Ameen Qudir

Published:
2017-02-06 04:16:23 BdST

অভুক্ত সন্তানের মুখ এবং লোভী , অসামাজিক ডাক্তার



ডা. মীরা মমতাজ সাবেকা
_____________________________

মৌসুমী জ্বর কখনো একদিন থেকে চলে যায়না।
ভুগায়, কম করে হলেও তিন থেকে পাঁচ দিন।জ্বরের কারনে একদিন চেম্বার গেলাম না। পরদিন এক রোগী ভিজিট দিলনা, কারণ গতকাল এসে সে আমাকে পায়নি।


আমি মেধাবী এই দাবী করব না, তবে ‘বড়’ ডাক্তার হতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে নি:সন্দেহে।

অত:পর ছুটে চলা, কিছুটা জীবিকার তাগিদ, তা অস্বীকার করার জো নেই। তবে জীবনের তাগিদ কম নয়। আমার বয়সী মেয়েরা যখন শপিং করে আর সিনেমা দেখে, রঙিন জামা আর প্রসাধনী তে ঝলমল করতো, তখন আমি ব্যস্ত ডাক্তারি পড়াশুনায়।

এই পথ বেছে নিয়েছি এ জীবনকে ভালবেসে। রোগ নির্নয় আর রোগ নিরাময়ের আনন্দ একান্ত নিজের। কারো সংগে ভাগ করে নিতে গেলে বড়াই করা হয় এই পথ চলা সহজ নয়, এ জীবন ব্যস্ততম, অসামাজিক। চেম্বার বা হাসপাতাল বা ডিউটি কামাই করা চলবে না।

তাই সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে প্রায়ই কামাই দিতে হয়, উপায় কি? এমনই কামাই করা বা দেরীতে পৌছানো অনুষ্ঠানে শুনতে হয় “টাকার পেছনে আর কত ছুটবে হে?” আর তাই আমি লোভী।


সামাজিক অনুষ্ঠান এ যেতে পারি বা না পারি, কেউ অসুস্থ হলে আমাকে সুস্থ থাকতে হবে, সেবা দিতে হবে। সামান্য সর্দিকাশিতে তো আর হাসপাতাল বাদ দেয়া চলে না। বহুবার অর্বাচীন রোগীর মুখে শুনেছি “ওমা! ডাক্তারের আবার অসুখ হয়!” এ যেন পৃথিবীর সপ্তম আশ্চর্যকেও হার মানায়। ডাক্তার তো মানুষ নয়, তার আবার কেন অসুখ হবে?


অনেক সময় রোগী বলবে, একটু অপেক্ষা করেন, রিপোর্টটা নিয়ে আসি, বাসা অনেক দূর। বাধ্য হয়ে বলি, বোন আমারও ঘর সংসার আছে। ঘরে ছেলে না খেয়ে অপেক্ষা করছে। বিনা কারনে অপেক্ষা করা আমার সাজে না।


রোগী বসিয়ে রেখে প্রাকৃতিক কাজ সারতে যাওয়াও দোষ, “ অনেকক্ষণ বসে আছি, আপনিতো চলে গেলেন”। কাজ করতে করতে ক্লান্ত হওয়া চলবেনা। ক্ষিধে পেলেও অপরাধ। “রোগীরা বসে আছে, আর ডাক্তার চ-নাস্তা খায়, চা খেতে কতক্ষণ লাগে শুনি?”

সবাই এক নয়। ভালমানুষ আজও আছে। তবে, স্মৃতি বড় একপেশে,মন্দটাই মনে রাখে। যে রোগীর লোক ডাক্তারকে মারধোর করে, হাত কেটে দেয়, তাদের সংখ্যা আসলেই কম, কিন্তু তাদের ধার অনেক। তারা ধারে কাটে না, ভারে কাটে।


রোগীদের এহেন নীচ ও অসুস্থ মানসিকতা দিনদিন বেড়ে চলেছে। কারণ কি? জাতিগতভাবে আমরা কি এমন হিংস্র আর বর্বর? আমাদের ইতিহাস সেকথা বলেনা। সার্বিক বিবেচনায় একথা অনস্বীকার্য যে আমাদের সমস্যা অনেক। আমাদের নেই কোন রক্ষাকবচ।

রোগীরা মনে করে আগ্রাসী মনোভাব আর আচরণ বজায় রাখলেই অধিকার আদায় সম্ভব। কেননা, তাদের অভিযোগ জানানোর যথাযথ জায়গার অভাব। উন্নত বিশ্বে রয়েছে অভিযোগ জানানোর যথাযথ ব্যবস্থা। অন্যদিকে, ডাক্তারদের রয়েছে রক্ষাকবচ।

আমাদের দেশের ডাক্তারদের রক্ষাকারী আইন, আইনী সহায়তা নেয়ার সুনির্দিষ্ট পথ পরিক্রমা নেই। আমরা মানববন্ধন করি, বক্তৃতা, লেখালেখি করি, কিন্তু আইন প্রনয়ন অনিবার্য , আইনের প্রয়োগ অবশ্যম্ভাবী। আমি শুধু ঘটনার বিচার চাইনা, ঘটনার মূলোৎপাটন দাবী করি।হলুদ সাংবাদিকতার প্রতিকার দাবী করি।

আমি আমার পেশার রক্ষাকবচ চাই, কাজের সুস্থ পরিবেশ চাই। যে পরিবেশে সুস্থ মস্তিষ্কে, নিরাপদে, নিরুপদ্রবে কাজ করা যাবে তেমনি একটি হাসপাতাল চাই। এশুধু একজন চিকিৎসকের দাবী নয়, আমার বিশ্বাস, এ দাবী প্রতিটি দেশপ্রেমিকের।

_______________________________

লেখক ডা. মীরা মমতাজ সাবেকা । লোকসেবী চিকিৎসক।

Neurologist & Medicine specialist. MD(Neurology), MRCP (UK)

আপনার মতামত দিন:


ক্লিনিক-হাসপাতাল এর জনপ্রিয়