Ameen Qudir

Published:
2017-05-28 08:05:28 BdST

অশ্রু দিয়ে লেখা


 

 

 

 

ডা. জামান অ্যালেক্স
________________

 

১....

নিজে কিভাবে চিকিৎসক হয়েছি আজকে শর্টকাটে তার গল্প শোনাই....

খুব ছোটবেলায় আমাকে খুব ভোরে উঠতে হত।ভোরের লেখাপড়া নাকি বেশী মনে থাকে-এটা ছিল আব্বুর থিওরী।আমাকে ছোটবেলায় শব্দ করে পড়তেও হত, কারণ আম্মুর থিওরী ছিল শব্দ করে পড়লে চোখের সাথে সাথে কানের মাধ্যমেও ব্রেইনে ইনপুট যায়, পড়াটা বেশী স্থায়ী হয়....

শৈশবে ঘুম থেকে ভোরে জাগা আমার জন্য কষ্টদায়ক ছিল, সহজে উঠতে চাইতাম না।আম্মু একটা কাজ করতো, মশারী উঠিয়ে ফেলত, আমাকে উঠানোর বাকী কাজটা মশাই করতো...

স্কুল থেকে ফেরার পর আমি এক ঘন্টা ঘুমাবার সময় পেতাম, বিকেলে আমাকে আব্বু পড়াতে বসাতেন।সন্ধ্যার কিছু আগে আমাকে মাঠে খেলতে যেতে দেয়া হত, বন্ধু বাসা থেকে নির্দিষ্ট করা ছিল, মাগরিবের আযানের সাথে সাথে বাসায় ঢুকতে হত।আমার জীবনে এমন রাত বহু গিয়েছে যখন আমি রাতে পড়তে পড়তে টেবিলেই ঘুমিয়েছি, আম্মু লক্ষ্য রাখতেন, ঘুমিয়ে গেলে আমাকে বিছানায় শুইয়ে উনি মশারী খাটাতেন....

একটু বড় হবার পর আব্বু-আম্মুর শাসন কমেছিলো, কিন্তু তাদের নজরে আমাকে ঠিকই থাকতে হতো।সময়ের পরিক্রমায় SSC, HSC তে টপমোস্ট রেজাল্ট করে মেডিকেলে ঢুকলাম।সেই টপমোস্ট রেজাল্ট করার জন্য আমাকে দিনে কতঘন্টা করে পড়তে হয়েছে, সেটি আর নাই বা বলি, তবে কোনো এক সাংবাদিককে এক সাক্ষাতকারে সেটা বলেছিলাম....

মেডিকেলে ঢুকে আরেক পরীক্ষার মহাসমুদ্রে পড়লাম।আমার বয়সী অন্যরা যখন ভার্সিটিতে টাল্টিগিরী করে ঘুরে বেড়িয়েছে, আনন্দে সময় কাটিয়েছে, আমাকে তখন চেয়ার-টেবিলে দিনের পর দিন শঙ্কিত চিত্তে বিনিদ্র রজনী কাটাতে হয়েছে, তখন শত শত, আই রিপিট, শত শত পরীক্ষা দিয়ে কোনো কোনো সাবজেক্টে অনার্স মার্ক নিয়ে চিকিৎসক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে হয়েছে।এ যুদ্ধ শুধু আমার ছিলো না, এ যুদ্ধ ছিলো একটি পরিবারের। নিজের নামের আগে "ডাঃ" শব্দটি লেখার জন্য নিজে যতটুকু কষ্ট করেছি, পিতামাতার ডেডিকেশন তার তুলনায় মোটেও কম ছিলো না....

যে কথাগুলো আমি আপনাদের সাথে শেয়ার করেছি, সে কথাগুলো বলা আমার জন্য সত্যিকার অর্থেই বিব্রতকর।কিন্তু আজ বিশেষ পরিস্থিতিতে আমাকে কথাগুলো বলতে হলো....

উদাহরণটা আমার।কিন্তু এদেশে প্রতিটি চিকিৎসকের গল্প কিছুটা রকমফের ভেদে প্রায় একইরকম, তবে আমি জানি-কারো কারো কষ্টের পরিমাণ আরো অনেক বেশী....

২....

HSC এর রেজাল্টের পর আমি মেডিকেলে ঢোকার ব্যাপারে এতটাই কনফিডেন্ট ছিলাম যে, আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে পরীক্ষা দেবার কোনো প্রয়োজনীয়তা কখনো অনুভব করি নাই।কেনো করি নাই, সেটা বলি...

যে ইউনিভার্সিটির ছেলেরা তপ্ত দুপুরে সবাইকে জ্যামে বসিয়ে রেখে উল্টো পথে বাস নিয়ে এগিয়ে যায়, গাড়ীর ড্রাইভার বাধা দিলে তাকে পেটায়, যে ইউনিভার্সিটিতে লেখাপড়া থেকে রাজনীতিই বেশী চলে, যে ইউনিভার্সিটির শিক্ষকরা বিদেশী ব্যাক্তিদের রিসার্চ পেপারকে নিজের নামে চালিয়ে দিয়ে ধরা খায়, যারা শিক্ষক পেটায়, যারা চিকিৎসক পেটায়, যারা ভাংচুরে নেতৃত্ব দেয়-সে ইউনিভার্সিটিতে অ্যাডমিশন টেস্ট দেয়া কোনো কাজের কথা না, আমি অ্যাডমিশন টেস্ট দেইওনি।আমাদের অনেকে দিয়েছিলেন, চান্স পাবার পরও সেখানে যান নি, যাবার কথাও না.....

৩....

নিজের জীবনের সব শখ-আহ্লাদককে বিসর্জন দিয়ে আমরা যখন মানবসেবায় নিয়োজিত তখন সারাদিন 420 গিরি করা এক DU ছাত্রীর আমাদের চিকিৎসকদের ব্যাপারে মনোভাব শুনবেন? তার কথার কিছু অংশ হুবহু তুলে ধরিঃ

"তোরা ডাক্তারি পড়বি, এরপর ডাক্তারি করবি, ভুল করলে মাইর খাবি, এরপর কি ছিড়ার ছিড়ে দে দেখি।তোদের থেকে সেবাও নিব, মাইরও দেব। কি করার করে নে। খেল খতম...."(কমেন্টে স্ক্রীনশট দেয়া আছে)...

কি কষ্ট করে এদেশের কিছু ছেলেমেয়ে চিকিৎসক হয় তা আমি বলেছি।এই দেশ আমাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে পারে নাই, সেটা নিয়ে খুব একটা ক্ষোভও নাই, এদেশের আলোবাতাসে স্পর্শ নিয়ে এদেশের মানুষের সেবা করতে পারছি, এটা আমাদের সৌভাগ্য।কিন্তু আপনাদের সেবা দেয়ার পর আপনারা আমাদের মুফতে 'মাইরও' দিবেন!! এ কেমন পাশবিকতা!!!

However,যে মেয়েটি(!!!) এই স্ট্যাটাস দিয়েছে সে মেয়েটি DU এর আইনের(!) ছাত্রী....

এখন বুঝি ছোটবেলায় কেনো পড়ানো হয়েছিলোঃ "তরুলতা সহজেই তরুলতা, পশুপাখি সহজেই পশুপাখি, কিন্তু মানুষ প্রাণপণ চেষ্টায় তবে মানুষ...."

৪....

কোনো দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চাইলে ঐ দেশের মেধাবী ছাত্রছাত্রীদের সযতনে লালন করতে হয়।আমরা লালন করতে পারি নাই।বুয়েটের ছেলেমেয়েরা বেশীর ভাগই দেশ ছেড়ে চলে যায়, এ বঙ্গমাতার সন্তানকে অন্যদেশ লালন করে এগিয়ে যায়।এ লজ্জা আমাদের। মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করে যারা চিকিৎসক হয় আমরা তাদের নিগৃহীত করি।আগে তাদের নিগৃহীত করতো অন্যরা, এখন নিগৃহীত করে DU এর ছাত্ররা, ছাত্রীরা।এমনটি হবার কথা ছিলো না।আগে ঢাকা ইউনিভার্সিটি প্রদীপের আলোর ন্যায় তার আলো ছড়াতো।প্রদীপের নিচেই থাকে অন্ধকার, আলো আস্তে আস্তে কমছে, প্রদীপের নিচের সেই অন্ধকার এখন রুমের বিশাল জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে....

৫....

একটা সময় ঢাকা ভার্সিটির জৌলুস ছিলো।এ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাদান করতেন অনেক প্রতিযথশা ব্যক্তিরা। যার কথা আমাকে সবচেয়ে বেশী আলোড়িত করে উনি সত্যেন বোস, যাঁর নামে একটি সাব-এটমিক পার্টিকেলের( Boson particle) নামকরণ পর্যন্ত করা হয়েছে, যাকে তাঁর কোয়ান্টাম তেজস্ক্রিয়তা ব্যাখ্যার জন্য প্রশংসা করেছিলেন স্বয়ং আলবার্ট আইনস্টাইন...

এখনকার অবস্থাটা বলি।এখন সেই বিশ্ববিদ্যালয়েরই শিক্ষক চিকিৎসক পেটাতে ছাত্রদের উস্কানি দেন, প্রেসনোট রিলিজ করে চিকিৎসকদের হুমকি দেন(কমেন্টে উস্কানিমূলক প্রেসনোটটি সংযুক্ত করা হলো)...

হায় ঢাকা ইউনিভার্সিটি! হায় তার ঐতিহ্য!

ঢাকা ভার্সিটি কি কখনো আর তার ঐতিহ্যময় পুরোনো শালীন রূপে ফিরে যেতে পারবে?এই পরিবর্তন কি আমরা দেখে যেতে পারবো? মনে হয় না।আল্লাহ পাকের এক বিশেষ নাম-'ইয়া মুয়াখখেরু', যার অর্থ -'হে পরিবর্তনকারী/হে পশ্চাৎ ধাবনকারী'।যা অবস্থা দাঁড়িয়েছে সেখানে ঢাকা ভার্সিটির জন্য এখন আল্লাহ পাকের এই নাম জপা ছাড়া আমরা আর কিই বা করতে পারি?

৬....

একটা কথা না বলে পারছি না। ঢাকা মেডিকেলের এক পাশে বুয়েট, আরেক পাশে ঢাকা ইউনিভার্সিটি।কোনোদিন শুনি নাই বুয়েটের ছেলেমেয়েরা এসে ঢাকা মেডিকেল ভাংচুর করেছে।তবে ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছেলেমেয়েরা যে কতবার ঢাকা মেডিকেল ভাংচুর করেছে সেটা বলে তাদের আর লজ্জায় ফেলতে চাই না....

আমি বিশ্বাস করি, এখনো ঢাকা ইউনিভার্সিটির বেশীর ভাগ ছাত্রছাত্রী নিরীহ।তারা কি জানে, DU এর নাম ব্যবহার করে কিছু কুলাঙ্গার অপকর্ম করে তাদের বন্ধুদেরকেও কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে? তাদের কি উচিত না-যারা চিকিৎসকদের পেটালো তাদেরকে চিহ্নিত করা? সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা কি বুঝতে পারছে যে এখন প্রক্টরকে তাদের বয়কট করা উচিত?

৭....

একবার এক রাজনৈতিক নেতার পোস্ট আমি শেয়ার করেছিলাম।সেখানে উনি ইনফর্ম করেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী বলেছেন-যেখানে চিকিৎসককে নিগৃহীত, লাঞ্ছিত করা হবে সেখানে আর কোনো চিকিৎসককে পাঠানো হবে না.....

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনার কি সময় হবে একটিবার সেন্ট্রাল হাসপাতালে যেভাবে আমার চিকিৎসক ভাইকে মারা হলো সে ভিডিওটি দেখবার?

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, যে দেশের জন্য আপনার আপনজনকে জীবন দিতে হয়েছে, যে দেশকে গড়ার কাজে আপনি ব্রতী হয়েছেন, আপনি দেখুন-কিভাবে সেদেশের চিকিৎসককে রক্তাক্ত করা হয়, আপনি দেখুন কিভাবে এদেশের মেধাবীদের নিষ্পেষিত করা হয়।আপনি দেখুন, বিচার করুন...

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী, আপনাকে আমার মনের একটি কথা বলি-- এটি শুধুমাত্র একটি ভিডিও নয়, এটি ১৯৭১ এর ১৪ ই ডিসেম্বর যে কালো মেঘ আমাদের ঘিরে ধরেছিলো, এ ভিডিওটি স্বাধীন দেশে সে ঘটনারই পুনরাবৃত্তি....

৮...

মা'র খুব ইচ্ছা ছিলো তাঁর ছেলে মেয়েকে তিনি চিকিৎসক বানাবেন।মহান আল্লাহ তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেছেন....

গতকাল মাকে ভিডিওটি দেখালাম-কিভাবে একজন ডাক্তারকে পেটানো হচ্ছে। বললাম, কোনো একদিন চিকিৎসক হবার অপরাধে আমিও মার খাবো.....

উনি নিশ্চুপ ছিলেন।উনার মনের ভিতর কি চলছিলো তা আমি জানি না তবে মাঝে মাঝে মনে হয় যদি বিধাতা আরেকটিবার আমাকে সুযোগ দিতেন, আমি আমার চিকিৎসক হবার বাসনাটিকে Reevaluate করতাম.....

৯....

সৃষ্টিকর্তা সাক্ষী আছেন, এ দেশের চিকিৎসকেরা কত শত প্রতিকূলতার মাঝেও আপনাদের জন্য তাদের চিকিৎসাসেবা অব্যহত রাখেন।তৃতীয় বিশ্বের মানুষ হয়েও আমরা মধ্যম সারির চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করেছি। আর আমাদেরকে আপনারা অমানুষের মত মারেন?

আপনাদের জন্মের সময় যেমন আমরা হাসিমুখে এই পৃথিবীতে আপনার পদযাত্রা নিশ্চিত করি, তেমনি শত চেষ্টার পরও আপনি যখন মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যান তখন তো আমাদের চিকিৎসকদের হৃদয়েও রক্তক্ষরণ হয়। এদেরকেই আপনারা রক্তাক্ত করেন? আমরা কি আপনাদের আপনজন নই? এটা বন্ধ করা যায় না? এটা কি খুব কঠিন কিছু?জানেন, আপনারা যখন আমাদের পিটিয়ে আহত করেন, তারপরও আমরা কিন্তু দাঁতে দাঁত চেপে আপনাদের চিকিৎসা দিয়ে যাই।আমাদের মনের অবস্থাটা কি আপনারা তখন একটু কল্পনা করতে পারেন?আমাদের কান্নার শব্দ কি তখন আপনারা শুনতে পান? সে সময় কিন্তু আমাদের খুব কষ্ট হয়, সত্যি বলছি- খুব কষ্ট....
_____________________________

 

 

 

ডা. জামান অ্যালেক্স । সুলেখক।

আপনার মতামত দিন:


প্রিয় মুখ এর জনপ্রিয়