Ameen Qudir

Published:
2018-04-26 14:56:24 BdST

অসম সাহসী বাবাকে নিয়ে তাঁর ডাক্তার কন্যার স্মৃতিচারণ


দুঃসাহসী বাবা কন্যার স্মৃতিশ্রদ্ধায়



ডা. সবিতা ই চক্রবর্ত্তী
________________________________


তের বৈশাখ, আমাদের বটবৃক্ষের ছায়া হারানোর দিন। আজ অসম সাহসী এক যোদ্ধার শেষ বিদায়ের দিন।
বাবাকে নিয়ে আমাদের শত সহস্র স্মৃতি।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বড়দির ম্যাট্রিক পরীক্ষা। আমরা সপরিবারে মামাবাড়িতে উঠেছি। বাবা তার বড় মেয়েকে নিয়ে নৌকায় করে শেষ রাতে রওনা হন। মা সহ আমরা সবাই আতংকে কুঁকড়ে থাকি। বাবা সব্বাই কে সাহস দিয়ে মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। বারো কিলোমিটার জলপথ ডিঙিয়ে মানিকগঞ্জ সদরে এসে পরীক্ষা দিয়ে আবার ওই দিনেই মামাবাড়ি ফিরে যান। একদিন বড়দি রাতে বাড়ি ফিরেই বমি করতে থাকে। অনেক জিজ্ঞাসার পর জানা যায়, রোজ যাওয়া আসার পথে ছোট্ট ছইওয়ালা নৌকা প্রায়ই ফুলে ঢোল হয়ে যাওয়া মৃতদেহের সাথে ধাক্কা খায়। মাঝি বৈঠা দিয়ে সেই মৃতদেহ সরিয়ে রাস্তা বের করে নেয়। বাবা তার বড় কন্যাকে দুহাতে জড়িয়ে রাখেন, যাতে এই বিভৎস দৃশ্য তার চোখে না পড়ে। এক সন্ধ্যায় ফেরার পথে মাঝি নদী ছেড়ে পাশের ছোট নালায় নৌকা ঢোকায়। আজ নদীর অবস্থা নাকি সুবিধার না । সাবধানে যেতে পারলে হয়। হঠাৎ তীব্র পচা গন্ধে বড়দি হড়হড় করে বমি করে ফেলে। মাঝি মাটির কলসী থেকে জল এগিয়ে দেয়। এভাবে একদিন পরীক্ষা শেষ হয়। আত্মীয় স্বজনের বাধার মুখে ও বাবা দমে যাননি।


দেশ স্বাধীন হওয়ার পর সেই পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। বাহাত্তুেরে বড়দি আবারও পরীক্ষা দেয়। এরপর ওকে নিয়ে শুরু হয় বাবার আরেক সাহসী পদক্ষেপ। মানিকগঞ্জে তখন মেয়েদের কোনও কলেজ নেই। বর্তমান গণফোরামের কামাল কাকা বাবাকে তার স্বপ্নের কথা বলেন। কলেজ তো হবে, কিন্তু ছাত্রী কোথায়! একদম নতুন একটা কলেজে কোন অভিভাবক তার সন্তানকে ভর্তি করাবেন। আমার বাবা দমে যেতে শিখেন নাই। মানিকগঞ্জ মহিলা কলেজে প্রথম ছাত্রী হিসেবে নিজের কন্যার নাম লেখালেন। বড়দির দেখাদেখি ওর ক'জন বন্ধু ও ভর্তি হয়ে গেল। তারপর প্রিন্সিপাল কামাল কাকাকে সাথে নিয়ে এই পাঁচ থেকে ছয় জন দুঃসাহসী মেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে ছাত্রী ধরে আনার মিশনে নামলো। এদিকে কলেজ দাঁড় করানোর জন্য টাকার প্রয়োজন। এখানেও আমার বাবা আবার কাণ্ডারীর ভূমিকায় নামলেন। শুরু হলো যাত্রা পালা।

মানিকগঞ্জ অনেক আগে থেকেই যাত্রা গানের জন্য বিখ্যাত ছিল। নাট্য সম্রাট অমলেন্দু বিশ্বাস সহ অনেক নাট্যশিল্পীদের আমরা ছোট বেলায় খুব কাছে থেকে দেখেছি। বাবা আর তার বন্ধুরা মিলে দিনে রুটি রুজির সংস্থান করেন। আমাদের প্রেসে বিনা মূল্যে যাত্রার পোস্টার, টিকিট ছাপানো হয়। সন্ধ্যা থেকে শুরু হয় টিকিট বিক্রি। আমরা সপরিবারে যাত্রা দেখতে যেতাম। টিকিট ঘরের ছোট্ট খুপড়ি দিয়ে বাবাকে আবছা দেখা যেত। বাবা নগদ টাকায় টিকিট কিনে আমাদের কাছে দিতেন। কখনও একটা টাকাও নিজের জন্য খরচ করেন নাই। বরং আমাদের বা মায়ের অজান্তে উল্টো দান করেছেন। মধুর মাছিরা তখন চারপাশ ঘিরে ছিল। তারপর কমিটি, দলাদলি, সবার নাম কেনার ঘৃণ্য প্রতিযোগিতা। বাবা ওসবের ধার দিয়েই গেলেন না! সবার সাথে সুসম্পর্ক রেখেই ওখান থেকে চলে এলেন। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাওয়া মানুষটা কলেজের প্রথম ভর্তি হওয়া মেয়ের জন্য কোনও সুযোগ সুবিধা মুখ ফুটে বলতে পারেন নাই। কত বিত্তবান অভিভাবক দারিদ্র্যের সার্টিফিকেট নিয়ে বিনে পয়সায় মেয়েদের পড়িয়েছে। আমার বাবার মানসিক বৈভব ছিল ঈর্ষণীয়। সাংসারিক দীনতা তাকে কখনো ম্লান করতে পারে নাই!

আজ দশ বছর আমরা পিতৃহীন! আমাদের মহীরুহ চলে গেছেন অমৃতধামে। আমাদের মধ্যে বুনে গেছেন সত্য, ন্যায় আর যুদ্ধ করার অদম্য শক্তি। বাবা তুমি অপার শান্তিতে ঘুমাও। তোমার ছয় কন্যা জেগে আছে অতন্দ্র প্রহরী হয়ে ।
______________________________

ডা. সবিতা ই চক্রবর্ত্তী। লোকসেবী চিকিৎসক । সুলেখক।

 

ডা. সবিতা ই চক্রবর্ত্তী। লোকসেবী চিকিৎসক । সুলেখক।

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়