Ameen Qudir

Published:
2017-06-22 07:15:29 BdST

প্রতি বছর ঈদের সময় জামা কাপড় কেনা ছাড়া আমি কী বাবাকে কোনদিন কিছু দিয়েছি?


 

 

 

ডা. রেজাউল করীম
_______________________

 

আমার জন্মদিন ৫ই আষাঢ়, রবিবার, সাল জানি না কারন মা ঠিক মনে করতে পারতো না। বাবা বলেছিলেন, ১৩৭১ (ঐ বছর আষাঢ় মাসের ৫ তারিখ বুধবার) । তা সে যাক, সেটা কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। এমনি এক আষাঢ়ের ৫ তারিখে আমার বাবা চলে গেলেন। এমনি বেশ ছিলেন, ৮৮ বছর বয়স হয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজে সবকিছু করতেন। মৃত্যুর ১০ দিন আগে তাঁর সাথে দেখা করতে গেছিলাম। আমাকে বললেন- একে একে সবাই চলে যাচ্ছে! বাবার পুরনো কয়েকটি চিঠি, আমাকে দেওয়া দুটো আরবী কোরান শরীফ ছাড়া আমার বাবার কোন স্মৃতিচিহ্ন আমার কাছে নেই। যে কয়েকটি চিঠি ছিল, অনেকবার পডেছি- তুমি কেমন আছো, মেয়েরা কেমন আছে এর বাইরে বাবা হয়তো কোন রোগী পাঠিয়েছেন, তার কথাই বিস্তারিত লিখেছেন। এ সবের বাইরে তিনি কি ভাবতেন, আমার জানা নেই।


যখন ছোট ছিলাম আমি বাবার কাছ থেকে পয়সা চাইতাম আইসক্রীম খাবো বলে। ১০ পয়সায় একটা কাঠি আইসক্রিম পাওয়া যেত, আর একটু ভালো মানের গুলো ১৫ পয়সা। বাবা একটা রুমালে খুচরাগুলো বেঁধে রাখতেন। আমি চাইলেই ওখান থেকে দিয়ে দিতেন। মাঝে মাঝে বাবা কোথায় যেন যেতেন, বেশ কয়েকদিন দেখা যেত না। কিন্তু ফেরার সময় দেখতাম তিনি প্রথমে আমার দাদুর সাথে দেখা করে তারপর আমাদের বাড়ীতে আসতেন।

দুতিনদিনের চেয়ে বেশী দেরী হলে আমি খোঁজ নিতাম- বাবা আসছেন না কেন? মাও অনেক সময় ঠিক জানতো না তিনি কোথায় যান। জিজ্ঞাসা করলে খুব বিরক্ত হত। যখন আসতেন- বিল্বদার চানাচুর, কখনো বা মোরব্বা নিয়ে আসতেন।


একটা চিঠি তে দেখতে পাচ্ছি বাবা আমাকে লিখেছেন- তুমি ভুল করছো, তোমার দাদাও একই ভুল করেছিল। আমি অনেক চেষ্টা করেও এর মর্মোদ্ধার করতে পারিনি। প্রতি বছর ঈদের সময় জামা কাপড় কেনা ছাড়া আমি কী বাবাকে কোনদিন কিছু দিয়েছি? তিনি কখনো আমার কাছে কিছু চাননি। একবার আমার কাছে কী একটা কাজে এসেছিলেন এবং আমাকে বলেছিলেন- তোমার কাছে টাকা আছে? আমার কাছে যা ছিল প্রায় তার পুরোটাই দিয়েছিলাম। এই ঘটনাটিই কেবলমাত্র স্মৃতির দীর্ঘশ্বাসে মলিন হয়ে আছে।


আমি কেন তাকে জিজ্ঞাসা করি নি, তাঁর প্রয়োজন কতটা! আমার কাছে না থাকলেও সেটা জোগাড করে দেওয়া কোন অসম্ভব ব্যাপার ছিল না। সেই ভুল ই কী বাবা বলতে চেয়েছিলেন? বাবা ওর এক স্কুলজীবনের বন্ধুর গল্প বলেছিলেন। তাঁর বাবা তার কাছে কিছু টাকা চেয়েছিলেন। তিনি তার সব বাবাকে দিয়েছিলেন। বাবা মাথায় হাত রেখে তাঁকে আশীর্বাদ করেছিলেন- তুমি রাজা হবে! আমি তো পুরোটা দিতে পারি নি। খুব যৎসামান্য রেখে বাকীটা দিয়েছিলাম। একটা অপরাধবোধে মাঝে মাঝে মন খারাপ হয়ে যায়। কত রাত ঘুম ভেঙে বাবার মুখটা মনে করার চেষ্টা করি, পারি না।


আমরা সবাই মিলে গেলে বাবা খুব খুশি হয়ে নানারকম গল্প করতেন। আমাকে কোনদিন বলেন নি- আজ যাস না, আরেকদিন থাক। কিন্তু, যেদিন চলে আসতাম বাবা কেমন নিরাসক্তভাবে দূর থেকে তাকিয়ে থাকতেন। কাছে আসতেন না। শেষবার চলে আসার সময় দেখলাম বাবা চৌকিতে পা ঝুলিয়ে বসে আছেন। আমি ফিরে গিয়ে আবার তাঁর কাছে বসলাম। অন্যবারের মত তাঁর দৃষ্টির নিরাসক্তি আমি বুঝতে পারছি। তিনি আমাকে বললেন তাঁর সেই পুরনো বহুকথিত গল্পটি।

অন্যবারের মত নয়, এবার আমি মন দিয়ে পুরো কথাটা আবার শুনলাম। "শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় (জনসঙ্ঘের নেতা ও প্রখ্যাত সাহিত্য সমালোচক) আমাকে চিঠি লিখেছিলেন- তুমি সব বিষয়ে পাশ হইয়া বাংলায় ফেল হইয়াছ"। জীবনের ভাল দিকগুলি বেশী করে গুরুত্ব দিয়ে ভাবতেন। কত বড় অপটিমিস্ট হলে "সব বিষয়ে পাশ হইয়া বাংলায় ফেল" বলতে পারেন! কোন হারই কী অখণ্ড হার, কোন জিতই কী অখণ্ড জিত?। হার-জিতের মালায় গাঁথা মানুষের জীবন।


আমার বাবার প্রিয় মানুষদের মধ্যে দুজন ছিলেন মাডোয়াডী ব্যবসাদার। একজন তো আমাদের বাড়ীতে এসে থেকেওছেন- নিরামিশাষী আর মৎস্যভোজী দুই বন্ধুর পাশাপাশি খাওয়ার দৃশ্যটি আজো মনে করতে পারি।

অন্যজন ছিলেন রঘুনাথগন্জ বস্ত্রালয়ের মালিক। কাপড় চোপড় ওখান থেকে কেনা হত। টাকাপয়সার হিসাব একটা জাবদা খাতার লিখে রাখতেন। কখনো তেমন চাইতে দেখি নি। হাতে টাকাপয়সা জমলে বাবা দিয়ে আসতেন। আমি চাকরী করবো ঠিক করলাম তখন স্নাতকাত্তরে পড়ার ছাড়পত্র পেয়েছি। কিন্তু বাবাকে একটু সাহায়্য করা যাবে ভেবেছিলাম বলে পড়াশোনা বন্ধ করে আমি চাকরী করতে গেলাম।


কিন্তু মজা হচ্ছে বাবা আমার কাছ থেকে প্রায় কিছুই নেন নি। আমিই কী দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম? কেমন নিজেকে অপরাধী মনে হতে থাকে। একটা চিঠিতে দেখতে পাচ্ছি বাবা লিখেছেন- তোমার মায়ের শরীর ভালো নেই, যদি খারাপ কিছু হয় তাহলে আমি আর বাঁচবো না। অথচ, বাবা আমাকে অনেকবার বলেছেন- জানিস প্রার্থনা করলে মানুষের আয়ু বাডে? আমার মনে বহুবার এই প্রশ্ন এসেছে- ধর্মে ইহকালের চেয়ে পরকালকে এত রঙিন স্বপ্নমেদুর করে বর্ণনা করা হয়েছে তাহলে আয়ু বাডিয়ে লাভ কী?


ওপারে তো সব বিনা আয়াসে পাওয়া যাবে। বলিনি, কারন উনি দু:খ পেতেন। অনেকদিন আগে আমার বয়স তখন কত- নয় কি দশ। পরীক্ষা শেষ হয়েছে। বাবার সাথে একবার রামপুরহাট গেছিলাম। উনি সারা রাস্তা আমাকে ইংরেজী গ্রামার শেখাতে শেখাতে গেলেন। টেন্স শিখে ফেলছি দ্রুত। উনি জিজ্ঞাসা করলেন পরীক্ষায় কত নাম্বার পাবে? আমি বললাম সব (১০০) ই পাব। বাবা বললেন- বল ইনশা আল্লাহ পাব। আমি বললাম- না বললেও পাব। বাবা খুব দু:খ পেলেন। বললেন- কথাটা বললেই বা তোমার কী ক্ষতি হচ্ছে? তারপর বাবার সামনে ও গুরুজনের সামনে কথাটা বলতে শুরু করলাম। আমার অবশ্য ধর্মভাব জেগেছিল আর কিছুদিন পরেই, এবং অনেকদিন স্থায়ীও হয়েছিল।


১৯৮৪ সালে আমার প্রথম পরিচয় হয় একজন সুফি গুরুর সাথে। তিনি আমাকে বলেন- আত্মসমীক্ষা ও আত্মশুদ্ধির কথা। ইতিমধ্যে আমাদের ধারেকাছে হিন্দু, ইসলাম আর খৃষ্টীয় দর্শনের বই পেলেই সেটা একবার না পড়লে স্বস্তি পাই না। তাই, সংস্কার ও রীতির বাইরের ধর্মকে জানার খুব আগ্রহ হয়েছিল। আমার বাবাও খুব পড়াশোনা করতেন। আমাদের পড়াশোনার বাইরে কোন জীবন ছিল না, তাই জাগতিক ব্যাপারে খুবই কাঁচা ছিলাম। আমার বাবা কত লোককে যে টাকা দিয়ে ফেরত পাননি তার ঠিকঠিকানা নেই।


আমার একটা পড়ার টেবিলের খুব দরকার ছিল। বাবা আমাকে নিয়ে গিয়ে ছুতোরকে ডিজাইন এঁকে টাকা দিয়ে দিলেন। তারপর কত দিন চলে গেল সে টেবিল আর আসে না। আমরা প্রায়ই তার বাড়ীর পাশ দিয়ে যাতায়াত করি, আর সেও আমাদের এডিয়ে চলে। শেষ পর্যন্ত দিদিমা বললেন- ওঁকে আর কিছু বলে না। নিশ্চয় খুব দরকার ছিল। দিতে যখন পারছে না, আর লজ্জা দিয়ে লাভ নেই।

 

একটা ইসলামী ধর্মগ্রন্থ বাবা প্রায় পড়তেন। আমি খুব অবাক হয়ে দেখলাম- এই বইয়ে লেখা আছে- পৃথিবীর সব ধর্মই সমান। একটি উদাহারন পড়ে খুব অবাক হয়েছিলাম- কুঁয়োর জলে চাঁদের প্রতিচ্ছবি পড়লে যখন তার প্রশংসা করি তখন কি প্রতিচ্ছবির প্রশংসা করি নাকি চাঁদেরই প্রশংসা কীর্তন করা হয়।
মূর্তির গড়ে বা না গড়ে যদি ঈশ্বরকে ডাকা হয়, তাহলে সেই মূর্তি নয়, স্বয়ং ঈশ্বরেই প্রানমন সমর্পন করা হয়- শুধু দৃষ্টিভঙ্গির ফারাক। মুসলমান যদি বলে- সব প্রশংসা আল্লাহর জন্য, তাহলে যেখানে যাই প্রশংসা করা হোক তা আল্লাহর প্রশংসাই কী হল না? নাকি, বলছি সব প্রশংসা আল্লাহর কিন্তু বিশ্বাসের জোর নেই।

কাল সারা বিকেল ভ্রমন করে ত্রিচুর এসেছিলাম। সকালে শ্রীনিবাসন বললেন- কাছাকাছি একটি মন্দির আছে, যেতে চাই কিনা! আমি বললাম: চলুন। মন্দিরের ভেতরে গিয়ে দাঁড়ালাম।

পূজারী নাম জিজ্ঞাসা করলেন, বললাম। গোত্র- জানিনা। একে একে স্ত্রী কন্যা সবার নাম জেনে দীর্ঘ্যক্ষন শুদ্ধ সংস্কৃত মন্ত্র উচ্চারন করে তিনি পূজো দিলেন। চোখ বন্ধ করে মন্ত্রোচ্চারন শুনতে শুনতে তন্ময় হয়ে এক অদ্ভুত আবেগের সৃষ্টি হল- যেমন আমাদের সুফি গুরুর সাথে কথা বলতে বলতে মনের সব সংশয়, দু:খ, হতাশা, নিরাপত্তাহীনতা ভুলে যাই- মন যেন অন্য কোন স্তরে উন্নীত হয়ে যায়। তারপর একটা বেলী ফুলের মালা আমার গলায় পরিয়ে দিলেন।

আমি মনে করি, সব ধর্মকে আপন করে নেওয়ার এই ভাবকে যদি উদারতা বলা যায় তবে তার হাতে খড়ি হয়েছিল আমার বাবা-মা-দিদিমার হাত ধরে। তারা বিনা প্রশ্নে সব কিছুকেই আপন করে নিয়েছিলেন। ধর্ম মানে তাদের কাছে ছিল ঈশ্বরের ইচ্ছার সাথে নিজের ইচ্ছার মেলবন্ধন। যে কোন ভাবেই তা করা যায়- আকার- নিরাকার সেখানে গৌন।বাবার মৃত্যু বার্ষিকীকে মনে রেখে আজ মন্দিরে গিয়ে ঈশ্বরের প্রতিমূর্তির সামনে দাঁডিয়ে আজ খানিকটা হলেও তাঁদের প্রতি অন্তরের কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করলাম।


_____________________________

লেখক ডা. রেজাউল করীম , কবি, সুচিন্তক।

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়