Ameen Qudir

Published:
2018-09-12 09:02:27 BdST

মায়ার সংসার গড়ে মায়েরা মায়া বিলিয়ে যান আমৃত্যু :একদিন সেই মায়েরও একটু মায়া দরকার


 



ডা. জোবায়ের আহমেদ
___________________________


একজন মা তাঁর দশটা সন্তান কে একা লালন পালন করেন কিন্তু দশজন সন্তান মিলেও একজন মায়ের যত্ন নিতে পারেনা, এই ব্যাপার টা আমাকে খুব কষ্ট দেয়।।

ছবির উনার নাম আমিনা, বিয়ানীবাজার দুবাগ ইউনিয়ন এর দক্ষিণ চরিয়া গ্রামের এই আটাশি বছর বয়স্কা মা , একটা সময় উনারও সংসার ছিল, কোল জুড়ে ছেলে সন্তান আসল যখন, তখন খুব কেঁদেছিলেন আনন্দে।।অভাবের সংসারে ভালবাসা ভরপুর ছিল।। স্বপ্ন দেখতেন সু -দিন আসবে।। কিন্তু সেই সু -দিন আর আসেনি।।সুপারি বিক্রেতা স্বামী গত হয়েছেন ১৬ বছর আগে।।ছেলেটা বড় হয়েছে।।।বিয়ে করে মাকে ফেলে শ্বশুর বাড়িকে আপন করে নিয়েছে, মা এর আর খোঁজ নেয় না।।
আমিনা বেগম আমাকে জড়িয়ে ধরেছেন,আজ থেকে আমিই তার ছেলে, নিজের পেটের সন্তান তার কাছে জীবিত থেকেও মৃত।।
ছেলে সন্তান জন্মালে আনন্দে কেঁদেছিলেন আমিনা বেগম, নিষ্ঠুর জীবনে আনন্দ টা হারিয়ে গেছে অনেক আগেই কিন্তু কান্না টা স্থায়ী হয়ে গেছে।।।
কয়েক মাস আগে আমিনা বেগম মারা গেলেন।
খবর পাইনি বলে জানাযায় যেতে না পারার একটা আক্ষেপ রয়েই গেল আমার।

#পরতেঙ্গা বিবির কথা।।
তিনি আমার রোগী ছিলেন না।।
তিনি ছিলেন আমার মা।।।উনাকে আমি মাই বলে ডাকতাম।।
তিনি কানাইঘাট ডিগ্রী কলেজ এর ফিজিক্স এর সহকারী অধ্যাপক আজাদ ভাই এর মা।।।
ডাক্তার -রোগী সম্পর্ক যেখানে মা -ছেলের এর সম্পর্কে রুপ নিয়েছিল।।।
"কি দেখ এমন করে মাই?
উত্তর ছিল মাই এর, তোমার সুন্দর মুখ দেখি বাবা"
এটাই ছিল পরতেঙ্গা বিবির শেষ কথা।।।
একজন চিকিৎসক হিসেবে আর কিছু পাওয়ার নেই।।

#আমার বন্ধু ও বড়ভাই কানাডা প্রবাসী ডাঃ নওফেল মিনহাজ এর ছোট্ট মেয়ে নুয়েরী উনাকে নিয়ে নিজ হাতে গত বাবা দিবসে একটি কার্ড লিখেছে।।।
daddy
when you hold my hand, you hold my heart
"nuery"
আসলেই ব্যাপারটা স্বর্গীয় একটা অনুভূতি দেয়।।
পৃথিবীতে অনেক খারাপ মানুষ আছে কিন্তু একজন খারাপ বাবাও নেই।।।
আমাদের বাবাদের বয়স হচ্ছে।।
উনারা আমাদের সাথে গল্প করতে চান,পাশে থাকতে চান,আমরা যখন উনাদের জন্য নিষেদ করার পরও একটা পাঞ্জাবি কিনে নেই তখন কিন্তু মুছকি হাসি দিয়ে বলেন কি দরকার ছিল??
এই মুছকি হাসি টাই ভালবাসা।।
গতবছর বাবাকে একটা অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল গিফট করেছিলাম, তখন খুব কপট একটা রাগ দেখালো, কি দরকার, আমাকে পরের দিন ভিডিও কল দিয়ে একটা মুছকি হাসি দিয়েছে।।।
এই কপট রাগ ই ভালবাসা।।। এই মুছকি হাসিই বাবার ভালবাসা।।।
শ্বশুর বাবার আরটিকেরিয়া ও কাশি হল।
ঔষধ কিনে নেওয়াতে খুব বকা দিলেন।।
এই বকাই ভালবাসা।।।।

#একজন সেলিম সাহেব।
বয়স ৪৮ বছর। নিজে ভূগছেন ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেশার, ডিস্লিপিডেমিয়া এর মত রোগে।।।
বাড়ি কাকুরা দীঘির পাড়,উনি মদন মোহন কলেজ এর সাবেক প্রিন্সিপাল সৈয়দ আব্দুস শহীদ এর ছেলে।।
সৈয়দ আব্দুস শহীদ স্যার ও উনার স্ত্রী দীর্ঘ এগার বছর যাবত বার্ধক্য জনিত রোগে বিছানায় বন্দি।।।
সেলিম সাহেব এগার বছর ধরে নিজ হাতে পরম মমতায় নিরলস ভাবে বাবা মা এর সেবা করে যাচ্ছেন।।
নিজ হাতে বাবা মা এর পেশাব পায়খানা পরিস্কার করেন।।। কোন বিরক্তি নেই।।।।
কাজের লোক রাখলে বেশিদিন থাকেনা।।।
গত বছর সেলিম সাহেব ভাইরাল ফিভার এ আক্রান্ত হলেন।।। দুষ্ট ভাইরাস উনাকে খুব কাবু করে ফেলেছিল। হঠাৎ সেলিম সাহেব আমার সামনে বাচ্চাদের মত ডুকরে কেঁদে উঠলেন।। গত সাত দিন নিজ হাতে বাবার পেশাব পায়খানা পরিস্কার করতে পারেন নি এই দুঃখে।।
খুব আক্ষেপ নিয়ে বললেন, আজ সাত দিন নিজ হাতে বাবা মা এর সেবা করতে পারছিনা।।।।
খুব কষ্ট পাচ্ছেন উনি।।।।।যদিও উনার প্রিয়তমা স্ত্রী উনার বাবা মা এর ব্যাপারে খুব যত্নশীল।।।
খুব ভাল লাগলো।।।
আমি সেলিম সাহেবের গড়িয়ে পড়া অশ্রু দেখছিলাম।
খুব ইচ্ছে করছিল সেই অশ্রু কে ছুয়ে দিতে।।
একটা শ্রদ্ধা মিশ্রত ভালবাসা অনুভব করলাম সেলিম সাহেবের জন্য।।।
এই রকম সেলিম সাহেব চাই ঘরে ঘরে।।।
বৃদ্ধ বাবা মা গুলো কে আমরা আগলে রাখি পরম মমতায়।।।।।

#আমার ইন্টার্নশীপের প্রথম প্লেসমেন্ট ছিল গাইনীতে।
প্রথম নরমাল ডেলিভারি করানোর দৃশ্যটা আজো ভুলিনি।১৭ বছর ছিল মেয়েটির বয়স,খুব চিৎকার দিচ্ছিল ব্যাথায়।ইপিসিওটোমি দিতে হয়েছিল।
বাচ্চাটি ডেলিভারি হবার পর মাসী যখন মেয়েটি কে দেখতে দিল তখন সে চুপ হয়ে গেল,ব্যাথা ভুলে কি এক হাসিমাখা মুখ নিয়ে বাচ্চাটির দিকে তাকিয়ে ছিল।
তাকে লোকাল এনেস্থিসিয়া না দিয়েই সেদিন সেলাই করেছিলাম কিন্ত সে একটু উহ ও করেনি।
আমি অশ্রুভেজা চোখে সেই অপূর্ব পবিত্র দৃশ্য দেখছিলাম আর ভাবছিলাম আমার মায়ের কথা।

#মা বাবা কে ফিরিয়ে দেই কিছু মায়া।।।
একজন চিকিৎসক হিসেবে জীবন কে অনেক কাছ থেকে দেখার সুযোগ আসে মাঝে মাঝে।।
জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে বেড়াই।।
ছোট্ট বাচ্চাকাচ্চা গুলো নিয়ে মা বাবা চিকিৎসা নিতে আসেন।সন্তান কে নিয়ে উনাদের উদ্বিগ্নতা, অস্থিরতা দেখি।।।কি পরম যত্ন আর ভালবাসায় আদরের সোনামণি কে বড় করেন।।।
নিজের মা বাবার মায়াবী মুখখানি চোখে ভেসে উঠে।।
আমার ৩৩ বছর এর জীবন জুড়ে বাবা মা শুধু দিয়েই গেলেন।। প্রায়শই আমি ভাবি এই যে আমাদের মাতাপিতা আমাদের জীবন কে এত এত আদর,যত্ন, মায়া, ভালবাসায় ভরপুর করে রাখেন, আমরা কতটুকু মায়া উনাদের ফেরত দিতে পারি।।।।
আমরা কি মাতাপিতার প্রাপ্য যত্ন নেই।
মা বাবার জন্য কাঁদছে সন্তান।।।
অনেক পবিত্র দৃশ্য।। এমন দৃশ্য আমার আত্মা কে প্রশান্তি দেয় খুব।।।
একজন মা মায়ায় এই পৃথিবী তে মায়ায় সংসার গড়ে তুলেন।।। মায়া বিলিয়ে যান আমৃত্যু।।
একদিন সেই মা এর একটু মায়া দরকার।।
একটু ভালবাসা দরকার।।
সেদিন যেন মা বাবার প্রাপ্য সেই মায়া ফিরিয়ে দেই আমরা।।
_____________________________

ডা. জোবায়ের আহমেদ ।সুলেখক। সিলেট এম এ জি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ৪২ ব্যাচ।
এবং
Executive Director at Dr.Jobayer Medicare Center
former Resident Medical officer at ড.এম এ রহমান হসপিটাল
Former Intern Doctor at Sylhet MAG Osmani Medical College Hospital
Studied MBBS at Sylhet MAG Osmani Medical College

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়