|

জোর করে স্ত্রীর সঙ্গে শারিরীক সম্পর্কও ধর্ষণ


Published: 2016-11-27 19:12:14 BdST, Updated: 2017-05-27 14:08:51 BdST



ছবিটি ঘরেই জোরাজুরির শিকার নির্যাতিতার প্রতিকী মডেল হিসেবে ব্যবহৃত। চলচ্চিত্র থেকে নেয়া।

 

 

 


অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম
_____________________________

বাচতে হলে জানতে হবে ।

১। জোর করে স্ত্রীর সঙ্গে শারিরীক সম্পর্কও "ধর্ষন" এর সামিল

২। যৌন সমস্যার ৮০-৮৫% মানসিক সমস্যা( বাকীগুলো হরমোনজনিত বা ভাসকুলার)

৩। যৌন বিষয়ে খোলা মেলা আলোচনাকে নিরৎসাহিত করলে বিবাহিত জীবনে সঙ্কট দেখা দিতে পারে

৪। যৌন অনাগ্রহ ও একটি মনো-যৌন সমস্যা যার যথাযথ মানসিক চিকিৎসা রয়েছে

( লেখাটি দীর্ঘ হলেও পুরোটি পড়ুন।দেখুন জানার ও শেখার কিছু আছে কিনা।অশ্লীল লেখা মনে করে মাঝ পথে পড়া থামিয়ে দেবেন না)
................................................
কাহিনী সংক্ষেপ:

লাবনী( ছদ্ম নাম), বয়স ২০ অনার্স সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী।

১ মাস হলো বিয়ে হয়েছে
এরেন্জড বিয়ে।তার ভাষ্য মতে:

বিয়ের আগেই মা-বাবাকে বলেছি যত ক্ষন পর্যন্ত ওনার সঙ্গে সহজ হতে না পারবো তত দিন শারিরীক সম্পর্কে যাবো না।

বিয়ের আগেই উনার কিছু জিনিস আমার পছন্দ হয়নি।আমাকে দেখতে আসার দিন উনার সঙ্গে আমার রুমে কথা হচ্ছিল।এটি আমার বিছানা জানার পর উনি বলেন তুমি তো আজ সারা রাত আমার কথা চিন্তা করবা।এ ছাড়া উনি আমার সামনেই প্যান্টের জিপার আটকায়।এ গুলো আমার মধ্যে ঘৃনার সৃষ্টি করে।

স্বামী ডিভি লটারী পেয়ে আমেরিকা প্রবাসী।
মা-বাবা বলে মানুষকে একবার দেখে চেনা যায় না,পাত্র আমেরিকায় থাকে তোমাকেও নিয়ে যাবে,এমন পাত্র পাওয়া যাবে না।

ঠিক আছে রাজী হলাম কিন্তু ট্রাস্ট না আসা পর্যন্ত শারিরীক সম্পর্কে যাবো না।

বিয়ের ১ম রাত অসুস্হতার কথা বলে কাটিয়েছি।
২য় রাত উনি টাচ করতে চায় কিন্তু আমি বাধা দেই।

সে বলে এগুলো নরমাল,সবাই করে।আমি তবুও বাধা দেই।উনি বাথরুমে গিয়ে তার বোনের সঙ্গে কথা বলে এসে আমাকে বলে এখনি দরকার কোন কথা শুনবো না।

আমি ভয় পেয়ে পিছিয়ে যাই।সে বলে তোমার উপর জোর করবো,কেন রাজী হচ্ছো না,অন্য কোথাও কি রিলেশন আছে?

আমি এক পর্যায়ে অনেক ভয় পাই ওপাগলের মতন আচরন করতে থাকি।বাথরুমে ঢুকে দেয়ালে আকিঝুকি আকি আর বলতে থাকি কেউ বিশ্বাস করে না,কেবল মিথ্যে কথা বলে।

এর পর ঘরে সবাই ঢুকে।উনি বলেন আমার ফ্রেন্ডরা না বলাতে আমি এ রকম করছি।এতে বাবা আমার ফোন নিয়ে নেয়।আমাকে পাশের রুমে নেওয়া হয়।
পর দিন সকাল বেলা উনি ঐ রুমে গিয়ে আমাকে ডাকে,আমি ভয় পেয়ে কোনায় চলে যাই।পরে দাদা এসে ওনাকে নিয়ে যায়।

পরের রাত খাওয়া-দাওয়ার পর উনি বলেন কিছু করবো না,চলো আমরা গল্প করি।তিনি বলেন তুমি তোমার মা বাবাকে কি বলেছিলে?। আমি বললাম ইজি না হওয়া পর্যন্ত এ সব হবে না বলেছি।

উনি বলেন আমাদের ব্যাপারটি সবার কাছে জানা জানি হয়ে গেছে,সবাই অন্য রকম ভাবছে ইত্যাদি।

এক পর্যায়ে আমি বলি আপনি আমাকে ছেড়ে দিন।এমন সময় ওনার বোন এসে বাহির থেকে দরজা আটকে দেয়।বলে এটি তো খুশীর জিনিস,আমাকে বুঝাতে চায়।বোন বলে দরজা খুলবো না,একটি মেয়েকে জোর করে বিছানায় নিতে পারবি না? তোর অধিকার জোর করে হলেও আদায় করে নিবি।

স্বামী বলে ৬ মাস পর হলেও করবা,এখন ৫ মিনিট সময় দিচ্ছি তুমি রেডি হও।
আমি আতঙ্কিত হয়ে এন্টি কাটার ও চাকু নিয়ে দাড়াই।
সে দরজা খোলে সবাইকে ঢেকে আনে।সবাই আমাকে ধরতে চায়।আমি বলি ধরবে না,ধরলে লাগাইয়ে দেবো।
মা আমাকে ধরে হাতে কামড় দেয় যাতে হাত থেকে চাকু পরে যায়।উনিও এগিয়ে ধরতে আছেন।আমি হাত ঘুরাতে ওনার হাতে লেগে হাত কেটে যায়।আমি জেঠাতো ভাইয়ের শার্ট ধরে কাদতে থাকি ও বলি ভাই আমি এ সব পারবো না,আমাকে সাহায্য করো।

উনাকে হাসপাতালে নিয়ে ব্যান্ডেজ করে আনা হয়।তার বোন এসে কান্না কাটি ও জেদ করে।বাবা বলে আমি আর বাসায় যাবো না।এতে আমি ভয় পেয়ে যাই।
রাতে মা ও স্বামী একজন গাইনিকলজি
স্ট এর কাছে নিয়ে যান।
ওনাকে সব বলি।উনি মাকে বলেন মেয়েকে জোর করবেন না এতে ডিভোর্স পর্যন্ত চলে যেতে পারে।এও বলেন স্বামী যাতে নিজেদের বিষয় তার বোনকে কিছু না বলে।

রাতে বাসায় নালিশ বসে।

দাদা বকে,চাচা স্বামীকে বলে ওর দু'গালে দুটি চড় মেরে দিতে পারলে না? আব্বুও কয়েকবার মারতে আছে।
আমি বলতে চাইলাম আমার দ্বারা এ সব সম্ভব না। চাচা বলেন বিয়ে মানে এ সব হয়।
সবার কথা অনুযায়ী আমাকে উনার পা ধরে মাফ চাইতে হয়।

উনি বলেন আপনার আর পড়া লেখার দরকার নাই।এরপর আমাকে গৃহবন্ধি করে রাখে।কোথাও যেতে দেয় না।

উনাকে বলি আজকের রাত এভাবেই থাক।উনি বলেন ঠিক আছে ঘুমাও।উনার বোন দরজায় কান দিয়ে ছিলেন আমরা কিছু করছি কিনা।পরদিন ওনার বোন ওনাকে জিজ্ঞেস করে কয়বার করছোস,দুই বার না তিন বার(সবাই আশা করেছিলেন ঐ দিন আমরা কিছু করবো)।উনি সমস্যা নাই বলে বিষয়টি এড়িয়ে যান।

 

 

একদিন পর আবারোও উনি পীড়াপীড়ি করাতে আমি রাজী হই।( আমি সারাক্ষন চোখ বুজে ছিলাম)।

বেশী চাপে থাকলে আমার নিশ্বাস নিতে কষ্ট হয়।একদিন রাতে না হওয়াতে ভোর বেলা আমার মাথা ধরে ঝাকি দিতে থাকে ও বলে এখনো তোমার শরীর ভালো হয়নি,আমার যদি নিড পূরন না হয় কেন এতো কিছু করবো,বাজার করবো না ইত্যাদি।উনি সব কথা রেকর্ড করে ওনার বোনকে শুনায়।

উনাকে টাচ করতে না দিলেই বলে তোমার অন্য কোথাও রিলেশন আছে।
ওনার বোন বলে আমার ভাই যদি এ ভাবে কন্ট্রোল করে ওর সেক্স নষ্ট হয়ে যাবে,তুমি আসলেই সংসার করবে কিনা,ওর সুখ না হলে,নিড পূরন না হলে বিয়ে করে কি লাভ?

ওনার বোন আমাকে গাইনীর ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায় ও তাড়াতাড়ি কনসিভ করার ঔষধ চায়।হোমিওপ্যাথি ডাক্তারের কাছেও কনসিভ করার ঔষধ চায়।
স্বামী প্রায়ই খোটা দিয়ে বলে আমি চলে গেলে তুমি তো উড়াল দেবা।ওনার বোন বলে তোমার আব্বু আম্মুর লাভ ম্যারিজ হয়েছে এবং তারা বিয়ের আগেই শারিরীক সম্পর্ক করেছে।

আমি বলি আপনার প্রতি ফিলিং আসে না, আমি কি করবো। উনি রেগে গিয়ে বলেন বিয়ের পূর্বে তোমার কোন ছেলের সঙ্গে শারিরীক সম্পর্ক হয়েছে তাই আমার প্রতি ফিলিং আসে না।বলেন তার সঙ্গে তোমাকে বিয়ে দিয়ে দেবো।

আমার এক বান্ধীর বাসায় বেড়াতে যাই।উনি বলেন দেখো তোমার ফ্রেন্ডরা কয় টাকার জিনিস পরে,আর আমি তোমাকে বিয়েতে ৪০ হাজার টাকার লেহেঙ্গা কিনে দিয়েছি,ওরা কি খায় আর আমাদের বিয়েতে কি খাবার দাবার ছিল।

রাতে ঘুমিয়ে যাই। সকালে উঠে দেখি ড্রয়ারে আমার গয়না,ওনার গয়না এমনকি ওনার কাগজ পত্র কিছু নাই।জিজ্ঞেস করি কি করেছেন, উনি বলেন আমি রেখেছি চিন্তা করো না।

আমার মা-বাবার সঙ্গে একদিন উনার কথা কাটাকাটি হয়।উনি বলেন আমি সেইফ ফিল করি না,আমি থাকবো না।পরদিন ওনার বোন আসে,উনি বলেন আমি সরি বলবো না।
সব কিছু দেখে আমি অসুস্হ হয়ে পড়ি।
বুকে প্রচন্ড ব্যাথা হয়।মিটফোর্ড হাসপাতালে ভর্তি হই।

সেখানকার ডাক্তাররা সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে বলেন।

আমার এখন ওনাকে কোন ভাবেই সহ্য হচ্ছে না

আমার কিছু পর্যবেক্ষন ও মন্তব্য:

ক।আমি আগেই উল্লেখ করেছি যে ৮০-৮৫% যৌন সমস্যা মূলত মানসিক সমস্যা।

অনেক ধরনের যৌন সমস্যা রয়েছে

তবে সব চেয়ে কমন সমস্যাটি হলো যৌনতায় কম সক্রিয়/ কম উদ্দীপ্ত হওয়া( hypoactive sexual disorder)।আরেকটি হচ্ছে যৌন অনীহা,ঘৃনা,অরুচি বা বিরক্তি(sexual aversion disorder)।

যৌন অরুচি বা ঘৃনা,বিরক্তি একটি গভীরতর বিরাগ।তারা শুধু যৌনতায় কম উদ্দীপ্ত হয় তা না,তারা সকল প্রকার যৌন স্পর্শকে পর্যন্ত এড়িয়ে চলে।যে কোন যৌন সংস্পর্শকে তারা ঘৃনার সঙ্গে প্রত্যাখান করে থাকে।

এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা কোন এক সময় করা যাবে।এ ক্ষেত্রে এতটুকু বলে রাখি এ দুটি যৌন সমস্যাই মানসিক চিকিৎসায় সারানো যায়।চিকিৎসা নিলে লাবনীর ও তার স্বামীকে এমন করুন ও জটিল অবস্হায় পড়তে হতো না।

এই কেইসের পর্যবেক্ষন:
১। বিয়ের আগেই লাবনী বলেছে তার যৌন জড়তা বা অনাগ্রহ রয়েছে।তার মানে এটি প্রাথমিক স্তরের রোগ যার ভিত্তিমূল গভীরে, যা নিছক বুঝিয়ে সুঝিয়ে ঠিক করার মতন নয়।

২। বিপরীত দিকে তার স্বামী প্রথম দিন থেকে তার প্রতি তীব্র যৌন আকর্ষন বোধ করতো এবং এটিকে সে ও তার বোন নিজেদের অধিকার বলে মনে করে।

৩। এমনকি বিবাহিত জীবনেও স্ত্রীর অমতে জোর করে শারিরীক সম্পর্ক করা যে বেআইনী এটি অনেকের মতন তাদের কারোই জানা নেই।

৪। বেআইনী হোক বা না হোক এটি যে একটি মানসিক রোগ এটি তাদের মতন আমাদের দেশে অনেকেই জানে না।

৫। জোর করলে যে পরিস্হিতি আরো জটিল ও খারাপ হবে এটি তাদের কারো ধারনায় ছিল বলে মনে হয় না।

৬। মনের বিরুদ্ধে জোর করাতে যৌন অনাগ্রহ,অরুচি এখন স্বামী ঘৃনায় রূপ লাভ করেছে।লাবনী এখন বলে আমি তাকে সহ্য করতে পারছি না

৭। অথচ সার্বিক বিবেচনা করলে লাবনী,তার স্বামী,স্বামীর বোন ও লাবনীর আত্মীয় কাউকে খারাপ বলা বা তাদের অবস্হান থেকে খুব একটি অন্যায় কেউ করেছে বলা যাবে না

৮। ভুল শুধু এক জায়গায়, কেউই ভাবতে পারেনি এটি একটি মনো-যৌন সমস্যা যা চিকিৎসায় ভালো করা যায়।
জোর করলে বরং পরিস্হিতি আরো জটিল হয়।

*** যৌনতা মানব জীবনে গুরুত্বপূর্ন বিষয়।তাই লজ্জা করে বা পাপ/ নোংরা জিনিস মনে করে এ বিষয়ে অজ্ঞ থাকলে জীবনে সঙ্কট দেখা দিতে পারে ।

 

 

____________________________

 

 


লেখক অধ্যাপক ডা. তাজুল ইসলাম । সুলেখক। লোকসেবী জনপ্রিয় চিকিৎসক। Professor of Psychiatry at National Institute of Mental Health, Sher-E-Bangla Nagar, Dhaka

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।