Dr. Aminul Islam

Published:
2021-12-20 22:53:34 BdST

পরীক্ষায় নকল :আমার কৈশোর এবং প্রণম্য একজন শিক্ষক


 

ডা. সুরেশ তুলসান
--------------------------------
এস এস সি পরীক্ষা।
১৯৮১ সাল।
বিষয় -- হিন্দু ধর্ম।
পরীক্ষা কেন্দ্র, জিলা স্কুল, কুষ্টিয়া।
নকল করার অভ্যাস আমার কোন দিনই ছিলনা।
গীতার মাত্র কয়েক লাইনের ছোট্ট একটি শ্লোক।
কোনভাবেই মুখস্থ করতে পারছিলাম না।
ছোট একফালি পাতলা ফিতার মত চওড়া (About 5x1cm) কাগজে শ্লোকটা কুটিকুটি (খুব ছোট ছোট অক্ষরে) করে লিখে পকেটের এক কোনায় গুঁজে রেখেছিলাম।
আমার সিট এক্কেবারে সামনে ফার্স্ট বেঞ্চে।
ইনভিজিলেটর স্যারের টেবিলের জাস্ট মুখোমুখি।
শুনলাম ইনি জিলা স্কুলের পন্ডিত স্যার।
ভিষন কড়া।
প্রশ্নপত্র হাতে নিয়ে দেখি প্রথম প্রশ্নটাই সেই শ্লোক।
আগেই বলেছি নকল করে আমি অভ্যস্ত না।
স্যার তখন টেবিলের ওপাড়ে দাঁড়িয়ে পেপার ওয়ার্কে ব্যাস্ত।
পরীক্ষার শুরুতেই সেই একচিলতে কাগজের ফালিটা বের করে শ্লোকটা লেখা শুরু করলাম ( বুদ্ধি করে পরে লিখতে পারতাম বা স্যার সরে গেলে লিখতাম কিন্তু সেই বুদ্ধিও আমার তখন হয়নি)।
শ্লোকটা লেখা কেবল শুরু করেছি।
যথারীতি ধরা পড়ে গেলাম।
স্যার খাতা কেড়ে নিয়ে হল থেকে বের করে দিলেন ( যাকে সম্ভবত Expelled বলে)।
ছোটকালে বেশ লাজুক, বোকা আর প্রচন্ড অভিমানী ছিলাম।
কোন রকম কাকুতিমিনতি, আবদার বা প্রতিবাদ না করে হল থেকে বের হয়ে আসলাম। চোখে এক ফোটা অশ্রু আসতে পারতো, তাও আসেনি।
এই ঘটনায় আমার মনে তাৎক্ষনিক তেমন বড় কোন দাগকাটা বা আমার খুব বেশী মন খারাপ হয়েছিল বা মাথা নিচু করে বের হয়েছি বলেও আমার তেমন মনে পড়ে না।
এজন্য খুব বেশী অপরাধবোধ বা একারনে আমার কি পরিমান ক্ষতি হতে পারে তেমন কোন ধারনাও সম্ভবত তখন ছিলোনা আমার।
আমি এমনিতেই একটু দ্রুত হাঁটি।
লম্বা করিডোর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বেশ অনেকটাই চলে এসেছি। প্রায় সিঁড়ির কাছাকাছি।
পিছন থেকে কে যেন ডাকছেন।
এই ছেলে দাঁড়া।
এই ছেলে দাঁড়া।
ঘুড়ে তাকাতেই দেখলাম পন্ডিত স্যার।
স্যারকে বেশ উদ্বিগ্ন মনে হলো ।
বুঝলাম আমার পিছনে ভালোই দৌড়াতে হয়েছে বেচারাকে।
কানে শুনতে পাস না।
বলেই হাত ধরে হনহন করে টানতে টানতে পরীক্ষার হলে নিয়ে গেলেন।
আমাকে সিটে বসিয়ে খাতাটা ফেরৎ দিয়ে বললেন,লেখ।
শ্লোকটা না পারলে শুনে নিস।
বসে প্রথমেই শ্লোকটা লিখলাম।
এবং আশ্চর্যের বিষয় সম্পুর্ন শ্লোকটাই লিখতে পারলাম নির্ভুলভাবে।
স্যার বললেন পারিস যখন নকল করতে গেলি ক্যান।
বুদ্ধিশুদ্ধি নাই ফার্স্ট বেঞ্চে বসে প্রথমেই কেউ নকল বের করে নাকি ?
স্যার বেশ কয়েকবার এসে খোজ নিলেন।
বুঝলাম আমি কি লিখছি না লিখছি তিনি আড়চোখে সেটা দেখছেন।
আমি যেমন উনার কাছ থেকে কোন সাহায্য চাইনি উনিও আগবাড়িয়ে কোন উত্তর বলে দেননি।
সম্পুর্ন পরীক্ষাটা বেশ ভালোভাবেই দিলাম।
পরীক্ষা শেষে আরেকবার ভর্ৎসনা সুরে বললেন - ভালোইতো পরীক্ষা দিলি।
এসব করিস ক্যান ?
সেই আমি আজ স্নাতকোত্তর সার্জারির ডাক্তার।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজের শিক্ষক।
সেদিনকার সেই পিছলে পড়া অবস্থায় এই পন্ডিত স্যার যদি পিছন থেকে টেনে ধরে না তুলতেন তাহলে এতদিন হয়তো মাটি-জল-কাদায় লুটোপুটি।
এত উপরে কি আর উঠতে পারতাম ?? ?? ??
আমিতো কুষ্টিয়া জিলা স্কুলের ছাত্র ছিলাম না। অন্য স্কুলের ছাত্র। কুষ্টিয়া জিলা স্কুলে সিট পড়েছিল তাই সেখানে পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম মাত্র। পণ্ডিত স্যারকে তো আগে কখনও দেখিনি, চিনতাম না, জানতামও না। স্যারও আমাকে চিনতেন না বা জানতেন না। আমি উনার সরাসরি ছাত্রও ছিলাম না। এমনও না যে উনার কাছে কোনদিন প্রাইভেট পড়েছি। অথচ আমার প্রতি উনার সেইদিনকার সেই মমত্ববোধ আজ আমাকে এত উপড়ে উঠতে সাহায্য করলো। সেদিন তিনি এমনটা না করলেও পারতেন। বরং আমার প্রতি সহানুভূতির এই হাত বাড়ানোর কারনে কেন্দ্রের দায়িত্বপ্রাপ্ত ম্যাজিস্ট্রেট এর কাছ থেকে তিনি তিরস্কার বা অন্যকোন শাস্তিও পেতে পারতেন।
তখনকার দিনে একটা বিষয় খেয়াল করতাম। পরীক্ষার হলে পরীক্ষা চলছে। সকলে মনোযোগ দিয়ে লিখছে। কেউ হয়তো একট আধটু নিজেদের মধ্যে কথা বলছে, একজন আর একজনকে আড়চোখে খাতা দেখাচ্ছে,কেউবা টুকলি করছে। সহসাই স্যাররা সাবধান করে দিতেন। ম্যাজিস্ট্রেট আসছেন। পরীক্ষার হলে তাৎক্ষনিক সুনসান নিরবতা নেমে আসতো।ম্যাজিস্ট্রেট শব্দের অর্থ তখন বুঝতামনা। ভাবতাম শিক্ষা বোর্ডের উচ্চপদের ক্ষমতাবান কোন কর্মকর্তা হবেন হয়তো, যাদের দায়িত্ব থাকে বিভিন্ন কেন্দ্রে পরীক্ষা সুষ্ঠ ভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কিনা সে সম্পর্কে দেখভাল এবং খবরদারি করা।
পরে বুঝেছি উনারা শিক্ষা বোর্ড বা শিক্ষা মন্ত্রণালয় এর কেহ নহেন। প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। কেন্দ্রের আইনশৃঙ্খলা দায়িত্বের পাশাপাশি পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলো উনারা দেখভাল করেন। আইনশৃঙ্খলা বিষয়টা উনারা দেখবেন এটা হয়তো স্বাভাবিক তবে পরীক্ষা সংক্রান্ত বিষয়গুলো দেখভাল করার জন্য কি শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নিজস্ব দক্ষ জনবল কি তৈরি করা যেত না। এতে করে দেশে শিক্ষার মানের আরও উন্নতি হতে পারতো। জানিনা এবিষয়ে উন্নত বিশ্বে কি পদ্ধতি অবলম্বন করে।
জীবন চলার পথে কত তুচ্ছ তুচ্ছ কারনে পা পিছলে পড়ে যাওয়ায় অনেক মানুষ তাদের স্বীয় যোগ্যতা অনুযায়ী নিজ নিজ প্রাপ্য লক্ষ্যে পৌছাতে পারেন না।
জীবনে সাকসেসফুল এবং বড় বড় পদে/অবস্থানে অধিষ্ঠিত অনেক মানুষকে খুব কাছ থেকে দেখেছি আনসাকসেফুল এমনকি তাদের তুলনায় সামান্য একটু পিছিয়ে পড়া মানুষকে অবজ্ঞা এবং তুচ্ছ্য তাচ্ছিল্য এবং খারাপ আচরণ করেন সহসাই। অথছ একবারও তারা ভেবে দেখেন না এদের মধ্যে অনেকের যোগ্যতাই হয়তো তাদের চেয়ে বেশী বা তাদের সমান যোগ্য অনেক ব্যাক্তি থাকতে পারেন যিনি হয়তো সামান্য কোন কারনে একটা কোন হোঁচট খেয়ে পিছিয়ে পড়েছেন।
তাই আমার সামনে যে মানুষগুলো প্রতিদিন প্রতিনিয়ত আসেন তাদের কাউকেই আমি কখনও খাটো করে দেখি না।

প্রণাম স্যারকে।

এর পর আর কোনদিনই কোন পরীক্ষায় নকল করা হয়ে ওঠেনি।
সেটাই ছিল জীবনের প্রথম আর শেষ।

পুনশ্চ :-- আমার এই পোস্টটা ফেসবুকে দেখার পর ভারত থেকে দুলাল কুমার পাল নামে ভারতে স্যারের বাসার পাশের একজন প্রতিবেশী ফোন করে জানালেন স্যারের প্রকৃত নাম অমল কৃষ্ণ গোস্বামী।
স্যার গত ২০১৭ সালে ভারতের নদীয়া জেলার বেঠুয়াডহরিতে বসবাসরত অবস্থায় পরলোক গমন করেছেন।
তাই যদি হয় তাহলে স্যারের কাছে অবনত মস্তকে করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি নিজ মাতৃভূমি ত্যাগ করা এবং জন্মভূমিতে দেহত্যাগ করার সুযোগ এবং অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার জন্য।
তা সে যেকারনেই হোক।

ডা সুরেশ তুলসান।
কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ।

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়