Ameen Qudir

Published:
2018-09-11 08:06:24 BdST

পাশে দাড়ান, জীবন বদলান একজনের


লেখকের ছবি

 


 অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল
___________________________

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস ২০১৭। এ বছর দিবসটির প্রতিপাদ্য `Take a minute, change a life.' (সময় নিন একটা মিনিট, জীবন বদলান একজনের)। যারা মর্মযাতনায়, মনোসংকটে ভুগছে তাদের পাশে থাকতে হবে- এটিই মূল কথা। খোঁজ-খবর রাখতে হবে আত্মহননের চিন্তায় ডুবে থাকা মানুষটির। তাদের নিজেদের মতো করে মনের কষ্ট খুলে বলার জন্য উৎসাহিত করতে হবে। কোমল ভাষায় সহযোগিতা করতে হবে, মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে তাদের কথা। স্বজন বা বন্ধুদের কার্যকরী পদক্ষেপ এই সময়ে খুবই জরুরি। তাদের সঙ্গে সংযোগ রক্ষা করে চলা এ সময়ে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। যখন তাদের মনে আত্মহত্যার চিন্তা আসে তখন জীবনের বেঁচে থাকার কোনো অবলম্বন কিংবা জীবনের উদ্দেশ্য তারা খুঁজে পায় না। তবে অনেক সময় তারা চায় কেউ তাদের পাশে দাঁড়াক, সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে তাদের আত্মহননের চিন্তাটা বন্ধ করার উদ্যোগ নিক এবং তাদের হতাশার কথা জানুক- তারা ভালো আছে কিনা সে-খোঁজ রাখুক। জীবন হচ্ছে অত্যন্ত সুন্দর ও মহামূল্যবান আবার কখনও অনিশ্চয়তায় ভরা, জটিল। এ অনিশ্চিত পরিস্থিতিতে স্বজন, বন্ধু বা যেকোনো অচেনা ব্যক্তিও যদি মিনিট খানিক সময় বিষাদগ্রস্ত মানুষটির পাশে দাঁড়ায় তার জীবন বদলে যেতে পারে- এটি এবার বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবসের বড় আহবান। ইন্টার ন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (IASP) বিশ্বের সকল জনগোষ্ঠীর প্রতি এ বিষয়ে সচেতনতার ডাক দিয়ে বলেছেন মর্মযাতনায় আক্রান্ত ব্যক্তির আত্মহননের ইচ্ছা, পরিকল্পনা বা চেষ্টা চালানোর খবর জানার পরও অনেকে প্রায়ই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। কিন্তু বিষয়টি জানার পর গুরুত্বের সঙ্গে সচেতন হতে হবে। কেবল উপদেশ নয়, তাদের জন্য প্রয়োজন সমব্যথী হয়ে, সমান অনুভ‚তি নিয়ে তাদের পাশে দাঁড়ানো, তাদের কথা শোনা। অনেকে মনে করেন সুইসাইডের বিষয়ে কথা বললে তাদের মাথায় আত্মহননের চিন্তা উসকে দেওয়া হবে। কিন্তু গবেষণায় তা প্রমাণিত হয়নি। বরং নন-জাজমেন্টালভাবে তাদের কথা শোনার মাধ্যমে ভুক্তভোগীর মর্মযাতনা কমিয়ে দেওয়া যায়, কখনই তা উসকে ওঠে না।
এখন চলতি বছরে ঘটে যাওয়া পত্রিকায় প্রকাশিত কয়েকটি খবরের দিকে নজর ফেরাব আমরা :
১. মোবাইল কিনে না দেয়ায় আত্মহত্যা : নওগাঁর রানিনগরে মোবাইল ফোন কিনে না দেয়ায় রয়েল হোসেন (২২) নামে এক যুবক ফ্যানের সাথে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। রয়েল একটি মোবাইল ফোন কিনে দেওয়ার জন্য বাবা-মার কাছে বায়না ধরে। বাবা তার দোকানে চলে গেলে রয়েল তার মার কাছে এখনই মোবাইল ফোন কিনে দেওয়ার জন্য জেদ ধরে। ধান কাটা-মাড়াই করার পর মোবাইল কিনে দিবে বলে জানান তারা। ‘মোবাইল কিনে দিলে না তো, কি হয় দেখতে পাবে’ বলে রয়েল তখন নিজ ঘরের মধ্যে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। এর মধ্যে মাগরিবের আজান দিলে মা হাঁস-মুরগি তোলার জন্য চলে যায়। এই সুযোগে ঘরের দরজা বন্ধ করে রয়েল ফ্যানের সাথে গলায় দড়ির ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করে। (ইত্তেফাক, ১৯ এপ্রিল ২০১৭)
২. এক রশিতে প্রেমিক যুগলের আত্মহত্যা : ভালোবাসার পরিণয়ে ব্যর্থ হয়ে নওগাঁর মান্দায় একই রশিতে গলায় ফাঁস দিয়ে প্রেমিক-প্রেমিকা আত্মহত্যা করেছেন। তারা হলেন- উপজেলার প্রসাদপুর ইউনিয়নের চকরাজাপুর গ্রামের ওয়াজেদ আলীর ছেলে গোলাম রাব্বানি (২২) ও মৃত মকবুল সরদারের মেয়ে তসলিমা আক্তার (১৮)। গোলাম রাব্বানি উপজেলার সাতবাড়িয়া টেকনিকেল বিএম কলেজ থেকে চলতি এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছেন। তসলিমা আক্তার এনায়েতপুর আইডিয়াল উচ্চ বিদ্যালয় থেকে অংশ নিয়ে এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রার্থী। তারা দুইজনে দীর্ঘদিন থেকে প্রেমের সম্পর্ক করে আসছিলেন। আর প্রেমের স¤পর্ক নিয়ে দুইজনেই বিয়ে করতে সম্মত হন। বিষয়টি ছেলের পরিবারকে জানানো হয়। কিন্তু মেয়ের আর্থিক অবস্থা তেমন ভালো না হওয়ায় প্রেমিক গোলাম রাব্বানীর পরিবার বিয়েতে অসম্মত হন। এ নিয়ে দুইজনের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। আরও জানা যায়, তসলিমা তার মায়ের সঙ্গে রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। রাতে কোনো একসময় বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে বাড়ির পাশে গোদাবিলা নামক বিলের মাঝখানে একটি আম গাছের ডালে রশির দুই মাথায় গোলাম রাব্বানী ও তসলিমা আক্তার গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন। মান্দা থানার ওসি আনিছুর রহমান বলেন, দুইজনের মধ্যে প্রেমের স¤পর্ক ছিল। মেয়ের পরিবার থেকে মেয়েকে অন্যত্র বিয়ে দেয়ার কথা হচ্ছিল। ক্ষোভের বশে তারা আত্মহত্যা করেছেন। (ইত্তেফাক, ১৯ এপ্রিল ২০১৭ )
৩. চট্টগ্রামে জিপিএ ৫ না পেয়ে আত্মহত্যা এক শিক্ষার্থীর : এসএসসিতে জিপিএ ৫ পাবে বলে আশা করেছিল নগরের এনায়েতবাজার রেলওয়ে কলোনি সিটি করপোরেশন উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সোহরাব হাসান (১৬)। স্বপ্ন ছিল চট্টগ্রামের সেরা কলেজে ভর্তি হবে। কিন্তু ফল প্রত্যাশা অনুযায়ী হয়নি তার। পেয়েছে ৩.৭৭। তাই মনের কষ্ট সইতে না পেরে নিজের জীবনটাই দিয়ে দিল সোহরাব। (কালের কণ্ঠ, ৫ মে ২০১৭ )
৪. তিন সন্তানকে হত্যার পর মায়ের আত্মহত্যা : রাজধানীর তুরাগে কালিয়ারটেক এলাকাতে তিন সন্তানকে গলায় ওড়না পেঁচিয়ে নির্মমভাবে হত্যার পর মা রেহেনা (৩৮) নিজেও আত্মহত্যা করেছেন। নিহতরা হলেন, বড় মেয়ে শান্তা (১৩), ছোট মেয়ে শেফা (৮) এবং ৮ মাসের ছেলে সাদ এবং মা রেহেনা (৩৮)। রেহেনার বড় ভাই মাহবুব আলম সাগর জানান, কামালের মা, ভাই-বোন তার সম্পত্তি দখলের জন্য দীর্ঘদিন ধরে অত্যাচার করে আসছিল রেহেনাকে। আমার বোন তা সইতে না পেরে সন্তানদের হত্যা করে নিজেও আত্মহত্যা করেছে। তুরাগ থানার ওসি মাহবুবে খোদা জানান, লাশের গলায় দাগ দেখে মনে হচ্ছে সন্তানদের হত্যার পর মা আত্মহত্যা করেছে। আত্মহত্যার কারণ জানতে চাইলে ওসি বলেন, আমরা দুটি কারণ পেয়েছি। একটি হল সংসারের অভাব অনটন এবং অপরটি জমি এবং বাড়ি সংক্রান্ত বিরোধ। (ইত্তেফাক, ৯ জুন ২০১৭)
এবার আসুন, প্রিয় পাঠক আরও কিছু মর্মবেদনাদায়ক শিরোনামের দিকে ফিরে তাকাই আমরা : মেয়েকে নিয়ে ট্রেনের নিচে লাফ দিয়ে গৃহবধূর আত্মহত্যা (ইত্তেফাক, ১৩ মে ২০১৭), মৌসুমি আত্মহত্যা করেন ‘অপবাদ’ থেকে বাঁচতে (প্রথম আলো, ০৫ মে ২০১৭), কাশিয়ানিতে এক ওড়নায় প্রেমিকযুগলের আত্মহত্যা (ঢাকাটাইমস, ১৩ মে ২০১৭), সিদ্ধিরগঞ্জে স্ত্রীকে খুন করে স্বামীর ‘আত্মহত্যা’ (ইত্তেফাক, ৯ মে ২০১৭), স্ত্রীকে হত্যার পর কবরের পাশে স্বামীর আত্মহত্যা (ইত্তেফাক, ০৩ জুন, ২০১৭), ফেল করায় ট্রেনের সামনে ঝাঁপ, বাঁচাতে গিয়ে মৃত্যু খালারও (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৫ মে ২০১৭), অমতে বিয়ে, তরুণীর আত্মহত্যার অভিযোগ (প্রথম আলো, ১১ মে ২০১৭), আত্মহত্যা করল ধর্ষণের শিকার স্কুলছাত্রী (প্রথম আলো, ১৮ ডিসেম্বর ২০১৬), গুলি করে আত্মহত্যা (প্রথম আলো, ২৯ অক্টোবর ২০১৬), ইস্ট ওয়েস্ট শিক্ষিকার রহস্যজনক মৃত্যু মৃত্যুর আগে ফেসবুক বন্ধুদের লিখলেন ‘সবাইকে ধন্যবাদ’ (ইত্তেফাক, ২০ অক্টোবর ২০১৬), মোবাইলে অশ্লীল দৃশ্য জাহানারার আত্মহত্যা (মানব জমিন, ৬ নভেম্বর ২০১৬), মাগুরায় প্রেমিকের আত্মহত্যা, বিষপানে প্রেমিকাও মুমূর্ষু (ইত্তেফাক, ২৯ অক্টোবর ২০১৬), ঈদে বাবার বাড়ি যেতে না দেওয়ায় নববধূর আত্মহত্যা (ডোমার, নীলফামারী), দুপুরে শ্লীলতাহানির শিকার, বিকেলে আত্মহত্যা (কুষ্টিয়া), বাল্যবিবাহ ঠেকাতে জীবন দিল মেয়েটি! (আক্কেলপুর, জয়পুরহাট) ইত্যাদি অসংখ্য শিরোনাম পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। তাৎক্ষণিক আমাদের বুকে কাঁপন ধরে যায়। আবার ভুলে যাই সেই সব ঘটনার পেছেনে মর্মন্তুদ কাহিনি।


সয়ে যায় সব। কিন্তু স্বজনদের তো বটেই, বিশ্বের প্রত্যেক নাগরিককে মনে রাখতে হবে কেউ আত্মহত্যা করার কথা (Intent) বললে, আত্মহত্যা করব বলে থ্রেট (Threat) করলে বা ভয় দেখালে তা কোনোভাবেই অবজ্ঞা করা উচিত নয়, অবহেলার চোখে বিবেচনা করা চলবে না বরং নিজের বিচার-বিবেচনাবোধ আড়ালে রেখে তার কথা ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রাণ উজাড় করে তাকে সব কথা বলার পরিবেশ তৈরি করে দিতে হবে, আত্মহত্যার বিষয়ে তার কগনিশন বা চিন্তনের খুটিনাটি বিষয়গুলো বলার জন্য উদ্বুদ্ধ করতে হবে, তার আবেগ বুঝতে হবে, সমস্যাটা ধরতে হবে। আরও মনে রাখতে হবে, `Suicide is a symptom not a disease' অর্থাৎ উপসর্গের আড়ালে চাপা থাকা কারণ বা সমস্যা ধরতে হবে এবং সর্বোচ্চ মানসিক স্বাস্থ্য সেবাগ্রহণের (Care) জন্য মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট অন্যান্য পেশাজীবীদের সাহায্য নিতে হবে। মনোবিশ্লেষণ :
পরীক্ষায় বা যেকোনো ব্যর্থতার পর কেউ কেউ ক্ষিপ্ত হয়ে উঠতে পারেন, কেউ নেতিবাচক আবেগে দিশেহারা হতে পারেন, সহিংস হতে পারেন। এই সহিংসতা কখনও অন্তর্মুখী হতে পারে। তখনই আত্মহত্যার মতো ঘটনা ঘটে যেতে পারে। সহিংসতা বহির্মুখিও চ্যানেলাইজ হতে পারে। তখন ঘটে যেতে পারে অন্যকে যখম করা বা হত্যার মতো ঘটনা। আবার কেউ বা সাময়িকভাবে আপসেট থাকতে পারেন।

পরবর্তীসময়ে পরিস্থিতি সামলে নিতে পারেন। কে কোন ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তা অনেকটাই নিরর্ভর করে মানুষের ব্যক্তিত্ব, পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ক্ষমতা ও মনোসামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর। পরীক্ষায় ফেল করে বা প্রেমে ব্যর্থ হয়ে বা অন্য কোনো সামাজিক পরিস্থিতিতে ব্যর্থতায় একেবারেই ভেঙ্গে পড়েন, আত্মহত্যার চেষ্টা করেন যারা তাদের সহনশীলতা (টলারেন্স) কম, বিপর্যয়ের পর দ্রæত ঘুরে দাঁড়াবার ক্ষমতা (রিজিলিয়েন্স) কম। আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধের পারদ তলানিতে চলে আসে। পরিবার থেকে বা নিজ থেকে অবাস্তব অতি ‘উচ্চ প্রত্যাশা’ যাদের মনে ঘুরপাক খায় ব্যর্থতা বা তা অর্জনে অপারগতার পর মনস্তাত্ত্বিকভাবে ধসে যায় অনেকে। তীব্র বিষাদের ঘোরে ডুবে যেতে পারে তারা। আর তখনই ইচ্ছা, পরিকল্পনা ও আত্মহননের প্রচেষ্টায় ঝাঁপিয়ে পড়ে। পরীক্ষায় ফেল করার পর পরিবার বা অন্যদের থেকে তাচ্ছিল্য, অপমান পেলে, পরীক্ষা পাশই জীবনে সফল হওয়ার একমাত্র উপায় বলে বিশ্বাস তৈরি হলে কিংবা বঞ্চনা, প্রতারণা, বিট্রে ইত্যাদির মুখোমুখি হলে তাদের মনে রাখতে হবে সকল ব্যর্থতারই ইতিবাচক জবাব আছে, সকল সমস্যারই বৈজ্ঞানিক সমাধান আছে। যারা পরীক্ষায় ফেল করে বা মনমতো রেজাল্ট না করতে পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করছে বা নিজেকে শেষ করে দেওয়ার চিন্তায় ডুবে আছে তাদের বিশেষ করে মনে রাখতে হবে পৃথীবীর অনেক সফল, বিখ্যাত ব্যক্তিরা পড়াশোনায় তেমন ভালো করতে পারেননি। তাদের মধ্যে রয়েছেন: ব্রিটেনের প্রাক্তন প্রধান মন্ত্রী উইনস্টিন চার্চিল- যিনি সাহিত্যেও নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, বিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন, স্টিভ জবস, বিলগেটস এমনকি আইনস্টাইন। উপরে আলোচিত এত সব উদাহরণ মাথায় রাখতে পারলে ভেঙে পড়তো না রিপোর্টে উল্লেখিত রয়েল হোসেন, গোলাম রাব্বানী ও তসলিমা আক্তার, সোহরাব হাসান, মা রেহেনা ও মৌসুমি প্রমুখরা।


অথচ বিশ্বজুড়ে আত্মহত্যার পরিসংখ্যান আতঙ্কজনক : ইন্টারন্যাশনাল এসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন (আইএএসপি)-এর মতে প্রতিবছর বিশ্বে প্রায় ৮ লক্ষ লোক আত্মহত্যা করে। আর দুই কোটির মতো জনগোষ্ঠী আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়। আবার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মনে করছে ২০২০ সালে বিশ্বে প্রতি বছর আত্মহত্যায় মৃত্যুর সংখ্যা ১৫ লাখ ছাড়িয়ে যাবে। সংস্থাটির প্রতিবেদন মতে, বাংলাদেশে প্রতিলাখে ৭ দশমিক ৮জন মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতিদিন গড়ে ২৮জন,বছরে ১০ হাজারের অধিক লোক আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়। প্রতি ১০০ জনে ১৬জন প্রাপ্তবয়স্ক ও ১৮জন শিশু আত্মহত্যা করে। ২০১৪ সালের WHO-এর তথ্য অনুযায়ী আত্মহত্যায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান দশম, যা ২০১১ সালে ছিল ৩৮তম। অর্থাৎ আত্মহত্যার প্রবণতায় এগিয়েছে বাংলাদেশ। ২০১৬ সালে ছয় মাসে দেশে ৬৮ শিশু আত্মহত্যার খবর পত্রিকায় প্রকাশ পায়। এর ভিত্তিতে বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের (বিএসএএ) পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৪ সালে ১৪৫জন শিশু আত্মহত্যা করে, গড়ে প্রতিমাসে যা ছিল ১২জন। ২০১৫ সালে শিশু আত্মহত্যার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২২৮ জনে। যা গড়ে প্রতিমাসে হয় ১৯ জনে। বাংলাদেশের ঝিনাইদহ ও যশোর জেলা আত্মহত্যাপ্রবণ এলাকা- গড়ে এ হার ২৯-৩৩ জন। আত্মহত্যার প্রচেষ্টাকারীদের ৬৫.৪ শতাংশ মানসিকরোগে ভুগেছিল (বাংলাদেশ জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি, ২০০৫)।


এদের মধ্যে ৭০ শতাংশ ছিল গুরুতর বিশ্লেষণ রোগী। পঁচিশ বছরের নিচের বয়সীদের হার ছিল সর্বোচ্চ। পুরুষের তুলনায় মহিলাদের হার ছিল বেশি (৫৪.৪%), বিবাহিত মহিলা ৫৫.৯%। পারিবারিক সমস্যা (৪১.২%)। পরীক্ষায় খারাপ করা, ভালোবাসার ব্যর্থতা ও জটিলতা, বৈবাহিক অশান্তি, অবৈধ প্রেগনেন্সি ইত্যাদি বিষয়গুলোও ছিল গুরুত্বপূর্ণ। আত্মহত্যার ক্ষেত্রে বৈবাহিক অবস্থা ও শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার আশানুরূপ ফল অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়া, ফেল করা কিংবা সম্পর্কের টানাপোড়েন, সন্দেহ-অবিশ্বাস, নৈতিক অবক্ষয়, আর্থসামাজিক হতাশা, অর্থনৈতিক দুরাবস্থা, বেকারত্ব, যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ না পাওয়া, আশাহীনতা, বৈষম্যের শিকার হওয়া, ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হওয়া মানুষের মনে হতাশা তৈরি করছে। এসব তথ্য বিশ্লেষণ করে বলা যায় ছেলে-বুড়ো, নারী-পুরুষ, শিক্ষিত-অশিক্ষিত কেউ আত্মহত্যা-প্রবণতা ঝুঁকির বাইরে নয়। কিন্তু সেই অনুযায়ী নেই প্রতিরোধের ব্যবস্থা। মূলত ব্যাপক সচেতনতার অভাবে ঝরে পড়ছে মূল্যবান জীবন।
অবসাদগ্রস্ত, সিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত, মাদকাসক্ত এবং প্রবল আবেগপ্রবণ ব্যক্তিদের মধ্যে ১৩ শতাংশের আত্মহত্যার প্রবণতা থাকে। যথাযথ মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মাধ্যমে এ ধরনের মানবিক বিপর্যয় রোধ করা সম্ভব। বেলজিয়ামের আত্মহত্যার প্রবণতা রোধে নিয়োজিত হটলাইনের সেবা নিয়ে ‘কস্ট-ইফেক্টিভনেস অব এ হেল্পলাইন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন’ শীর্ষক এক গবেষণায় বলা হয়েছে, হটলাইনের মাধ্যমে অন্তত ৩৬ শতাংশ ক্ষেত্রে আত্মহত্যার প্রবণতা রোধ সম্ভব হয়েছে। আমাদের দেশেও বর্তমানে উন্নত ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে হেল্প লাইন চালু করে সমস্যা মোকাবিলায় অগ্রগণ্য ভ‚মিকা পালন করা যেতে পারে।
______________________________

 অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল । প্রখ্যাত মনোচিকিৎসক। বাংলাদেশের বর্তমান কথাসাহিত্যের তিনি জনপ্রিয়তাধন্য অপ্রতিদ্বন্ধী প্রধান পুরুষ।

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়