Ameen Qudir

Published:
2017-02-11 04:33:47 BdST

হোটেল বারবাস এবং চেনা ভাতের অচেনা গল্প


মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ
_____________________________

 

১।পেশাগত কাজে হোটেল বারবাসে উঠেছি। আমাদের কর্মস্থল দাখমার থেকে হোটেলটি প্রায় ৮০ কিলোমিটার দূরে। বাংলাদেশে থাকবার যায়গা আর কাজের জায়গা এত দূরে হওয়া প্রায় অকল্পনীয়। কিন্তু, ট্রাফিকজ্যাম বিহীন সুগঠিত, পাকা প্রশস্থ রাস্তায় জাতিসংঘের শক্ত - পোক্ত গাড়ি চালিয়ে আসতে ঘন্টাখানেক সময় লাগে মাত্র।প্রতিদিনই অন্তত ২০০ কিলোমিটার যাতায়াত করি।

২।এই এলাকা মরোক্কো আর মৌরিতানিয়ার সীমান্তের কাছে। এই হোটলটা আমাদের বেনাপোল বা চাঁপাইনবাবগঞ্জ এর অনেকটা 'হাই ওয়ে ইন' ভাল হোটেলের মত। ফলে সীমান্তপথে পার হওয়া বড় বড় ক্যারাভান, লরিজাতীয় গাড়ির চালক ও অন্য সহযোগীরা এখানের অন্যতম খদ্দের।সীমান্ত দিয়ে পার হওয়া প্রাইভেট কার, ইন্টারসিটি বাসগুলির যাত্রীরাও এখানে থামে।তাই, খাবারের রেস্তোরা সবসময়ই প্রায় গমগম করতে থাকে। তবে রাতে থাকবার লোক কম থাকায় অনেক রুমই খালি থাকতো। আমরা বেশ কিছু সংখ্যক জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী থাকা শুরু করায় মালিকপক্ষের মুখে হাসি ফুটেছে।

৩।স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষা আরবী। এখান থেকে আটলান্টিক মহাসাগর বেশ কাছে। আবার স্পেন, ফ্রান্সও নিকটেই । হোটেল কর্মচারীরা এই তিনভাষায় দিব্যি কাজ চালিয়ে নিতে পারলেও ইংরেজিতে যা তা। আমার অন্যদেশের সহকর্মীরা এই তিনভাষার অন্তত একটি অনেকেই জানে। শুধু আমিই বিপদে পরে গেলাম। বরাদ্দ হল ১০৯নম্বর রুম। টয়লেটের সমস্যা হাউজকিপারকে বোঝাতে যেয়ে আমাকে কি নাকাল হতে হল তা পাঠকের রুচিশীলতার কথা চিন্তা করে নাইই বা উল্লেখ করলাম।

৪।বিকল্প না থাকায় রুম রেট এবং খাবারের দাম গলাকাটা হলেও ওদের দামই মানতে হল। ভয়াবহ বিপদ হল খাবার নিয়ে । সম্ভবত এই হোটেলে আমি প্রথম বাংগালি খদ্দের। ভাত নাই, ডালের নাম কখনো শুনে নাই। পিজা আর পটাটো চিপস, চিকেন ফ্রাই সব শুকনা শুকনা। গলা দিয়ে নামে না। ভাতের জন্য হাহাকার শুরু হয়ে গেল। স্থানীয় খাবারের এক বিশেষ গন্ধে গা গুলিয়ে গেল। সেটাই তাদের প্রিয় খাবার ' তাজিন '।সেই গন্ধই তাদের ফেভারিট ফ্লেভার।

৫।পরে আমার কথা চিন্তা করে চাল আনা হল। যেখানে একটা রুটির দাম বাংলাদেশের টাকায় দশ টাকার কাছাকাছি, মুরগী পঞ্চাশ টাকা,পেট ভরে যায় প্রমাণ সাইজের পিজার দাম একশো টাকার মত সেখানে একপ্লেট ভাতের দাম পড়লো প্রায় তিনশো টাকা। না পাঠক, আপনার দৃষ্টি বিভ্রান্ত হয় নি ' একপ্লেট ভাত তিনশো টাকা মাত্র '। সারাদিনের অমানুষিক খাটুনির পর সেই শুকনা ভাত দুই - তিন প্লেট দিব্যি টানি। একবেলায় কত টাকার ভাত খেলাম সেটা চিন্তা করে আতংকিত হয়ে পরি। মোটা চাল, রুক্ষ। পেটে গ্যাসজনিত সমস্যা দেখা দিল। তারপরেও ভাত তো!

৬।একদিন ভেতো বাংগালী সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পরবে। নানামুখী কাজে আর ব্যবসা - বানিজ্যে এই অঞ্চল বাংগালীদের কলকাকলিতে মুখর হবে। আর ভাত হবে এই হোটেলের সবচেয়ে চালু মেনু। এই স্বপ্ন দেখার আনন্দে লোহার মত শক্ত, আর খরখরে শুকনো ভাত অমৃত খাবার আনন্দে চিবুচ্ছি তো চিবুচ্ছি, চিবুচ্ছি তো চিবুচ্ছি।

_______________________________

 

লেখক
মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ
ওয়েস্টার্ন সাহারায় কর্মরত।

আপনার মতামত দিন:


ভ্রমণ এর জনপ্রিয়