Ameen Qudir

Published:
2020-04-14 10:49:45 BdST

ফয়সাল আমার প্রিয় বন্ধু ও 'বড় ভাই'




মোশতাক আহমদ
কবি এবং চিকিৎসক
____________________

ফয়সাল আমার খুব কাছের একজন বন্ধু হলেও ওর সাথে আমার সম্পর্ক ছিল কিছুটা অন্য রকম ; আমার উপর বড়ভাইসুলভ একটা কর্তৃত্ব ছিল তার। ধরা যাক স্বাধীন পরিবেশের হোস্টেলে বড় ভাই বারবার এসে খোঁজ নিচ্ছেন বা ঘন ঘন ফোন করছেন, তাহলে যেরকম অস্বস্তি হয়, ফয়সালের স্নেহের অত্যাচার ঠিক তেমনটাই ছিল আমার জন্য।

চিটাগাং মেডিকেলের হোস্টেলে গন্ডগোলের সময় আমাকে দেখে রাখত বা ইন্ডিয়া- নেপাল ভ্রমণে আগাগোড়া দায়িত্বশীল নেতার মত আগলে রেখেছিল - সে সব নয়, আমি বলছি গত এক যুগের কথা, যখন আমি নিজেই একজন দায়িত্ববান বাবা!

২০০৮ সালে আব্বার পলিসিস্টিক কিডনি ডিজিজ ধরা পড়ল, যেটা কিনা জেনেটিক রোগ। আর ২০১১ তে ধরা পড়ল ব্লাডার সেল কারসিনোমা। তাই ২০০৮ থেকেই আমার সব ধরনের ইউরোলোজিকাল টেস্ট করিয়ে ফেলতে বলে আসছিল ফয়সাল। মন দিয়ে লিখছি বা ভক্ত পাঠকের সাথে চ্যাট করছি, স্ক্রিনে দেখি বিলেতি নম্বর ; কতদিন সেই ফোন ধরিনি! যতক্ষন না ২০১১ নাগাদ আমার কিছু উপসর্গ দেখা দিল আর আব্বার ব্লাডারের অপারেশন হল ততদিন আমি টেস্ট করাইনি। সেই থেকে 'বড় ভাই' পিছনে লেগে আছে! আমি নিয়মিত ডাক্তার দেখাই আর পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে ফয়সালকে পাঠাই। সে দেশে আসে, বইমেলায় বা বন্ধুদের গেট টুগেদারে অসুখ নিয়ে কি আর অত কথা বলা যায়! ২০১৭র শেষ দিকে এক ঝটিকা সফরে এসে ফয়সাল সোজা আমার বাসায় চলে এল। তখন থেকে নিজেই আমাকে দেখতে শুরু করল। ও ঢাকায় এলে প্রফেসর সালাম স্যারের প্রতিষ্ঠান ইউরোলজিক্যাল ফাউন্ডেশনে বসত, তাদের কিছু একাডেমিক কাজে সাহায্য করত। সেখানে আমাকে তিন বার দেখল। শেষবার ২০১৯ এর মে মাসে নিজ হাতে একটা সিস্টোস্কোপ করার পর রায় দিয়ে দিল পরেরবার এসে আমার অপারেশন করবে। দিয়ে রাখল একটার জায়গায় তিনটা ওষুধ। এর মধ্যে একবার কিডনি ফাউন্ডেশনের ব্যানারে মূত্রতন্ত্রের ক্যান্সার সচেতনতামূলক একটা পোস্টার ছাপানোর দায়িত্ব দিল আমাকে। লন্ডন থেকে ফোন করে খুবই বিনীতভাবে ( হাম্বল রিকোয়েস্ট) অনুরোধ করল ওর ইংরেজি টেক্সটের বাংলা করে ওর পাঠানো ছবিগুলো ব্যবহার করে একটা পোস্টার করে রাখতে। আমি খুব ভাল গ্রাফিকস জানেন এমন একজন প্রচ্ছদ শিল্পী , যিনি আবার প্রকাশক ও সম্পাদকও, তাকে রাজি করলাম দ্রুত সময়ে কম টাকায় একটা পোস্টার ডিজাইন করে দেয়ার জন্য। কিন্তু সে বেচারা শেষ মুহূর্তে ক্যান্সার আক্রান্ত মূত্রতন্ত্রের নানা অংশের ছবি দেখে ভয় পেয়ে সারেন্ডার করল। পরে একজন সাধারণ গ্রাফিক্স শিল্পী খুঁজে পেয়েছিলাম। ফয়সাল খুব পছন্দ করেছিল সেই পোস্টার। সেই শিল্পীকে ডেকে নিয়ে ধন্যবাদ দিয়েছিল। এর মধ্যে আমার সৌভাগ্য হয়েছিল লন্ডনে ওর বাসায় তিন চারদিন থেকে লন্ডন শহর বেড়ানোর। অনেক যত্নে রেখেছিল আমাকে। আমি বিশেষভাবে যেটা লক্ষ্য করলাম, প্রতিদিন কাজ শেষে অন্য একটা নার্সিং হোমে গিয়ে নিজ হাতে মাকে খাইয়ে দিয়ে আসত। আমাকে একদিন নিয়ে গেল কিছুটা স্মৃতিভ্রস্ট আর কিছুটা বাকরুদ্ধ মায়ের কাছে, অথচ আশ্চর্য, ফয়সালের মা সেদিন আমার পুরো নাম উচ্চারণ করে ফেললেন!

ফয়সালের হোমারটন ইউনিভার্সিটি হাসপাতালেও গেলাম ব্রিটিশ মিউজিয়াম দেখা শেষে একদিন। এখানেই বিশেষজ্ঞ ইউরোলজিস্ট হিসেবে কাজ কর‍ত ফয়সাল। মূত্রতন্ত্রের নানা ক্যান্সার নিয়ে ছিল আগ্রহ। অনেক বেশি পরিশ্রমী আর ব্যস্ত ডাক্তার ছিল সে। লন্ডনে আমাকে এক রেলস্টেশনে রিসিভ করেছিল, আবার বিদায়ের দিন রাত সাড়ে তিনটায় নিজ হাতে চা করে নিজেই ড্রাইভ করে পৌঁছে দিয়েছিল হিথ্রোতে ; কিন্তু পরপর তিনদিন লন্ডন ভ্রমনে সকালের খুটিনাটি ব্রিফিং আর বারবার ডিসট্যান্ট মনিটরিং করতে পেরেছিল তার ব্যস্ত শিডিউলে আমি একদম অপরিকল্পিত আতিথ্য নেয়াতে। ফলে আমি হারিয়ে যাইনি অচেনা শহরে। যে ওই শহরটাকে হাতের তালুর মতো চিনত, সেই হারিয়ে গেল!

সম্ভবত এই হাসপাতালেই তার অদৃশ্য ঘাতক কোভিড- ১৯ ওঁৎ পেতে ছিল। আদর্শ অরক্ষিত পোষক পরিবেশে পোষক পেশাজীবির দেহ। জ্বর শুরু হওয়ামাত্র আইসোলেশনে বসে কেবল অরক্ষিত অবস্থায় সেবা দানের অভিযোগ আর সতর্কবার্তাই দিয়ে যায়নি দেশের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন সাহেবকে, ডাক্তারদের পারিবারিক জীবন নিয়ে ওর মানবিক আবেদনটা আরো হৃদয় ছোঁয়া। অসহিষ্ণুতা প্রকাশ করেছিল প্যানিক শপিং নিয়েও। বিলেতের অহেতুক আশাবাদী বাংগালী কম্যুনিটিকেও সচেতন করে গেছে প্রাণপণ। সতর্কবার্তা সবার জন্যেই প্রযোজ্য।

সেবারে সে আমাকে ক্রমাগত উপদেশ দিয়ে গেছে হেলদি লাইফ স্টাইলে আসার জন্য। জীবিত বন্ধুর কাছে ( এখানেও বড় ভাইসুলভ উপদেশ) প্রতিজ্ঞা করিনি কিন্তু বিদেহী ' ভাই' এর কাছে আজ প্রতিজ্ঞা করলাম। দেশে ফিরে এসে আমি ফোনের সমস্যার কারনে অন্য একটা ফোনে ' অগত্যা' নামে বন্ধুদের একটা গ্রুপ খুলি। সে আমাকে সেই হোয়াটস এপ গ্রুপ খোলার জন্য বিরক্তি দেখিয়েছিল বলে আমিও বিরক্ত হয়েছিলাম; কিন্তু পরে বুঝেছি সে সকলকে এক ভাইবার গ্রুপের ছাতার নিচেই আনতে চেয়েছিল ২০২০ ডিসেম্বরের গ্র‍্যান্ড গ্লোবাল রিইউনিয়ন সামনে রেখে।

যাহোক আমাকে অপারেশন না করানো পর্যন্ত তো সে রণে ভংগ দিবে না। কিন্তু পায়ে একটা ব্যাথার কারনে দেশে আসতে পারছিল না ( ডাক্তার ওকে দীর্ঘ বিমান ভ্রমণ অনুমোদন দিচ্ছিলেন না), আর আমার ছুটির সাথেও মিল না হওয়াতে অন্য একজন সার্জনের হাতে উনিশের নভেম্বরে অপারেশন করাই। কিন্তু তার আগে সম্ভাব্য সব ক'জন সার্জনের সাফল্যের হারের খবরাখবর, চেম্বার - প্র‍্যাক্টিসের ঠিকুজি সে গোপন সূত্রে জোগাড় করে তারপরেই সার্জন নির্বাচনের অনুমোদন দিয়েছিল। একটা অপারেশনের ঝুঁকির যতগুলো দিক আছে, প্রতিটার ব্যাপারে নিশ্চিত হতে চাচ্ছিল। আমাদেরই এক বন্ধু সুব্রতর হাতে অবেদনের ভার থাকাতে নিশ্চিত হয়েছিল। আমি কেন অপারেশনের ১২ দিনের মাথায় অফিস করতে শুরু করলাম, তাই নিয়েও রাগ করল, তার নিজস্ব স্টাইলে। ভয় দেখিয়ে বলেছিল আরো কয়েকটা দিন বই পড়ে, ম্যুভি দেখে কাটাতে পারলে না!
প্রত্যেকের জীবনে এমন কিছু সমস্যা থাকে যেগুলো নিজে নিজেই যুঝতে হয়, কাছের মানুষ - জীবন সংগী, বন্ধু বা ভাই সে সব সমাধানে হয়ত কিছুটা সাহায্য করতে পারে। আমার কোনো বড় ভাই না থাকায় সে জায়গাটায় ছিল ফয়সাল। জীবনের শেষ দু তিন বছরে সে বিশ্বজুড়ে নানা বন্ধুর নানা সমস্যার সমাধান করে গেছে। আজ সে যেনবা 'বসন্তের বাতাসটুকুর মত' আমাদের 'প্রাণের পরে চলে গেল' আমাকে কেমন নিঃস্ব করে দিয়ে!

কখনো মনে হয় সে ইন্দ্রনাথের মতো এক উপন্যাসোপম চরিত্র; সে কথা আরেক দিন হবে।

 

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়