Ameen Qudir

Published:
2018-05-09 08:30:02 BdST

চলো যাই কাশ্মীর


 


ডা. সুলায়মান অালম

___________________

 

কাশ্মীর যেন জীবন্ত স্বর্গ। সময় সুযোগ পেলে এই তীর্থ স্থানে বেড়িয়ে আসার চেয়ে পরম পূণ্যের কিছু হতে পারে না। সুন্দরকে দেখা পূন্য। সেই মহান সুন্দর আছে কাশ্মীরে ।
পৃথিবীর যাবতীয় সুন্দর এখানে। সারা জাঁহা সে হিন্দুস্তাঁ সিতারা হামারা -- কবির অমর উচ্চারণ যে পরম সত্য ; সেটা কাশ্মীর গেলে বোঝা যায়। ভারতবর্ষের নয়নমনোহর মনি এই কাশ্মীর।
আমরা ঢাকা থেকে কাশ্মীর গিয়েছিলাম আগরতলা হয়ে।
বলে রাখা ভাল, বিমানে মানে আকাশে যেতে এই রুট সবচেয়ে সস্তা ও সাশ্রয়ী।
আগর তলা থেকে কলকাতা বিমান ভাড়া মাত্র ১৮০০ রুপি। দিল্লি ফ্লাইট আছে। সেটাও সাশ্রয়ী। কলকাতা হয়েই যায়। তবে কোন অদ্ভুত কারণে ভাড়া তুলনামূলক অনেক কম।
ঢাকা থেকে ট্রেনে বা বাসে বা ব্যাক্তিগত গাড়িতে কসবা। আগরতলা হয়ে দিল্লি। দিল্লি থেকে শ্রীনগর। এই লেখায় নানা তথ্য ও বিবরণের জন্য প্রখ্যাত ভ্রমণ লেখক রাহুল বনিকের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।

 

ভূস্বর্গ কাশ্মীর 

 

শ্রীনগর


কাশ্মীরের কেন্দ্র শ্রীনগর যেন সৃষ্টিকর্তার নিজ হাতে আঁকা শহর। কাশ্মীরের মূল সৌন্দর্যের আধার ধরে রেখেছে যে জায়গাগুলো তাদের মধ্যে শ্রীনগর অন্যতম। ঝিলাম নদীর তীরে দাঁড়িয়ে থাকা এই সুন্দর শহরকে পূর্ণতা দিয়েছে চারদিকে ঘিরে থাকা বরফে মাখা বিশাল সব পাহাড়, প্রচুর জনপ্রিয় ডাল লেক আর নাগিন লেক। এখানকার মূল আকর্ষণ ডাল লেকের উপর ভাসতে থাকা হাজারো হাউজবোট আর শিকারা নামক নৌকাগুলো এবং লেকের উপর ভাসমান সবজি বাজার, অপরুপ ফ্লোরা আর ফাউনার বাগান। শ্রীনগরে পর্যটকরা ওয়াটার স্কিং, পাখি পর্যবেক্ষণ, গলফিং, পির পাঞ্জাল পর্যন্ত ট্রেকিং ইত্যাদি জনপ্রিয় কার্যকলাপে মশগুল থাকেন।

 

জম্মু


কাশ্মীরে যেতে হলে প্রথমেই যেতে হবে জম্মুতে। হিন্দুদের দেবী মাতা বিষ্ণু দেবীর আশীর্বাদ প্রাপ্ত এই শহর নিঃসন্দেহে এই অঞ্চলের সবচেয়ে দর্শনীয় স্থানগুলোর মধ্যে একটি। মন্দিরের নগরী শহর নামে খ্যাত জম্মু সেসব পর্যটকদের জন্য যারা আরাম আর মানসিক প্রশান্তি খোঁজেন দূরে কোথাও বেড়াতে গেলে। জম্মুর প্যানগং লেক, রঘুনাথ মন্দির, রবিনেশ্বর মন্দির, মহামায়া মন্দির, পীর বাবা আর পীর কোহের মাজার এখানকার মূল আকর্ষণ। আরো রয়েছে এখানে বাহু দুর্গ আর মুবারক মান্ডি প্রাসাদ। বাহু দুর্গের ভেতরে রয়েছে বাহু মন্দির যা বিশেষভাবে পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় এর স্থাপত্যশৈলীর জন্য। বাহু দুর্গের ভেতর রয়েছে ভারতের সবচেয়ে বড় অ্যাকুরিয়াম, তাও আবার মাটির নিচে।

গুলমার্গ

 


মানুষের সাধারণ কিছু শখের মধ্যে একটি হলো হাতের কাছে চারদিকে শুভ্র বরফের আচ্ছাদন দেখা, সেই বরফে খেলা করা। ভারতের একটিমাত্র জায়গায় সারা বছর দেখা মেলে বরফের, সেটি হলো কাশ্মীরের গুলমার্গ। শ্রীনগর থেকে ৫২ কিলোমিটার দূরের গুলমার্গে বরফ দেখা ছাড়াও করা যায় বরফে স্কিং, স্নোবোর্ডিং, গলফিং, মাউন্ট বাইকিং, মাছ ধরার মতো লোভনীয় সব কাজ-কারবার। গুলমার্গের মূল আকর্ষণ কংদোরি, শার্ক ফিন আর অপারাথ শৃঙ্গের মতো দুর্দান্ত কিছু শৃঙ্গ। ট্রেক করে যাওয়া যায় কালিনমার্গ, নাগিন ভ্যালি, ফ্রোজেন লেক, বোটা পাথরি আর বাবা রিশিতে।

গুলমার্গ

 

গুলমার্গের সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা গন্ডোলাতে যাওয়া যায় ক্যাবল কারে চেপে। দুটো ধাপে গড়া এই গন্ডোলাতে নভেম্বর থেকে এপ্রিলে গেলে প্রথম ধাপেই চারদিকে দেখা যাবে বরফের ছড়াছড়ি, অন্য কোনো সময় গেলে যেতে হবে দ্বিতীয় ধাপ পর্যন্ত।

 

কারগিল

 


ভারত-পাকিস্তান সীমান্তে লাদাখের জোজিলা পাসের সাথে যুক্ত কারগিলকে বলা হয় ব্রেইভ হার্ট মানে সাহসী হৃদয়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৮০০ মিটার উচ্চতায় অবস্থিত কারগিল কাশ্মীরের অন্যতম পর্যটন স্থান। কাশ্মীরে ট্রেকিংয়ের প্ল্যান করছেন কিন্তু কারগিলকে বাদ রাখছেন এমন ট্রেকার পাওয়া সত্যিই দুষ্কর। ট্রেকার স্বর্গ কারগিলে প্রতি বছর পেনসি-লা লেক, সুরু ভ্যালি ট্রেক করতে আসেন প্রচুর ট্রেকার, মাউন্টেইনার, ক্যাম্পার আর রাফটাররা। কারগিলে দেখা মিলবে তুলু-লিং, মুশকু ভ্যালি আর টাইগার হিলের। কারগিল থেকে হাঁটা দূরত্বে রয়েছে গোমা কারগিল যেখানে কারগিল সাজিয়ে রেখেছে মুলবেক গোম্পা, শেরগল, উরঘ্যান জং আর ওয়াখা রিগ্যালের মতো দুর্দান্ত সব দৃষ্টিনন্দন স্থান।

সোনমার্গ

 


বলার অপেক্ষা রাখে না যে কাশ্মীর ভ্রমণ পুরোটাই বৃথা হয়ে যাবে কেউ যদি কাশ্মীর গিয়ে সোনমার্গে না যায়। ট্রেকারদের জন্য তো বটেই সাধারণ পর্যটকদের জন্য অল্প হাঁটা পথে যেতে হয় এমন অসাধারণ সব সৌন্দর্যের ভাণ্ডার সাজিয়ে রেখেছে সোনমার্গ। সোনমার্গের মূল আকর্ষণ গঙ্গাবাল লেক, কিশানসার লেক, ভীষাণসার লেক, নারানাগ, বালতাল, থাজিওয়াস তুষারনদী। সোনমার্গ থেকে ১৫ কিলো দূরের বালতাল অমরনাথ যাত্রার বেস ক্যাম্প হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর সোনমার্গ গেলে জোজিলা পাসে যাওয়াটা কর্তব্যের ভেতর পড়ে অনেকটা।

জোজিলা পাস

 

জোজিলা পাসই সেই পাস যা কাশ্মীর আর লাদাখকে যুক্ত করেছে, প্রকৃতি যেখানে তার সৌন্দর্য ঢেলে দিতে কার্পণ্য করেনি বিন্দুমাত্র।

প্যাহেলগাম

 


সবুজের তৃণভূমি আর পাহাড়ের বিশালতার হাত ধরে প্রশান্তি আর অপার্থিবতা মর্ত্যে নেমে আসে পেহেলগাম দিয়ে। কাশ্মীরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে চাইলে পেহেলগামে যে আপনাকে আসতেই হবে। ছোট গোছানো এই শহরে বিরক্ত করার মতো রাখা হয়নি একটি উপাদানও। প্যাহেলগামে ঘুরে দেখা যাবে আরু ভ্যালি, বেতাব ভ্যালি, বাইসারান, শিষনাগ, তুলিয়ান লেকের মতো অপরুপ কিছু জায়গা যা মস্তিষ্ককে দেবে প্রশান্তি আর চোখকে বলবে সৌন্দর্যের সংজ্ঞা। ঘোড়সওয়ারি থেকে শুরু করে ট্রেকিং, গলফ খেলার মতো কর্মকাণ্ডে মেতে ওঠা যায় প্যাহেলগামে। কাশ্মীরের সবচেয়ে উন্নত শহর হচ্ছে প্যাহেলগাম, তাই থাকা-খাওয়ার চিন্তা করতে হবে না একেবারেই।

নুব্রা ভ্যালি

 


কেমন হয় কোনো শহর যদি গড়ে ওঠে দুটি নদীর মিলনস্থলে? পৃথিবীতে কিছুই অসম্ভব নয়, নুব্রা ভ্যালি তারই একটি উদাহরণ। কাশ্মীরের শীর্ষস্থানীয় পর্যটন স্থানগুলোর মধ্যে নুব্রা ভ্যালি একটি। শিয়ক নদী আর শাইচেন নদীর মিলনস্থলে গড়ে ওঠা এই শহরে পাওয়া যাবে অপার জলরাশির ল্যান্ডস্কেপ আর হাজার রকমের প্রাণ-বৈচিত্র। অবাক হলেও সত্যি, কাশ্মীরের মতো জায়গায় মরুভূমির দেখা পাওয়া যাবে একমাত্র নুব্রা ভ্যালিতে। যে কেউ চাইলেই চড়ে বসতে পারে এখানকার বিখ্যাত ব্যাকট্রিয়ান উটের পিঠে। নুব্রা ভ্যালি থেকেই যাওয়া যায় বিশ্বের সবচেয়ে উঁচু মোটরচালিত বাহনের রাস্তা খারদুংলা পাসে। আরো রয়েছে নুব্রা ভ্যালির পানামিক গ্রাম যা এখানকার শেষ গ্রাম যে জায়গার পরে পর্যটকদের আর যাওয়ার অনুমতি নেই।

যেভাবে যাবেন:

 

জম্মু তাওয়াই

ঢাকা থেকে কলকাতা হয়ে অন্য সব পথ্রে যেতে পারেন। ট্রেন হল ভারতবর্ষের মর্যাদার পরিবহন।


কোলকাতার হাওড়া থেকে জম্মু-কাশ্মীরের উদ্দেশ্যে দুটি ট্রেন ছেড়ে যায়, জম্মু তাওয়াই আর হিমগিরি। জম্মু তাওয়াই প্রতিদিন চলাচল করে আর হিমগিরি চলাচল করে শুধুমাত্র মঙ্গল, শুক্র এবং শনিবার। সময় লাগে ৩৬ ঘন্টার মতো, ভাড়া পড়বে ১,২০০ থেকে ৫,০০০ রুপি শ্রেণীভেদে। জম্মু নেমে সেখান থেকে বাসে অথবা গাড়িতে করে চলে যাওয়া যায় শ্রীনগর বা প্যাহেলগামে। জম্মু থেকে শ্রীনগর বাসে খরচ ৮০০-১,৫০০ রুপি আর গাড়িতে পড়বে ৫,০০০-৮,০০০ রুপি, সময় লাগবে ৮-১০ ঘন্টা।

জম্মু থেকে প্যাহেলগাম যেতে হলে গাড়ি ভাড়া করতে হবে, ভাড়া পড়বে ৭,০০০-৮,০০০ রুপি। জম্মু থেকে শ্রীনগর যাওয়ার পথে যদি একটি অ্যাডভেঞ্চারের স্বাদ নিতে চান তাহলে জম্মু থেকে ৫২ কিলো দূরে উদামপুর নাগাদ হয়ে সেখান থেকে ১৫২ কিলো দূরে বানিহিল নাগাদে পৌঁছাতে হবে। বানিহিল থেকে শ্রীনগর পর্যন্ত রেলে যাওয়া যায়, তবে অ্যাডভেঞ্চার সেটা নয়। অ্যাডভেঞ্চার হলো এই পথে আসলে পথে ১১,২৫০ মিটার লম্বা টানেলের মধ্যে দিয়ে আসতে হবে, যা হবে অদ্বিতীয় এক অভিজ্ঞতা।

তথ্যাদি বিশ্বস্ত। সুদক্ষ ভ্রমণ গাইডদের পরামর্শ মত লেখা।

ভূস্বর্গ কাশ্মীর 

 

আপনার মতামত দিন:


ভ্রমণ এর জনপ্রিয়