ডেস্ক

Published:
2021-05-07 12:45:18 BdST

ডা. মাসুদ পারভেজ এবং একটি অপ্রকাশিত ছবির গল্প


 

ডা.তারিক রেজা আলী
সহযোগী অধ্যাপক,
রেটিনা,বিএসএমএমইউ
______________________

 

মৃত্যু সংবাদ পেতে ভালো লাগেনা। দিতে আরও না। অথচ আমি অবলীলায় এক মৃত্যু সংবাদ দিতে যাচ্ছি। কারণ হলো নিজেকে স্বান্তনা দেওয়া। আমি যেহেতু এখনো বেঁচে আছি আমাকে তো স্বাভাবিক থাকতে হবে। জীবনমুখী আচরণ করার জন্য এক অপ্রকাশিত ছবির গল্প বলাকে বেছে নিলাম।

গত ফেব্রুয়ারিতে আমি আর মাসুদ ভাই একই গাড়ীতে চক্ষু চিকিৎসক সমিতির অফিস মীরপুরে এসেছিলাম। মাসুদ পারভেজ ভাই হলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের চক্ষুবিভাগের বিভাগীয় প্রধান। দুজনেই ছিলাম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় ডিপ্লোমা পরীক্ষার পরীক্ষক। পরীক্ষা শেষ হলে মীরপুর যাব, দুজনের উদ্দেশ্য কিন্তু ভিন্ন। আমি যাব মহাসচিব পদে মনোনয়নপত্র জমা দিতে, মাসুদ ভাই যাবেন ছেলের বাসায়। চট্টগ্রাম থেকে প্লেনে ঢাকা নেমে সরাসরি গিয়েছেন শাহবাগ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখন প্রায় দুপুর। আমি বললাম, মাসুদ ভাই চলেন না ওএসবি অফিসে। আরও অনেকেই থাকবে, দেখা হবে, আপনার ভালো লাগবে। একটু ইতস্ততঃ করছিলেন তিনি। স্বগতোক্তি করলেন, 'আমার মেয়েটা অপেক্ষা করছে'। বুঝলাম কদিন আগে ছেলেকে বিয়ে দিয়েছেন, নতুন বৌমাকেই মেয়ে হিসেবে সম্বোধন করছেন। খুব ভালো লাগলো। ওএসবিতে নামার জন্য আর পীড়াপীড়ি করলাম না। মাসুদ ভাই কিন্তু নিজেই মত পরিবর্তন করলেন। আজীবন বন্ধুবৎসল মাসুদ ভাই বৌমার সাথে সাক্ষাৎ একটু বিলম্বিত করে চলে এলেন আমার সাথে। ওএসবি ভবন তখন অনেক সদস্যের পদভারে কম্পিত। সবাই এসেছেন মনোনয়ন পত্র জমা দিবেন। আমি এবং আমরা ব্যস্ত কাগজ-পত্রের তত্ব-তালাশিতে। মাসুদ ভাই ঘুরে ঘুরে দেখা করছেন সবার সাথে, প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিচ্ছেন। কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাঁর দরাজ গলা শুনছি। যখন জমা দেব আমারটা, বক্সে ফেলবো নিজের মনোনয়ন পত্র, মজা করেই বললাম, মাসুদ ভাই ছুঁয়ে দিন আমার কাগজ। আপনার আশীর্বাদ তাহলে থাকবে আমার সাথে। বলতেই হাসি মুখে এগিয়ে এলেন, আমরা দুজনে একসাথে বক্সে ফেললাম কাগজ। ছবি তুলে দিলেন এক স্বাস্থ্য কর্মী। এরপরেই গম্ভীর হয়ে বললেন, "এই ছবি এখন কাউকে দেখাবেন না। তাহলে সবাই ভাববে আমি খোলাখুলি আপনার সমর্থনে কাজ করছি। সেটা ভালো দেখাবে না।"

পেশাজীবি নির্বাচন একটু ভিন্ন। মেনে নিলাম তাঁর কথা। কোথাও পোষ্ট করি নি এই ছবি। কাল রাত ১১ টার দিকে যখন জানতে পারলাম কিছুক্ষণ আগে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তিনি অন্য ভূবনে, অনেকক্ষণ কিংকর্তব্যবিমুঢ় ছিলাম। কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। এই সেদিন নির্বাচনী প্রচারে চট্টগ্রাম গেলাম, সারাদিন একসাথে কাটিয়ে এলাম। এরপরেও কতবার কথা হয়েছে৷ সেই তিনি এভাবে চলে যাবেন? সুঠাম দেহের অধিকারী, জানা মতে কোন গুরুতর রোগ ছিল না। ছাত্র জীবনে ক্যাডেট কলেজের বাস্কেটবল দলের অপরিহার্য সদস্য ছিলেন তিনি। চুল-দাড়ি পেকে সাদা হয়ে যাওয়াতে বয়স অনেক বেশী লাগতো। কিন্তু কথা বলতেন যখন, সাথে ছিল সেই মনোমুগ্ধকর হাসি মুখ, ছাত্র-ছাত্রী থেকে আমরা সবাই বুঝতে পারতাম কতোটা তরুণ ছিলেন তিনি ঐ সফেদ শস্রুমণ্ডলের আড়ালে।

কোন কাজে মন বসাতে পারছি না। তাঁর সাথে আমার ইদানীং কোন ছবি আছে কী না তা খুঁজতে খুঁজতেই বের হলো এই ছবি। মনে পড়লো তাঁর উপদেশ বাণী, কোথাও যাতে পোষ্ট না করি নির্বাচনের আগে৷ এতোই ঠুনকো যদি হয় জীবন, অজু করে তারাবীর নামাজ আদায়ের প্রাক্কালেই যদি চলে যেতে হয় না ফেরার দেশে, তাহলে কেন এই পণ্ডশ্রম? কত কষ্ট করে এমএস পাশ করেছেন, এফসিপিএস পাশ করেছেন, শিখেছেন চোখের সূক্ষ্ম অপারেশন তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। কিসের নেশায় আমরা করি এসব? কি প্রয়োজন এই কন্টকশয্যায়? এর থেকে তো ঢের ভালো বনভূমে বৃক্ষতলে পত্র শোভিত ধুলি শয্যা।

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়