Ameen Qudir

Published:
2017-06-11 07:37:46 BdST

মনের মধ্যে কষ্ট পুষে দিনের পর দিন নিজেকে শেষ করার কোন মানে নাই


 

 

ডা. মিথিলা ফেরদৌস

_______________________________

 

ধরি মেয়েটার নাম ইতু।শ্যামলা খুব মিষ্টি একটা মেয়ে।সামনে মেডিকেল থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষা।অসম্ভব মেধাবী একটা মেয়ে।নিজের গ্রামের কোন এক ছেলেকে ভালবাসতো।ছেলে তেমন কিছু না।গ্রামের স্কুল টিচার।ধরি ছেলের নাম সফিক।হয়তো গ্রামে গেলে তাদের মধ্যে দেখা সাক্ষাৎ হতো।আমাদের সময় প্রেমের ব্যাপারগুলো এখনকার মত না।চাপা স্বভাবের মেয়েটি বাড়ি থেকে যখন হোস্টেলে ফিরতো তখন সেই স্মৃতি টুকু মনে নিয়ে ঘুরতো।

 

পরিক্ষার আগে ইতু তার রুম মেট কে সব বলল।একদিকে পরিক্ষার চাপ অন্যদিকে মনের মধ্যে পুষে রাখা গভীর ভালবাসা,শেয়ার করে হালকা হতে চায়।রুমমেট শুনে খুব খুশি।পরিক্ষা খুব কাছে।ইতুর পড়ার প্রতি কোন মনোযোগ নাই।সারাদিন সাজগোজ করে,হোস্টেলের দেয়ালের আয়নায় নিজেকে দেখে আর হাসে।রুমমেট পড়া লেখা নিয়ে এতই ব্যাস্ত, ইতুকে লক্ষ্য করতে পারেনি।এরমধ্যেই একদিন ইতু জানায় সফিক আসছে তার সাথে দেখা করতে।রুমমেট খুশি হয়।ইতু যথারীতি সেজেগুজে বের হয়ে যায়।রাতে হোস্টেলে ফিরে আবার আয়নায় নিজেকে ফিরে ফিরে দেখে ইতু।রুম মেট অনেক কথা জিজ্ঞেস করে,সব সুন্দর উত্তর দেয় ইতু।ধরি রুমমেটের নাম,লুনা।

 

পরের দিন সন্ধ্যায় ইতু আবার যখন সেজেগুজে বের হয়,লুনা একটু আগ্রহ নিয়ে হোস্টেলের চারতলার বেলকনি থেকে ইতুর প্রেমিক দেখার চেষ্টা করে।বেলকনি থেকে রাস্তায় ল্যাম্পেপোস্টের আলোতে অনেক জুটিদের দেখা যায়।লুনা ইতুকে দেখার চেষ্টা করে।অনেক কষ্টে দেখে ইতু একা একাই হাসছে,ঠোট নাড়াচ্ছে,একা একা হাটছে। লুনা খুব অবাক হয়।রুমে ফিরলে লুনা ইতু কে খুটায় খুটায় জিজ্ঞেস করে।ইতু অবলীলায় অনেক কথা বলে।সফিক তাকে কত ভালোবাসে,তাকে বাড়ি নিয়ে যেতে এসেছে।কাল সে বাড়ি যাবে লুনার সন্দেহ হয়।পরেরদিন রাতে ইতু ব্যাগ গুছাতে থাকে,১১ টায় ট্রেন।লুনার মনে সায় দেয় না,একা ইতুকে পাঠাতে তাই সঙ্গে আরেক বান্ধবী নিয়ে ইতুকে ফলো করে।স্টেশন পর্যন্ত।ঘুটঘুটে অন্ধকার স্টেশান, নাহ কেউ নেই ইতুর সাথে,স্টেশানে একা ইতু।দুই বান্ধবী মিলে ইতুকে জোর করে ধরে এনে বুঝায়।ইতু ভুল বুঝতে পারে।

 

পরেরদিন ক্লাশ থেকে ফিরে এসে লুনা,ঘরে ঢুকতে গিয়েই অবাক হয়।সম্ভবত ইতু সুইসাইডের চেষ্টা করেছিলো।ঘরের মধ্যে চেয়ার উল্টায় পরে আছে,কাপড় চোপড় এলো মেলো মেঝেতে ছড়ায় ছিটায় আছে।ইতু ঘামে ভেজা মুখে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকায় আছে।এবার লুনা ভয় পেয়ে যায়।সেদিনই দুই বান্ধবী মিলে ইতুকে তার গ্রামে দিতে গিয়ে শুনে,সফিক নামের ছেলেটির কিছুদিন আগেই বিয়ে হয়ে গেছে।শেষবার ইতু গ্রামে এসে এই ঘটনা দেখে গেছে।
এরপর থার্ড ইয়ার ফাইনাল পরিক্ষা শেষ হয়।ইতু পরীক্ষা দিতে পারেনা।কিছুদিন পর ইতু সুস্থ হলে হোস্টেলে ফিরে আসে।

ইতু সুস্থ হয়ে আসার পর একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম,
-----কোন ডাক্তার দেখিয়েছ?'
-----ঢাকার একজন নাম করা সাইকিয়াট্রিস্ট ।
------কি বলেছিলেন উনি?
------আমাকে উনার চেম্বারে টাঙানো ক্যালেন্ডার দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,'কি ওটা?'আমি বলেছি ক্যালেন্ডার, ফ্যানের বাতাসে উড়ছে।
বুঝলাম ইতুর ভিতরের দগেদগে ক্ষত শুকাতে সময় লাগবে।

উপরের ঘটনাটা সত্যি ঘটনা।তখনকার যুগে,মেসেঞ্জার,ইমো,ভাইবার এমন কি মোবাইলও ছিলনা,এখনকার মত এত সহজে কাউকে মনের ভাব প্রকাশ করা যেত না।অনেকেই কষ্ট গুলোকে পুষে পুষে মানসিক ব্যাধি বানিয়ে ফেলতো।এখন যখন শুনি,ক্রাশ খাওয়া,ব্রেক আপ হওয়া।খারাপ লাগেনা।প্রেমের কারনে
এখন আর কেউ এডিক্ট ও হয় না মনে হয়।কারন--

Rapid onset
short duration of action.
মনের মধ্যে কারো জন্যে কোন কষ্ট পুষে রেখে,দিনের পর দিন নিজেকে শেষ করার কোন মানে নাই।

_________________________

 

ডা. মিথিলা ফেরদৌস। সুলেখক। লোকসেবী চিকিৎসক।

আপনার মতামত দিন:


মন জানে এর জনপ্রিয়