষুধের পাশাপাশি এসব সিরোটনিন সমৃদ্ধ খাদ্য আপনার শরীরে সিরোটনিনের চাহিদা মিটাবে ।
আমিষ জাতীয় খাদ্য:মাংস,কলিজা,ডিম ,দুধ ও দুধ জাতীয় দ্রব্য, সামুদ্রিক মাছ
ফলমূল :পাকা কলা,আনারস, খেজুর, বাদাম, আম,আঙ্গুর,এ্যাভোকেডো
শাকসব্জি: পালং শাক,পুইশাক,বেগুন, শিম জাতীয় বীজ,ফুলকপি, ব্রকলি, টমেটো, মাশরুম

 

________________________

 

প্রিয় সুজন ,
আপনি কি অবসেসিভ কমপালসিভ ডিজঅর্ডার (ওসিডি) বা শুচিবাই রোগে
ভুগছেন ?

 

একটু সময় দিতেই হবে আপনাকে আপনার ও সকলের স্বার্থে। প্রশ্নগুলো পড়ুন অনুগ্রহ করে।



১।আপনি কি অতিরিক্ত ধোয়া-মোছা করেন অথবা পরিস্কার পরিচ্ছন্ন থাকেন?
২।আপনি কি কোন কিছু অতিরিক্ত চেক/ যাচাই-বাছাই করেন?
৩। আপনার মাথায় কি কোন অপ্রীতিকর/ অনাকাঙ্খিত চিন্তা আসে ? যা কিনা আপনি চাইলেও মাথা থেকে সহজে বের করতে পারেন না ?
৪।আপনার কি দৈনন্দিন কাজ শেষ করতে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হয়?
৫। আপনার মধ্যে কি আসবাবপত্র, বই খাতা, কাপড়-চোপড় অথবা যে কোন জিনিস নির্দিষ্ট ছকে গুছিয়ে রাখার প্রবণতা আছে ?

 

 

উপরোক্ত প্রশ্নগুলোর যে কোন একটির উত্তরও যদি হ্যাঁ বোধক হয় তবে মানসিকরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিন ।ভুক্তভোগীদের ওসিডি ক্লিনিক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকায় প্রতি মঙ্গলবার , সকাল ১০টা থেকে ১টায় আসার অনুরোধ রইল।
এ জন্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকার আউটডোরের মাত্র ৩০ টাকার টিকেট নিতে হবে।

লেখার সৌজন্য

 

ওসিডি ক্লিনিক । বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। প্রতি মঙ্গলবার ।

আপনার মতামত দিন:


মন জানে এর জনপ্রিয়