ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ

Published:
2020-06-22 09:37:09 BdST

চিকিৎসকদের দু'টো বাবাসংস্থা ও একলাখ রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের হাল বলছি


 

ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ

_____________________

বাবা দিবস পার হয়ে গেলো।
নিউজফিডে প্রায় সবাই বাবাকে নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন।
আমি অন্যরকম একটা পোস্ট দিই।

আমি একজন চিকিৎসক।
আমার মতো এইদেশে প্রায় একলাখ রেজিস্টার্ড চিকিৎসক আছে।

আমাদের এইসব চিকিৎসকদের দু'টো বাবাসংস্থা আছে। তারা হলো স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আর স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয়!

এইসব বাবাসংস্থার অধিকর্তারা যে আমাদের চিকিৎসকদের জন্য কতোটা নির্দয় ও অমানবিক সেটার ইতিহাস লিখতে গেলে এইরকম দু'চারটা বাবাদিবস পার হয়ে যাবে তবু তাদের স্বার্থপরতার কাহিনী শেষ হবে না!

আমি সেদিকে যাবোও না, আমি শুধু সাম্প্রতিক দু'একটি ঘটনার কথা বলি।

কয়েকদিন আগে আমরা দেখলাম,
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এক বিরাট কর্তাব্যাক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়ে সিএমএইচে ভর্তি হলেন।
বাংলাদেশের সব সরকারি হাসপাতালের দেখভালের দায়িত্ব যার অধিদপ্তরের সেই তিনিই নিজের পরিচালিত সরকারি হাসপাতালে ভর্তির ভরসা পেলেন না!
কেন ভরসা পেলেন না, সেই বিব্রতকর প্রশ্নে আর নাইবা গেলাম!

গতবছর যখন ডেঙ্গির ঝাপটায় সারাদেশ পর্যুদস্ত তখন আমরা দেখেছিলাম,
আমাদের আরেক বাবাসংস্থার সর্বোচ্চ অধিকর্তা আমাদেরকে ঢালতলোয়ার ছাড়াই যুদ্ধে নামিয়ে দিয়ে নিজে সপরিবারে মালয়েশিয়ায় অবকাশভ্রমনে গিয়েছিলেন!
এবারের করোনা যুদ্ধেও যে তার খুব বেশী একটা তারতম্য হয়েছে তেমন নয়!

দেশে প্রায় চারমাস যাবৎ করোনার করালগ্রাস চলছে, আমরা চিকিৎসকরা প্রতিটা হাসপাতালে হাজারো অপ্রতুলতার মাঝেও জান লড়িয়ে যুদ্ধ করে যাচ্ছি অথচ আজ পর্যন্ত আমাদের সেনাপতি একটা হাসপাতালে সশরীরে গিয়ে আমাদের খোঁজখবর নিলেন না, একটু উৎসাহ-প্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করলেন না!

আল্লাহ্ না করুন,
তিনি যদি করোনা আক্রান্ত হন তাহলে তিনিও এইসব সরকারি হাসপাতালে হয়তো যাবেন না। তিনিও হয়তো স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালকের মতো সিএমইচেই ভর্তি হবেন।
আগের মতো সুযোগ থাকলে অর্থাৎ বিশ্বব্যাপী করোনার করালগ্রাস না থাকলে হয়তো তিনি দেশের বাইরেই বামরুনগ্রাদ বা মাউন্ট এলিজাবেথেই যেতেন!

আমাদের বাবাসংস্থার আধিকারিকরা এতোটাই স্বার্থপর যে, তারা নিজেদের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যেমন সর্বোচ্চ সুযোগসুবিধা সম্বলিত হাসপাতাল খোঁজেন, দেশের সাধারন নাগরিকদের জন্য সরকারি হাসপাতালগুলোতে সেইরকম সুযোগসুবিধা নিশ্চিৎ করার জন্য তারা মোটেও ততোটা তৎপর নন!
এবং তারা নিজেরা নিজেদের সুরক্ষার জন্য যতোটা উদগ্রীব তাদের অধীনস্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মোটেও ততোটা উদগ্রীব নয়!

তারা এই করোনাকালে বিচারকদের চিকিৎসার জন্য আলাদা হাসপাতাল নির্ধারন করে প্রজ্ঞাপন দিতে পারেন অথচ চিকিৎসকদের জন্য আজ পর্যন্ত একটা আলাদা হাসপাতালের ব্যাবস্থা করার চেষ্টা তারা করতে পারেন না!

আজ তারা হাস্যকর একটা প্রজ্ঞাপন জারি করে চিকিৎসকদের মন ভোলানোর চেষ্টা করেছেন।
তারা সকল হাসপাতালে চিকিৎসকদের জন্য সুযোগের ব্যাবস্থা করার জন্য একটি প্রজ্ঞাপন জারি করেছেন!

আজব!
এইটা আলাদা করে প্রজ্ঞাপন দিয়ে বলার কি আছে!?
দেশের সকল নাগরিকের জন্য সকল সময় সকল সরকারি হাসপাতালে সেবা পাওয়ার সুযোগ তো সেই আদিকাল থেকেই আছে!
এই প্রজ্ঞাপন জারি করে তারা নতুন কি মেসেজ দিতে চায়লেন বোধগম্য হলো না!

.
আমাদের বাবাসংস্থার আধিকারিকরা পুলিশ ভাইদের জন্যও আলাদা হাসপাতালের ব্যাবস্থা করে দিয়েছে যদিও পুলিশের জন্য আলাদা নিজস্ব হাসপাতাল আছে।

আমাদের পুলিশ ভাইয়েরা আমাদের পাশাপাশি সবচেয়ে বেশী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
এইদেশের অসচেতন আর গোয়ার মানুষগুলোকে সামাজিক সেবা দিতে গিয়েই তারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন।
তাদের এই স্যাক্রিফাইসকে আমরা স্যালূট জানাই। তাদের জন্য আলাদা হাসপাতালের ব্যাবস্থা করায় আমরাও খুশি।

কিন্তু নির্মম পরিহাস হলো,
আমাদের এইসব বাবাসংস্থার অধিকর্তারা আমাদের চিকিৎসকদের জন্য আজ পর্যন্ত একটা হাসপাতাল নির্দিষ্ট করে দেননি!

আজ পর্যন্ত পঁঞ্চাশের অধিক সহযোদ্ধা চিকিৎসককে হারিয়েছি।
তাদের কারো জন্যই সিএমএইচ তো দূরে থাক সাধারন সরকারি হাসপাতালেও একটা শয্যা পেতে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়েছে!

এমনকি এমনও দেখা গেছে যে,
চিকিৎসকরা নিজে যে হাসপাতালে কাজ করছেন, যে হাসপাতালে সেবা দিয়ে শ'য়ে শ'য়ে করোনা রুগিকে সুস্থ্য করে তুলছেন সেই একই হাসপাতালে নিজে বা নিজের মাবাবা, বউবাচ্চার জন্য একটা শয্যা পাচ্ছেন না যখন তারা নিজেরাই করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন!

.
আমরা সিএমইচে যেতে চাইনা।
আমরা সাধারন একটি হাসপাতাল চাই।
আমরা আমাদের বাবাসংস্থার অধিকর্তাদের মতো জাতির সাথে বেঈমানী করতে চাইনা।

অন্য সাধারন রুগির জন্য যেরকম হাসপাতাল আছে সেইরকম একটি হাসপাতালকেই আমাদের জন্য ডেডিকেটেড করে দিলেই আমরা জাতির কাছে কৃতজ্ঞ থাকবো, কৃতজ্ঞ থাকবো আমাদের বাবাসংস্থার কাছে।
_______

পুনশ্চঃ

চিকিৎসকদের জন্য একটি ডেডিকেটেড হাসপাতাল চাওয়ার ব্যাপারটি যাদের কাছে স্বার্থপরতা মনে হচ্ছে তাদের জ্ঞাতার্থে বলতে চাই করোনা মোকাবেলা করতে গিয়ে এই পর্যন্ত ৫১জন চিকিৎসককে হারিয়েছি আমরা।
সারা পৃথিবীতে অপরাপর যেসব দেশ করোনা মোকাবেলা করছে তাদের সবার তুলনায় সময় ও সংক্রমনের বিচারে এটাই সর্বাধিক চিকিৎসক মৃত্যূহার!

এভাবে ব্যাবস্থাপনার ঘাটতি ও অপ্রতুল শয্যাসংখ্যা ও HFNC'র অভাবে এই দেশ যদি এই হারে চিকিৎসক হারাতে থাকে তাহলে তার করুণ ফল বা আফটার ইফেক্ট কিন্তু আপনাদেরকেই ভোগ করতে হবে।

সুতরাং যাদের কাছে চিকিৎসকদের জন্য একটি ডেডিকেটেড হাসপাতালের দাবিকে স্বার্থপরতা মনে হয় তাদেরকে ব্যাপারটি নিয়ে দ্বিতীয়বার ভাবার অনুরোধ র'লো।

মনে রাখবেন,
চিকিৎসক বাঁচলে, বাঁচবে রুগি।
চিকিৎসক বাঁচলে, বাঁচবে জাতি।
_______________

ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ। প্রখ্যাত চিকিৎসা লেখক। বিএসএমএমইউতে কর্মরত।
সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ,স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, চিকিৎসক পরিষদ, বিএসএমএমইউ।
Doctor ,t Bangabandhu Sheikh Mujib Medical University
Former Secretary General বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ শাখা ,দিনাজপুর।
Studied MBBS. at Dinajpur Medical College, Dinajpur

________INFORMATION__________________

আপনার মতামত দিন:


ক্লিনিক-হাসপাতাল এর জনপ্রিয়