Ameen Qudir

Published:
2018-09-28 11:44:48 BdST

শুভ জন্মদিন শেখ হাসিনা :সুদূর অরলান্ডোতে বসে বন্দনা করি আপনার দীর্ঘজীবনের


ডা. বি এম আতিকুজ্জামান

 

------------------------------------------------

আজ দিনটি খুব চমৎকার। রোদটা তেমন প্রখর নয়। এ সময় অরলান্ডোর আবহাওয়া খানিকটা বাংলাদেশের হেমন্তের মতন। আমি আমাদের দীঘির পারে বসে আছি। এখানে বসলেই আমার সব স্মৃতিগুলো ধারপাশে ঘোরাফেরা করে। আমি তাঁদের হাত ধরে চুপ করে বসে থাকি।

এরকম একটি রোদেলা দিন ছিল জানুয়ারি ২৪, ১৯৮৮। আমি তখন চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে পড়ছি। পড়াশুনার পাশাপাশি সকাল বিকেল স্বৈরাচারী সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান মিছিলে মুখরিত আমাদের ক্যাম্পাস। সেদিন আমাদের নেত্রী শেখ হাসিনা লাল দীঘির ময়দানে আসছেন। বিশাল গনজমায়েত হবে। আমরা মেডিকেল কলেজ থেকে দুপুরের পর পর রওনা হলাম বেশ বড়সড় একটি মিছিল নিয়ে।

সারা চট্টগ্রামের নানা প্রান্ত থেকে মিছিল এগুচ্ছে লালদীঘির দিকে। কোতোয়ালিতে পৌঁছানোর ঠিক আগেই গুলির আওয়াজ কানে এলো। আমরা ছত্র ভঙ্গ হয়ে এদিক ওদিক ছুটে গেলাম। কানে এলো শেখ হাসিনাকে বহনকারী ট্রাকে গুলিবর্ষণ করা হয়েছে। আমরা ছুটে গেলাম ওদিকে। পথে দুজন পথচারীকে গুলিবদ্ধ অবস্থাতে দেখে থেমে গেলাম। তাঁদেরকে একটি ট্যাক্সিতে তুলে আমরা ফিরে এলাম হাসপাতালে। দুজনকেই সংকটজনক অবস্থাতে সার্জারি ওয়ার্ডে এনে যা দেখলাম তা কোনদিন ভুলবো না। সার্জারি বিভাগের উঠোনে ঢাকা রয়েছে লাইন ধরে রক্তাক্ত প্রাণহীন শরীর।

 

কাজি আকরাম ভাইয়ের বাড়িতে শেখ হাসিনা। সাথে মান্নান ভাই, মহিউদ্দিন ভাই সহ আরও অনেকে।-------------------------


পুরো শহর তখন ভেঙে পড়েছে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে। মিছিল আর মিছিল। হাসপাতালের গেট বন্ধ। পুলিশ আর আর্মির গাড়ি গেটের বাইরে। তারা টিয়ার গ্যাস ছুড়ছে। মেডিক্যাল কলেজের ভেতর থেকে পেট্রোল বোমা যাচ্ছে ওদের দিকে। ওরা এসেছে লাশগুলো নিয়ে যেতে।

গুজব রটে গেলো আমাদের নেত্রী আর নেই। কিন্তু তাকে মিথ্যে প্রমানিত করে তিনি হাজির হলেন আমাদের কাম্পাসে। আমাদের কাম্পাসের গোল চত্বরে তিনি দাড়িয়ে নির্ভীক কণ্ঠে বললেন," ওরা আমাকে বার বার মেরে ফেলার চেষ্টা চালাবে। আমার তো আজ এখানে থাকবার কথা ছিল না। আমার তো অনেক আগেই আপনাদের ছেড়ে চলে যাবার কথা ছিল। কিন্তু আমার ভাগ্য আমাকে নিয়ে এসেছে। আমি আমাদের ন্যায্য দাবি আদায়ের জন্য, গনতন্ত্রের জন্য যে কোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত। স্বৈরাচার নিপাত না হওয়া পর্যন্ত আমরা পথ ছাড়বো না। আমদের লাশের ওপর গনতন্ত্র আসবে।"

স্বৈরাচারের পতন হোল ঠিকই। কিন্তু থেকে গেলো সুক্ষ কারচুপির খেল। গনতন্ত্র আর আমাদের দাবি আদায়ের লড়াই চলতেই থাকলো। আপা প্রায়ই চট্টগ্রামে আসতেন জনসভাতে, থাকতেন মেডিক্যাল কলেজের পাশে ও আর নিজাম রোডে
তাঁর এক আত্মীয় আকরাম ভাইএর বাসাতে। আমরা ফজরের পর পরই তাঁর সাথে দেখা করতে যেতাম দলে বলে।

১৯৮৯তে দীর্ঘদিন পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হোল। ছাত্রলীগের বিপক্ষে সবগুলো সংগঠন এক হয়ে গেলো। তারপরও আমরা সংখ্যা গরিষ্ঠ পদগুলো পেলাম। আপার সাথে দেখা করতে গেলাম আকরাম ভাইএর বাসায়। তিনি বললেন," থেমে থাকবার সময় নয় এটি। বিজয়ের উৎসব করার সময় নয় এখন। পরবর্তী নির্বাচনে পুরো প্যানেল দেখতে চাই।" আপার কথা রেখেছিলাম আমরা।

১৯৯৪ তে ডাক্তার হিসেবে বের হয়ে গিয়েছি। আমাদের তখন ভীষণ দুঃসময়।পদে পদে অত্যাচার, অবজ্ঞা।তখন আমরা কজন মিলে চলে গেলাম আফ্রিকাতে। কিন্তু দেশের সাথে নাড়ীর টান ছিল সব সময়। সব সময় খবর রেখেছি কেমন আছে দেশ, কেমন আছেন গনতন্ত্রের মানসকন্যা।


লাল দীঘির ময়দানে হত্যাকাণ্ডের পর চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে বক্তব্য দিচ্ছেন শেখ হাসিনা।
----------------------------------------

ভাগ্যের টানে আফ্রিকা থেকে নিউ ইয়র্ক হয়ে ফ্লোরিডার অরলান্ডোতে চলে এলাম ২০০৪ সালে।দীর্ঘ প্রশিক্ষনের পর তরুন পরিপাকতন্ত্র আর লিভার রোগের বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ শুরু করেছি কেবল। খবর পেলাম অরলান্ডো থেকে খুব কাছের এক শহরে আপা তাঁর মেয়ের কাছে এসেছেন কিছুদিনের জন্য। সে সময় আবার সুযোগ হোল আপাকে কাছাকাছি দেখবার। এক নৈশভোজে তিনি আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। আমি ভেবেছিলাম আপা ভুলে গেছেন আমাদের। অথচ অবাক করে দিলেন তিনি। আকরাম ভাইয়ের কথা বলতেই অনেক স্মৃতির রেশ ধরে টান দিলেন তিনি।অসাধারন তার স্মৃতিশক্তি।

সব সময়ই আপার একটি অসাধারন ক্ষমতা আমাকে অবাক করে দেয়। তিনি সহজে যে কারো সাথে যে কোন ব্যাপারে কথা বলে মিশে যেতে পারেন। আমার মনে আছে আমার মায়ের সাথে মাছ রাঁধার রেসিপি নিয়ে অনেকক্ষণ আলাপ করলেন তিনি।কোলে নিয়ে আদর করলেন আমার সন্তানদের।গল্প করলেন তাদের সাথে তাদেরই একজন হয়ে।

সেসময় একজন চিকিৎসক হিসেবে তাঁর কল্যাণে আসতে পেরে এখনো গর্ববোধ করি।

কঠিন, প্রতিহিংসাপ্রবন রাজনিতির বলি হয়েছেন তিনি সবসময়। পরিবার, আপন জন, সহকর্মী, রাজনৈতিক কর্মী তাঁর সামনে দিয়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে, অনেকে তাকে ছেড়ে চলে গেছে আখের গোছাতে। তিনি লড়াই করে গেছেন সবসময়। এখনো করছেন।

অরলান্ডো থেকে দেশে ফিরলে ভাল লাগে। গনতন্ত্র আর উন্নয়নের পথে দেশ চলছে। চক্রান্তও চলছে। তারপরও বুক ভরে নিঃশ্বাস নেই। আপার পেছনে জীবন বাজী রেখে পার করেছিলাম উত্তাল তারুণ্য। প্রায়ই এখান থেকে নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি নিয়ে বাংলাদেশে যাই। বঙ্গবন্ধু মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে সেগুলো হস্তান্তর করার পর প্রান গোপাল দাদা নিয়ে গেলেন আপার সাথে দেখা করানোর জন্য।

দেখা হোল অল্প কিছু সময়ের জন্য। তিনি মনে রেখেছেন আমাদের। তিনি মনে রেখেছেন অরলান্ডোকে। তিনি বললেন," চালিয়ে যাও এ সব কাজ। সময় পেলে এখানে চলে আসো।"

ফ্লোরিডাতে থাকবার সময় আপা আমাদের তাঁর স্বপ্নের বাড়ির কথা বলেছিলেন। বাড়ির উঠোনে দখিণা বাতাস আসবে। সেখানে তিনি দু দণ্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন। বই পড়বেন। লেখাজোখা করবেন। আমি এখন সেরকম এক বাড়িতে থাকি। বাড়ির পিছনে বিশাল দীঘি। কুলে তাঁর পদ্ম ফুলের বাহার। দখিনা বাতাস খেলা করে সারাদিন সেখানে। মনে ভীষন আশা জাগো যদি একটি বেলার জন্য পেতাম তাকে।

শেখ হাসিনার অকুতভয় কুশলি পরিকল্পনাতে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এই সুদুর অরলান্ডোতে বসে বন্দনা করি তাঁর দীর্ঘজীবনের। একবার তাকে বলেছিলাম, অরলান্ডোবাসীরা সব সময় তাঁর সাথে থাকবে। বিশেষ করে কঠিন সময়ে।

সারা পৃথিবীর আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা বাংলাদেশীদের হৃদয় জুড়ে আছেন তিনি। সব সময় থাকবেন তিনি।

জন্মদিনের শুভেচ্ছা, শেখ হাসিনা। পরম করুনাময় দীর্ঘ জীবন দান করুন আপনাকে।

_________________________

 

ডা. বি এম আতিকুজ্জামান । সুলেখক। সিএমসি ২৮।

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়