Dr. Aminul Islam

Published:
2021-10-28 11:26:51 BdST

অফথালমোলজী, কটনউল হেমোরেজ, কলিজা সিংগারা এবং একটি ঘটকালি


 

ডা. তারিক আলম অনি
রেজিস্ট্রার, জেনারেল সার্জারী
রকহ্যাম্পটন হসপিটাল, সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া

———————————————-

(এই গল্পের কোন চরিত্রই কাল্পনিক নয়। কোন কাহিনী বা ঘটনার সাথে আংশিক বা সম্পূর্ণ মিল মোটেও কাকতালীয় নয়।)

আসুন গল্পে প্রবেশ করি।

সময়টা ২০১০। ইন্টার্ণ করছি। প্লেসমেন্ট পড়েছে অফথালমোলজী( চক্ষু) বিভাগে। আউটডোর এ আবাসিক সার্জনের রুমে ক্লাস হত। এক বড় ভাই খুব যত্ন নিয়ে আমাদের রোগী দেখাতেন এবং পড়াতেন। পূর্বপরিচিতির সুবাদে সেই বড় ভাই এর সাথে এখন ও আমার ভালো খাতির। ভাইয়া এখন দেশে জনপ্রিয় চক্ষু বিশেষজ্ঞ।

এমন ই একদিন সুন্দর ঝলমলে সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অফথালমোলজী ( চক্ষু) আউটডোর এ রোগী দেখা এবং ক্লাস চলছে। ভাইয়া প্রথমে নিজে রোগী দেখেন, তারপর নিজে রোগীর চোখ স্লিটল্যাম্প যন্ত্রে পরীক্ষা করে রেটিনার( চোখের পিছনের একটি স্তর) ফাইন্ডিং বের করে শেখানোর জন্য আমাদের দেখতে বলেন। বই এর সাথে মিলিয়ে হাতে কলমে শিক্ষা।

আমরা রোগী দেখি, স্লিট ল্যাম্পে রোগীর চোখের ভিতরের নানা রোগ এর নিদর্শন দেখি। আমি প্রায়সময় ই কিছু বুঝিনা। না বুঝেই ডান-বাম মাথা নাড়ি। তার উপর সকালবেলা নাস্তা করে যাইনা, মাথায় ঘুরতে থাকে ক্যান্টিনের কলিজা সিংগারার কথা। ভাইয়া স্লিট ল্যাম্পে রোগীর চোখ দেখিয়ে বলেন, “দেখেছো রেটিনাতে কেমন তুলার মত রক্তক্ষরণ… এর নাম ‘কটন উল হেমোরেজ’ … এই রোগীর নার্ভ ড্যামেজ হয়েছে বুঝলা …? “

আমি স্লিট ল্যাম্প যন্ত্রের আইপিসে চোখ রেখে তুলার মত কিছুই দেখিনা, দেখি হলুদ রং এর সুস্বাদু সিংগারার ভিতরে কলিজা আর মশলা দেওয়া আলু … নার্ভ ড্যামেজ খুজে পাইনা। কীয়েক্টাবস্থা !

দু’ঘন্টা ক্লাশ- রোগী দেখার পর ভাইয়া আধা ঘন্টার ব্রেক দিলেন। মেয়েরা ক্যান্টিনের দিকে গেল, আমরা কয়েকজন ছেলে রয়ে গেলাম। মেয়ারা চলে যাওয়া মাত্রই ভাইয়া মূল আলাপ পাড়লেন। আমাকে জানালেন তার এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু সম্প্রতি মেডিসিনে এফসিপিএস পাশ করেছেন, বিয়ের জন্য ডাক্তার পাত্রী খুঁজছেন। আমাদের ব্যাচের একজন ইন্টার্ণ মেয়েকে ভাইয়ার বেশ পছন্দ হয়েছে, প্রাথমিকভাবে নির্বাচন ও করে ফেলেছেন বন্ধুর জন্য। আমার কাছে তিনি পাত্রী সম্পর্কে আরও জানতে চান।

- তারিক, তোমাদের ব্যাচের এই রোল নম্বর এই মেয়েটা কেমন?
- খুবই ভালো মেয়ে বস।
- হুম… দেখতে শুনতে তো বেশ ভালো, শান্ত শিষ্ট টাইপ …
- জ্বী বস। খুবই শান্ত শিষ্ট মেয়ে। কোন ভেজালে নাই । কারও সাত এ পাচে নাই …
- বেশ বেশ… তা মেয়ের বাড়ি কই ? বাবা কি করে? নিজের বাড়ি? ভাই বোন কয়জন ? ভাই কি করে? ফ্যামিলি কেমন ? বংশে পাগল টাগল নাই তো ? নামাজী ফ্যামিলি ? রাজনৈতিক ব্যাপার স্যাপার নাই তো ? ব্যবসায়িক ফ্যামিলি ? উকিল ফ্যামিলি ? মেয়ে কোন সাবজেক্টে ক্যারিয়ার করতে চায় ? ইত্যাদি ইত্যাদি …

আমি হাসিমুখে খুবই আগ্রহের সাথে ধৈর্য নিয়ে এক এক করে সবগুলো প্রশ্নের উত্তর দিয়ে গেলাম। সব তথ্য জানার পর ভাইয়া প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত পাত্রীটিকে পদোন্নতি দিয়ে বন্ধুর জন্য মাধ্যমিকভাবে নির্বাচিত করলেন। পাত্রী এককথায় পারফেক্ট। বন্ধুর সাথে কথা বলে পছন্দ হলেই সেটা উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে যাবে, এরপর পারিবারিকভাবে মুরব্বীদের মাধ্যমে সেটা বিশ্ববিদ্যালয়ের চুড়ান্ত ডিগ্রী ‘বিবাহ’ সার্টিফিকেট গ্রহণ করবে । প্ল্যান বেশ ভালো। এত দ্রুত বন্ধুর জন্য পাত্রী পাওয়া যাবে এটা ভাইয়া ভাবেননি, তিনি যারপরনাই খুশি। আমি ও ভাইয়াকে সঠিক তথ্য দিয়ে সাহায্য করতে পেরে খুশি।

ভাইয়া নিজের পয়সায় গরম গরম স্পেশাল কলিজা সিংগারা আনিয়ে ফেললেন। আমার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, আমি তো সিংগারার জন্যই সেই সকাল থেকে অপেক্ষা করে আছি! তিনি ফুরফুরে মেজাজে সিংগারায় কামড় দিলেন। আমি ও হাসিমুখে সিংগারা খাচ্ছি। তথ্য প্রদানকারী হিসেবে আমার এখন আলাদা খাতির। চাইলে সবগুলো সিংগারা খেয়ে ফেলতে পারি। আরও পাঁচটা সিংগারা পার্সেল চাইলেও ভাইয়া না করার কথা না!

আজকের সিংগারা গুলো বেশ ভালো। আমি সিংগারা খাচ্ছি আর ভাবছি সিংগারার ভিতরের কলিজা টা আগে খাবো নাকি আলু টা আগে খাবো? তবে এখন ও আলু আর কলিজা একসাথে মিলে সেই স্লিটল্যাম্পের ‘কটন উল হেমোরেজ’ এর মতই লাগছে! নাহ, এই কঠিন ‘অফথালমোলজী’ সাবজেক্ট টা আমাকে দিয়ে বোধহয় আর হল না ! রুগীর চোখের ভিতর তাকিয়ে কলিজা সিংগারার আলু-কলিজা দেখলে চিকিতসা দিব কি? এন্টিবায়োটিক? রোগী তো অন্ধ হয়ে যাবে!

রোগী অন্ধ হোক আর যাই হোক, কটন উল হেমোরেজ’ কলিজা সিংগারাগুলো খেতে বেশ ভালো… এ জাতীয় উচ্চমার্গীয় চিন্তা করতে করতে চোখ বন্ধ করে সিংগারা চাবাচ্ছি এমন সময় ভাবনায় ছেদ পড়লো। হঠাৎ ভাইয়া বললেন,
- এই তারিক, আসল কথাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নাই।
- কি আসল কথা বস ?
- তোর এই ব্যাচমেটের এফেয়ার ট্যাফেয়ার নাই তো? মানে প্রেম টেম ?
- জ্বী বস। আছো তো …

ভাইয়ার সিংগারা খাওয়া নিমেষেই থেমে গেল। তিনি মনে হল সিংগারার বাটিটাও একটু নিজের দিকে টান দিয়ে সরিয়ে নিলেন …
- বলিস কী! তুই আগে বলবিনা মেয়ের এফেয়ার আছে ?
- বস ওইটা তো জিজ্ঞেস করেন নাই…
- তাও ঠিক!  তা কার সাথে এফেয়ার এই মেয়ের ?
- ইয়ে মানে বস… আমার সাথেই এফেয়ার !

ভাইয়া শূণ্য দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। ‘অধিক শোকে পাথর’ টাইপ চাহনি। সেটা বন্ধুর পাত্রী হারানোর শোক নাকি আমি অলরেডী দুইটা বিশাল ‘কলিজা সিংগারা’ সাবাড় করে ফেলার শোকে সেটা ঠিক বোঝা গেল না। একটু আগে নার্ভ ড্যামেজ হওয়া রোগীটার ও একইরকম চাহনি ছিল !

আমি কালবিলম্ব না করে তৃতীয় সিংগারার দিকে হাত বাড়ালাম। আমার চোখ উজ্জ্বল, মুখে হাসি। দুটো বিশাল সাইজের সিংগারা খেয়ে আমার ব্রেনে এখন যথেষ্ট পরিমাণ সুগার চলে এসেছে, ব্রেন দৌড়িয়ে কাজ করছে। এখন ‘অফথালমোলজী’ বিষয়ে আমার ধারণা ক্লিয়ার হয়ে গেছে। আমি আমার প্রশ্নের উত্তর ও পেয়ে গেছি! আমি আবিষ্কার করে ফেলেছি সিংগারা খাওয়ার সময় আলাদা করে আলু ও আগে খেতে নেই, কলিজা ও আগে খেতে নেই, দুটো একসাথে বিশাল কামড়ে মুখে পুরলেই সবচেয়ে বেশি মজা ! 

পাঠক পাঠিকার সুবিধার জন্য চোখের রেটিনার ‘কটনউল হেমোরেজ’ আর ‘সুস্বাদু কলিজা সিংগারার’ ছবি দেওয়া হল। আপনারাই বলুন দুটো দেখতে একই কিনা ! 

তারিক অনি , রকহ্যাম্পটন থেকে
২৮.১০.২০২১

আপনার মতামত দিন:


ক্লিনিক-হাসপাতাল এর জনপ্রিয়