RAHANUMA NURAIN AONTY
Published:2026-07-01 20:13:28 BdST
ওসিডি ডায়েরি: ৩৬একজন ওসিডি রোগীর কষ্টের কথামালা
অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন মনোরোগবিদ্যার বরেণ্য চিকিৎসক
অধ্যাপক ডা. সুলতানা আলগিন
অধ্যাপক
মনোরোগ বিদ্যা
ওসিডি ও জেরিয়াট্রিক মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শক
___________________________
চেম্বারে সামনের চেয়ারে এসে বসলেন একজন ভদ্রমহিলা এবং ভদ্রলোক। দেখে বোঝা যাচ্ছে সম্পর্কে স্বামী-স্ত্রী।স্বামী চুপচাপ। মহিলা নিজেই রোগী । বয়স পয়তাল্লিশ হবে। কথা বলতে শুরু করলেন। তার রোগ প্রায় সাত-আট বছর । তাকে বলেছিলাম কমপক্ষে ২বছর টানা ওষুধ খেতে হবে । উনি তা খেয়েছেন । ভালোও ছিলেন। এখন আবার সমস্যাগুলো দেখা দেয়ায় সেই সুদূর ফরিদপুর থেকে এসেছেন।এক নি:শ্বাসে কথা বলে শেষ করলেন। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি।
থামলে পরে জিজ্ঞেস করলাম আপনাকে কি আর কোন পরামর্শ দিয়েছিলাম? আপনার প্রেসক্রিশনে দেখছি ডায়াবেটিস এবং হাইপোথাইরয়েড আছে । এগুলোর ওষুধ কি নিয়মিত চলছে? উত্তরে জানালেন হ্যাঁ । নিয়মিত খাচ্ছেন ।
ঐ রোগের ডাক্তারও দেখিয়েছেন।
আমি বললাম । খুব ভালো কথা । তা আপনার মানসিক রোগ ওসিডির জন্য ফলোআপের কথা। আপনার এই তিন বছরে একবারো মনে হয় নাই? আর ফরিদপুর - ঢাকা এখন তো মাত্র কয়েক ঘন্টার পথ!
মনে হয় আকাশ থেকে পড়লেন। মুখ কাচুমাচু করে স্বামী দিকে তাকিয়ে জানালেন 'সম্পূর্ণ ভালো ছিলাম। তাই ওষুধ বন্ধ করে দিয়েছিলাম। এখন সমস্যাগুলো আবার দেখা দিয়েছে।
বলেন কি কি সমস্যা হচ্ছে আপনার?
রোগী শুরু করলেন ”সেই আগের মত ওয়াশরুমে এক দেড় ঘন্টা, তালা চুলা বার বার চেক করা। টাকা হ্যান্ডওয়াশ দিয়ে ধোয়া”। দেখি পাশে বসা ভদ্রলোকটি মুচকি মুচকি হাসছেন।
মহিলা বলে চলেছেন “সব কিছুতে ঘেন্না লাগে । গতকাল বের হয়েছিলাম। পাশ থেকে একটা কুকুর গেল। সারা শরীরে ঘা। আমি বাসায় এসে এক মুহূর্ত দেরী না করে সরাসরি বাথরুমে গেলাম। একদেড় ঘন্টাতেও বের হতে পারছিলাম না। সবাই বকাবকি শুরু করল। এত রাতে গোসল করা, কাপড় ধোয়ার কি দরকার? কিন্তু নিজেকে প্রবোধ দিতে পারি নাই। এজন্য আমাকে বলতে গেলে জোর করে নিয়ে আসলেন আমার স্বামী”।
আমি শুনছিলাম । ঠিক আছে।আর কিছু বলবেন?
উনি জানালেন তার রোগ শুরু হয়েছিল তার শ্বশুরের অসুস্থতা দিয়ে। তখন শ্বশুর বিছানায় শায়িত ছিলেন। তার পায়খানা প্রস্রাব গোসল করানো খাওয়ানো কাপড়চোপড় ধোয়া সবকিছু উনি একহাতে সামলাতেন। উনি মারা গেছেন । এখন আবার তার শাশুড়ী বিছানায় পড়েছেন। তার কাজগুলি আবার তারই করতে হচ্ছে। আর এই কারণেই তার সমস্যাগুলো দেখা দিয়েছে। ঘুম খাওয়দাওয়া কোন কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছেন না।
এসব বলেই তিনি তার স্বামীর দিকে তাকালেন। তখন বুঝলাম রোগীকে তড়িঘড়ি করে নিয়ে আসার কারণ। রোগীর অসুস্থতার থেকে মায়ের দেখাশোনা কে করবে এই চিন্তায় হয়তো বা স্বামী বেশি শঙ্কিত ।
আমি ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি ওসিডি একটা মানসিক রোগ সেটা বোঝেন?
মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো যে সে জানে। তাকে জিজ্ঞেস করলাম আমি প্রত্যেক রোগীকে বলে দেই ডায়াবেটিস থাইরয়েড রোগের মত ওসিডি একটা রিাময় যোগ্য সাধারণ মানসিক রোগ। নিয়মিত ফলো আপে থাকতে হয়। উন্নতি দেখলেই ওষুধ বন্ধ করবেন না। এই ভুলগুলো কেন করেন? উত্তরে সেই একই কথা ভালো হয়ে গেছে তাই আর ওষুধ কেনা হয় নাই।আর রোগীও ওষুধ খেতে চাইছিল না।
মনে মনে বিরক্ত হলেও ভাবলাম সমস্যা হওয়ার সাথে সাথে তো ডাক্তার দেখাতে আসছে। এই-ই অনেক। তাই তাদের জানালাম ওষুধ খেতে কোনপ্রকার গাফিলতি চলবে না। নিয়মিত ফলোআপ করবেন । অনলাইনে রোগী দেখানোর ব্যবস্থা রয়েছে। তাছাড়া দেশের মধ্যে দূরত্ব কমে এসেছে। চাইলেই আসা যায়। ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে ওষুধ বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিবেন। নিজে থেকে বা আশেপাশের বন্ধুবেশী শত্রু আত্মীয়স্বজন, কলিগ বা বন্ধুবান্ধবের ইয়ার্কি হাসাহাসি দেখে মনোবল হারাবেন না, মন খারাপ করবেন না বা অবৈজ্ঞানিক পরামর্শ নিবেন না।@
1.7.2026
আপনার মতামত দিন:
