Ameen Qudir

Published:
2018-06-07 06:02:18 BdST

এক লেখকের কাছে থেকে বই ঘুষ নিল কাস্টমস কর্মকর্তা : বেনাপোল বর্ডারের ঘটনা


 

 


মাসুদ আলম বাবুল
__________________________

শ্যামলী পরিবহনে ঢাকা-কোলকাতা টিকেট কেটে রাত ১০-০০টার গাড়িতে ১১-৩০ এ উঠে সকাল ৬-০০টার মধ্যে বেনাপোল এসে পৌঁছি। বরাবর আমার জন্যে যে ভোগান্তিটা ছিলো তা হলো সাথের লাগেজগুলো নিজেরই বহন করে নেয়া। এবার শ্যামলী পরিবহনের নিজস্ব কুলিরাই দু'প্রান্তে বেশ সুন্দর করে মালামাল পরিবহনের কাজ করছে। আমাকে গাড়ির সুপারভাইজার বললেন, আপনি মালের টোকেন পেয়েছেন?
বললাম, হ্যাঁ পেয়েছি
: তাহলে আর মালের দিকে তাকাবেন না, টোকেন আছে তো আপনার মাল আছে, টোকেন নেই তো আপনার মাল কেউ খুঁজে দেবে না। একদম চুপটি করে সিটে বসে পড়েন।
তবুও মাঝেমাঝে মনের খুতখুতানি কাটেনা। আমি সাধারণত আমার অফিসরুম-আলামারির তালা একবার মেরে দশবার টান দিয়ে দেখি ঠিকআছে কিনা। আমার এহেন দৃশ্য দেখে সহকর্মী, সহকারী ও সহায়করা প্রায়শই হেসে কুটিকুটি। তবুও যে বদঅভ্যাসটি আজো নিরসন করতে পারিনি তাকে এ জনবহুল ভ্রমণে বিশ্বাস আনতে হচ্ছে সামান্য এক টুকরো টোকেনের উপর।
বেনাপলে গাড়ি থেকে নেমেই সুপারভাইজারকে দেখলাম দ্রুত দৌঁড়াচ্ছে আর বলছে, আপনারা সবাই কাউন্টারে আসুন। সুপারভাইজারের কোনো নাগাল পেলাম না। কাউন্টারে গিয়ে আবার ফিরে এলাম গাড়ির কাছে, হেল্পারকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার লাগেজ?
হেল্পার বললো, এখানে তো কোনো ব্যাগট্যাগ কিছুই নেই।
সাথেসাথে শরীরটা কেমন যেনো চমকে উঠলো। বললাম, সে কি!
: টোকেন আছেনা?
: আছে
: ওটা হারাবেন না
দেখলাম আমার জীবনের চেয়েও এ টোকেনটার মূল্য অনেক বেশি। তাই আমি ওটাকে বুক পকেট থেকে সরিয়ে সযত্নে মানিব্যাগে রাখলাম। সাথে থাকা টাকা পয়সার মায়ার চেয়েও টোকেনের প্রতি মায়াটা বেরে যেতে থাকলো। ইমেগ্রেশনের জন্যে লাইনে দাঁড়িয়েছি কতোক্ষণ পরপর হাতটা চলে যায় মানিব্যাগের উপর, শুধু ঐ টোকেনের মায়ায়।

বাংলাদেশ প্রান্ত যখন চেকিং স্কানিং শেষ হলো তখন লেবার পরিবর্তন হলো। সুপারভাইজার এসে বললো, যার যার মালামাল আছে টোকেন জমা দিয়ে লেবারের কাছ থেকে বুঝে নিন। টোকেন ফেরত দিয়ে ব্যাগ দু'টো বুঝে নিয়ে ওদের বকশিশ দিয়ে বিদায় করলাম। লাল শার্ট পরিহিত ওপার থেকে আসা আরেকজন লেবার এসে ব্যাগদুটো চিলের মতো ছোঁ মেরে নিয়ে হাঁটা শুরু করলো।
আমি বললাম, একি! আমি নিজেই পারবো।
সে হাঁটা নয়, একদম দৌঁড়াচ্ছে আর বলছে, কোনো সমস্যা নেই দাদা, খুশি হয়ে যা দেন দিয়েন। একদম গাড়িতে উঠিয়ে দেবো।

দেখলাম আমাদের লাইন আছে, ওদের কোনো লাইন নেই। দু'টো ব্যাগ সমেত লোকটি আমার দৃষ্টিসীমার বাইরে চলে গিয়েছে। আবার টেনশান বেরে গেলো, এবার তো হাতে টোকেনও নেই। একজন ইন্ডিয়ান পুলিশকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা আমি শ্যামলী পরিবহনের যাত্রী কলকাতা যাবো, তো আমার ব্যাগদুটো একজন লেবার কোথায় নিয়ে গেলো তো দেখছিনা ওকে।
তিনি বললেন, আছে, আছে, ওরা কেউ চুরি করেনা, চুরি করে আপনার আমার মতো ভদ্র লোকরা।
সামনে এগিয়ে দেখলাম, কাস্টমসেরর চেকিং এ দাঁড়িয়ে লোকটি।
বললো, স্যার আপনার একটি ব্যাগ তো আটকে দিয়েছে।
: কেনো?
: দেখেন কথা বলে
ঐ ব্যাগটিতে আমার নিজের লেখা কিছু বই, এবং প্রতিবারই বই নিয়ে এখানে একটা ঝামেলায় পড়তেই হয়। তবে প্রতিবারই আমি আমার পরিচয় দেয়ার পর আমাকে আর আটকায়নি, কিন্তু এবারের অফিসারটা বড়ই পেঁচানোর লোক মনে হলো। পরিচয় দেয়ার পর বললেন, বসুন।
আমি বসলাম। সে এক এক করে বইগুলো বের করলো। বললাম, দাদা আমার নিজের লেখা বই বন্ধুদের গিফট করার জন্যে এনেছি।
: আপনি যে গিফট করবেন না কলকাতার বাজারে বেচবেন, তা আমি কি করে বুঝবো?
আমি হেসে দিলাম।
: হাসলেন যে!
: হাসি আসলে চেপে রাখা যায়?
: দেখুন আপনার বইয়ে কোনো রাজনীতি ফাজনীতি বা ধর্মীয় উস্কানিমূলক লেখা আছে?
আমি বললাম, না দাদা ওসব নেই তো!
: নেই তো আপনি বললেন, আমি কি করে বুঝবো?
মেজাজটা গরম হয়ে গেলো। বললাম, দাদা থাক বইগুলো আপনি রেখে দেন, আমি আর ওগুলো কোলকাতা নেবো না, আপনি পড়ে নিয়েন।
: আমার কি বই পড়ার সময় আছে?
: এতো দেখছি মহা-মুশকিল, তাহলে আমি কি করবো?
: আচ্ছা আপনার এ লেখাগুলো কি ধরনের একটু বলবেন কি?
কার মেজাজ ঠিক থাকে, তবুও ধৈর্য্য ধারণ করে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম।
শেষপর্যন্ত তিনি বললেন, ঠিকআছে আপনার একটা বই আমি রাখতে চাচ্ছি, যদি দেন তাহলে আপনাকে ছেড়ে দেবো।
বললাম, রাখেন কোনটা রাখবেন।
তিনি উল্টে পাল্টে দেখে, নিদিরা উপন্যাসটি রেখে দিয়ে বললেন, আপনার ফোন নাম্বারটা দিন, আমি পড়ে আপনাকে মতামত জানাবো।
বললাম, জ্বি দাদা
: আরেকটু কথা..
: কি কথা?
: ঐ আমার ম্যাসেঞ্জার ছেলেটা, ও তো আর বইটই পড়েনা, আমি নাহয় বইটাই ঘুষ মনেকরে রাখলাম ওকে যদি একটু খুশিটুশি, না করলেও আপনাকে আটকাবোনা, আপনি কিন্তু ছাড়া পেয়েই গেছেন।
বুঝলাম, এতোক্ষণ আমি ওনার নিগরে বন্দি ছিলাম। পকেট থেকে একশ টাকা বের করে ছেলেটাকে দিয়ে মালটা খালাস করে উঠতে চাইলাম, তিনি আবার বললেন, একটু বসুন তো!
আমি আর বসলাম না, বললাম কি বলবেন বলেন।
তিনি বললেন, আচ্ছা আপনারা নজরুলের মতো লিখতে পারেন না?
আমি বললাম, না
: কেনো পারেন না?
: আমরা কেউ নজরুল নই বলে। নজরুল ছিলেন বৃটিশ অধিকৃত পরাধিন ভারতের, আমরা স্বাধীন দেশের নাগরিক।
: তাই বলে কি আমাদের সব সমস্যা কেটে গেছে?
: দাদা প্লিজ, আমার সময় নেই, অন্য এক সময় কথা বলবো।
: আচ্ছা, আপনার তারা আছে, আমার ফোন নাম্বারটা নিয়ে যান, প্রয়োজনে কথা হবে।
তার অফিসের ফোন নাম্বারটা সেভ করে নিলাম।
কাস্টমস সেরে ইমেগ্রেশনের আরো একটি ধাপ সামনে রয়েছে। লেবারটা ব্যাগদুটো নিয়ে আবার ছুটে পালালো, বললো, আপনি সব সেরে সুরে আসুন।
সে দীর্ঘ লাইন, তারমাঝে ব্যাগের টেনশান আবার পেয়ে বসলো। অন্যদিকে বাংলাদেশের নেটওয়ার্কের আওতায় থেকে ইচ্ছে করছে, দেশের সবার সাথে কথা বলার শেষ সুযোগটা কাজে লাগাই। সে সুদীর্ঘ লাইন, লাইনের পর লাইন, যেনো পরপারের লিম্বতে দাঁড়িয়ে প্রতীক্ষা করছি কোনো সুবর্ণ সময়ের।
সব পথ মাড়িয়ে বহির্গমনের গেটে এসে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা আমার দু'টো ব্যাগ নিয়ে এসেছে একটি লাল শার্ট পড়া লেবার।
: আপনি কোন গাড়ির যাত্রি?
: শ্যামলী পরিবহন
: ও ঠিক সময় মতো কাউনটারে পৌঁছে গেছে, একদম ভাববেন না।
কাউনাটারে এসে দেখি লোকটি ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কালো ছিপছিপে একটি লোক। অনেক ভোগান্তি, অনেক পেরেসানির পরে লোকটি ব্যাগদু'টো কোলকাতাগামি গাড়িতে উঠিয়ে দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে থাকলো।
জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কি ঘুষ নিবে? বই না অন্য কিছু?
: দাদা কিযে বলেন? জনমে বই পড়েছি!! যারা বই পড়ে ঘুষটাও তারাই খায়, ওটা মনেহয় বইতে লেখা থাকে। কষ্ট করছি, খুশি মতো যা দেন।
না হেসে পারলাম না। কারন বই কখনোই ঘুষের বিকল্প হবেনা, কস্মিনকালেও না। হলে যে কি উপকৃত হতাম!!!!!

##বনগাঁ, কোলকাতার পথে
৬.৬.১৮
________________________________

মাসুদ আলম বাবুল । অধ্যক্ষ, হাজী আক্কেল আলী হাওলাদার ডিগ্রি কলেজ। পটুয়াখালী।

 

আপনার মতামত দিন:


ভ্রমণ এর জনপ্রিয়