Dr. Aminul Islam

Published:
2020-07-29 11:16:00 BdST

কলাগাছ ও এক পান্ডেবাবু



পান্ডে বাবুর ছবি

ডাঃ সুকুমার সুর রায়


___________________________

পান্ডে বাবুর সাথে কবে, কখন, কিভাবে, পরিচয় হয়েছিলো তা আর মনে পড়ে না।
তবে এটুকু মনে পড়ে, রাজশাহীর চারঘাট থেকে বদলি হয়ে যখন এখানে এসে জয়েন করি, তার কিছুদিনের মধ্যেই তিনি আমার চেম্বারে এসেছিলেন।
সেও আজ ২৫ বছর আগের কথা। তখন আমার বয়স ৪০ ছুঁইছুঁই। ওনার বয়স সম্ভবত ৪৫ এর মত হবে।
প্রথম সাক্ষাতেই মনে হয়েছিলো তিনি একজন নিখাদ ভদ্রলোক।
একজন সজ্জন, সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষ।

স্থানীয় মোহনপুর কে, এম, হাইস্কুলের শিক্ষক ছিলেন তিনি।
তিনি কেমন মাপের শিক্ষক ছিলেন তা একটি উদাহরণ দিলে পরিস্কার হবে।
কোন একদিন লাহিড়ী মোহনপুর বাজারে দৈবক্রমে তার সাথে দেখা হয়েছিলো। ঠিক একই সময়ে তৎকালীন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল সাহেব সামনাসামনি হতেই, পান্ডে বাবুর পা ছুয়ে সালাম করলেন।
বুঝলাম পান্ডে বাবু হয়তো ডাইরেক্ট শিক্ষক।
কিন্তু তাই বলে একটি রাজনৈতিক দলের নেতা, এবং ইউনিয়ন পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান! প্রকাশ্যে বাজারের মধ্যে অনেক লোকজনের সামনে তার শিক্ষককে পা ছুয়ে সালাম করতে পারেন এরকমটি বর্তমান কালে আর দেখা যায় না। নিঃসন্দেহে চেয়ারম্যান সাহেব মহানুভব ব্যাক্তি ছিলেন।
আবার সেই মহান ব্যাক্তির, মহান শিক্ষক, ছিলেন এই পান্ডে বাবু।

সেই মহানুভব শিক্ষক পান্ডে বাবু বয়সে আমার সিনিয়র হলেও কেমন করে যেন কালক্রমে আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধুতে পরিণত হয়ে গেলেন।
পান্ডে বাবু আমার চেম্বারে কোন কাজে এলে, এক কাপ চা দিয়ে বসিয়ে রাখতাম। যাতে রোগি দেখা শেষে তার সাথে অনেকক্ষন আড্ডা দিতে পারি এইটিই ছিলো মূল উদ্দেশ্যে।

পান্ডে বাবুর পুরা নাম ছিল ' হারান চন্দ্র পান্ডে '।
পান্ডে বাবুর বাড়ি ছিলো শ্যামপুর গ্রামে। গ্রামের পাশ দিয়ে রেললাইন চলে গেছে। তাই গ্রামের নাম ' রেললাইন শ্যামপুর '।

তিনি যেমন আমার বাড়ি আসতেন, আমিও প্রায়শই যেতাম পান্ডে বাবুর বাড়ি।

শ্যামপুর গ্রামে পান্ডে বাবুদের বাড়ি 'ঠাকুর বাড়ি' নামে পরিচিত ছিলো।
কারন ওনারা ছিলেন উড়িয়া ব্রাম্মন।

পান্ডে বাবুরা চার ভাই। প্রত্যেক ভাইয়ের ঘরভর্তি ছেলেমেয়ে। গ্রামের মধ্যে অবস্থাসম্পন্ন পরিবার হলো ' ঠাকুর বাড়ি '।

হারান চন্দ্র পান্ডের পিতার নাম ছিল ' ' রামপ্রসাদ পান্ডে '। রাম প্রসাদ পান্ডের পিতার নাম ছিলো 'সারদাপ্রসাদ পান্ডে।' সারদাপ্রসাদ পান্ডের পিতার নাম ছিলো ' জয়রাম পান্ডে '।
এই 'জয়রাম পান্ডেই' বহু আগে ব্রিটিশ আমলের কোন এক সময়ে, সুদূর উড়িষ্যা থেকে এই শ্যামল পুর্ববঙ্গের এক অখ্যাত গ্রাম শ্যামপুরে এসে বসতি স্থাপন করেছিলেন।
জয়রাম পান্ডে তার একমাত্র পুত্র সারদাপ্রসাদকে রেখে মারা যান।
সারদাপ্রসাদের একমাত্র পুত্র রামপ্রসাদ।
সেই রামপ্রসাদের জৈষ্ঠ্য পুত্র হারান চন্দ্র পান্ডে আমার বন্ধু।

ঠাকুরবাড়ি যেতে আমার বেশ ভাল লাগতো।
গ্রামের মধ্যে বর্ধিষ্ণু এক পরিবার।
বাড়ির অন্যান্য ভাই বউয়েরা বিয়ে হয়ে এসেছে অনেক দূর দূরান্তের জেলা থেকে। আবার পান্ডে বাড়ির মেয়েরাও বিয়ে হয়ে চলে গেছে অনেক দূরে দূরে। নেত্রকোনা, যশোর, বরিশাল, এইরকম দূর দূরান্তে তাদের আত্মীয় স্বজন।
এদেশে তারা খুবই সংখ্যালঘু, এটাই হয়তো এর মূল কারন।

পান্ডে বাড়িতে গেলেই একজন চিকিৎসক হিসাবে বৃদ্ধ রামপ্রসাদ বাবুকে দেখতে হতো।
নব্বই বছর বয়সী রামপ্রসাদ বাবুর হাইপ্রেশার ছিলো , ডায়াবেটিস ছিলো, কিডনির সমস্যা ছিলো।
এতদসত্বেও তার মুখটি ছিলো হাসি হাসি।

পিতৃতুল্য হলেও, তার সাথে হেসে হেসে কৌতুক করতাম অবলীলায়।
তিনি যখন নানাবিধ স্বাস্থ্য সমস্যার সমাধান চাইতেন, তখন আমি অবলীলাক্রমে বলতাম, ''এখন তো আপনার বয়স হয়ে গেছে, সব সমস্যার তো সমাধান হবে না। এখন পরকালের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। "

"এই যে আপনার বাড়িতে কলা গাছের ছোপ দেখা যায়। যে গাছের কলা বাত্তি হয়ে যায়, সেই গাছটির মাঝখানে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে গাছটিকে ভূপাতিত করে কলার কাঁদিটি কেটে নেওয়া হয়।
সেই সাথে তরকারি খাওয়ার জন্য কলা গাছের ভিতরের ' কান্দাল' টিও বের করে নেওয়া হয়।
এরপরে কলার পাতা, কলার ডাগুর, কলার ঢোঙ্গা, গোরুর খাবারে পরিনত হয়।
আগের দিনেতো আস্ত কলাগাছটি কুচি কুচি করে কেটে, রোদে শুকিয়ে, আগুনে পুড়িয়ে, ছাই তৈরি করা হতো! তারপর সেই ক্ষারযুক্ত ছাই দিয়ে সাবান সোডার মত জামাকাপড় পরিস্কার করার কাজ করা হতো।

এতে " কলাগাছের " কোন দুঃখ নাই।
তার জীবন সার্থক।
তার এই আত্মবলিদানের আগেই তার গোড়া থেকে একাধিক 'কলার পোয়া ' বের হয়ে যায়, যেগুলি হয় ভবিষ্যতের কলাগাছ!।
এই ভাবে জীবনের প্রবাহ অনাদিকাল ধরে চলতে থাকে।!

আপনি হলেন এইরকম এক "সার্থক কলাগাছ। "
আপনার আগে ছিলেন সারদাপ্রসাদ পান্ডে। তারও আগে ছিলেন জয়রাম পান্ডে। যিনি উড়িষ্যা থেকে এসে এইখানে কলার ছোপ বুনেছিলেন।

এখন আপনার চলে যাবার সময় হয়ে গেছে।
আপনার 'পোয়ারা ' এরপর পুর্নাঙ্গ কলাগাছে পরিনত হবে। তারপর তারাও কিছু 'পোয়া' রেখে এই ভবসংসার ত্যাগ করে চলে যাবে!"

২০ বছর আগে ইয়ার্কিচ্ছলে বলা এই কথা গুলি অক্ষরে অক্ষরে ফলে গেছে!

রাম প্রসাদ পান্ডে অনেক আগে মারা গেছেন।
তার পুত্র আমার একান্ত বন্ধু হারান চন্দ্র পান্ডে রিটায়ার্মেন্টের অল্পদিন পরেই পরলোকে চলে গেছেন! যিনি ছিলেন আমার একান্ত সুহৃদ।

আমার পাড়া, আমার মহল্লায়, অনেক পরিনত মানুষকে আর দেখা যায় না।
পুর্নাঙ্গ "কলাগাছের " মতো তারা বিদায় নিয়ে চলে গেছেন।
বর্তমানের এই নিদারুন করোনাকালে পরিনত এই সকল মানুষদের চলে যাওয়াটা অনেক বেশি ত্বরান্বিত হয়ে গেছে!

আমি নিজেও এখন পরিনত "কলা গাছ!"
কখন চলে যেতে হবে কে জানে!

মাঝে মাঝে চমকে উঠি! শিউরে উঠি!
এত তাড়াতাড়ি চলে যেতে হবে!?
'পোয়ারা'তো এখনো পোক্তই হয়নি !!

##

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়