Ameen Qudir

Published:
2020-03-18 12:11:38 BdST

চিকিৎসক ও সকল স্বাস্থ্যকর্মির জন্য সর্বোচ্চ ঝুঁকিভাতা ঘোষণা করুন


ডাঃ অসিত বর্দ্ধন,কানাডা থেকে   

___________________________

আপদকালিন সময়ে সরকারকে অনেক সিদ্ধান্ত নিতে হয়, সেটা জনগণের স্বার্থ রক্ষার জন্যই। যেহেতু রোগ এখন " কমুইনিটি " তে পাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, তাই কিছু কাজ আগ বাড়িয়ে করে রাখা যেতে পারে যেন সত্যি সেভাবে ছড়ালে বা দৃশ্যমান হলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া যায়। সরকার ও জনগণ উভয়েরই প্রস্তুতি প্রয়োজন।
সরকার সকল স্বাস্থ্যকর্মকর্তার /কর্মচারির চাকুরী আবশ্যক ঘোষণা করতে পারেন
চিকিৎসক ও সকল স্বাস্থ্যকর্মির সর্বোচ্চ ঝুঁকিভাতা ঘোষণা করতে পারেন
সকল বেসরকারি চিকিৎসকদের এই আপদকালিন সময়ে সরকারের তত্ত্বাবধানে নিয়জিত করতে পারেন
সকল সরকারী ও বেসরকারি চিকিৎসকের PPE সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারেন
প্রতি জেলায় সরকারী হাসপাতালের পাশাপাশি বেসকারি চিকিৎসক ও বেসরকারি হাসপাতাল নির্দিষ্ট করা যারা শুধু মাত্র করোনা ভাইরাসের লক্ষণ জনিত রোগীর চিকিৎসা দেবেন।
প্রত্যেক জেলায় /উপজেলায় বর্তমান অক্সিজেন ট্যাঙ্কের সংখ্যা , আয়তন, জানা। এর অর্ধেক ট্যাঙ্ক পুনরায় ভর্তির জন্য রাখা , এবং যেহেতু অক্সিজেন আসে ঢাকা থেকে তাই এগুলো আনা নেওয়ার জন্য বাহনের ব্যবস্থা করা।
যমুনা সেতু ব্যবহার করলে এদের টোল ফ্রি করা যেতে পারে। এছাড়া রাস্তায় ওষুধ সরবরাহকারী গাড়ি গুলোর জন্য সবচেয়ে বাম দিকে একটি লেইন রাখা। ( এম্বুলেন্স, শব বাহী গাড়ি , দমকল, পুলিশ, সিটি কর্পোরেশন এর আবর্জনা পরিষ্কারের গাড়ি এই লেইন ব্যবহার করতে পারবে। এই লেইন আইন ভেঙ্গে অন্য কেউ গাড়ি চালালে তার গাড়ি ও গাড়ির লাইসেন্স বাজেয়াপ্ত করার মত দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধান রাখতে হবে।)। এতে দ্রুত রিফিল করা যাবে।
অক্সিজেনের মূল্য নির্দিষ্ট করা , এই সময়ে কোন কোন বেসরকারি হাসপাতাল মুনাফার জন্য আকাশচুম্বী মূল্য নির্ধারন করতে পারে। একটা উদাহরণ দেই। ফ্যাক্টরিতে অক্সিজেনের দাম ধরুন, ৩০ পয়সা প্রতি লিটার , অক্সিজেন ট্যাঙ্কের ধারণ ক্ষমতা ১০০০ হাজার লিটার। পরিবহন খরচ ৫০০ টাকা। তাহলে প্রতি লিটারে খরচ মোট ৮০ পয়সা। প্রতি মিনিটে যদি ৪ লিটার অক্সিজেন দেওয়া হয় , তবে খরচ ৩.২০ পয়সা প্রতি মিনিট। ঘণ্টায় ২০০ টাকা। যে কোন বেসরকারি ক্লিনিকে অক্সিজেনের চার্জ দেখলেই বোঝা যাবে তারা কেমন মুনাফা কষছেন।
এই হিসাব আসলে সত্যি খরচ ধরে নয়। স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয়ে জানা থাকার কথা অক্সিজেনের মূল্য। পরিবহন খরচ ও ৫০০ টাকা নয়। সুতরাং অক্সিজেনের মূল্য জেলা ভেদে ভিন্ন হতে পারে। সরকার পরিবহন খরচ দিলে রোগীর এই হাঙ্গামা হবে না। বেসরকারি হাসপাতাল মুনাফা নিতে পারবে না।
অক্সিজেন মাস্ক , (নেসাল ক্যানুলা এই সময়ে খুব কাজে আসবে না ), নন-রিব্রিদেবল মাস্ক, সাকশান ক্যাথেটার এর পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। মূল্য নির্ধারন করা।
যেখানে আইসিইউ ভেন্টিলেটর নাই কিন্তু এনেস্থেসিয়া মেশিন আছে, সেখানে সব এনেস্থেসিয়া মেশিন শুধু নির্দিষ্ট হাসপাতালে আনার ব্যবস্থা করা। পর্যাপ্ত PEEP ভাল্ভের ব্যবস্থা করা।
প্রত্যেক হাসপাতালে কতগুলো কর্মক্ষম " পালস অক্সিমিটার" আছে তাঁর হিসাব রাখা। আমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কোন ধরণের পালস অক্সিমিটার আছে আমার জানা নেই। অনেক ক্ষেত্রে ডিস্পসেবল কে বার বার ব্যবহার করা হয়। মনে রাখা দরকার আমরা যদি নিউমোনিয়া চিকিৎসার কথা বলি তাহলে ধরে নিতে হবে যে একজন রোগীর জন্য একটা পালস অক্সিমিটার লাগবে, কারণ রোগী যে কোন সময়ে খারাপ হয়ে যেতে পারে। যে সমস্ত পালস অক্সিমিটার আছে তারা একটানা ২৪ ঘণ্টা চলবে কি না পরীক্ষা করা টা জরুরি। নাহলে হয়ত ৪ ঘণ্টা চলে বিকল হয়ে যাবে , তখন জানাও যাবে না রোগীর কি হচ্ছে।
শ্বাসতন্ত্রে সংক্রমণে যে সমস্ত ওষুধ ব্যবহার হবে ( যেমন সালবিউটামল, ইপ্রাট্রপিয়াম , বিউডসেনাইড ,সহ অন্যান্য ওষুধ ) সেগুলো সরবরাহ নিশ্চিত করা। প্রত্যেক জেলাতেই সকল ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানির প্রতিনিধিদের একটি সংগঠন আছে "ফারিয়া" নামে। এই ক্রান্তিকালে সকল ওষুধ কোম্পানি ফ্রি ওষুধ সরবরাহ করতে পারে। "ফারিয়া" সরবরাহ চেইন ব্যবস্থাপনা দেখতে পারে। সরকার এক্ষেত্রে এখনি উদ্যোগ নিতে পারে ফারমাসিউটিক্যাল মালিকদের সাথে বসে।
হাসপাতাল গুলোতে আইন শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। যদি একসাথে একাধিক রোগীর মৃত্যু হয় , তখন ইতিহাস বলে রোগীর স্বজনেরা সবার আগে চিকিৎসকের উপড়ে চড়াও হন , অথবা হাসপাতালের নির্জীব দরজা , জানাল, কাঁচ , আসবাব ইত্যাদি তাদের নিশানা হয়ে দাঁড়ায়।
হাসপাতালে চিকিৎসক ও অন্যান্য কর্মিদের খাওয়া ও বিশ্রামের সুবিধা থাকতে হবে। চায়না তে যে পরিমাণ ডাক্তার মারা গেছে তা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিৎ।
চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় লজিস্টিক সরবরাহ রক্ষার দায়িত্বে থাকুক প্রশাসন, আর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থাকুক চিকিৎসার দায়িত্বে।
রানা প্লাজার ঘটনা নিশ্চয় সবার মনে আছে। বাংলাদেশ বিপদে পড়লে বাংলাদেশের মানুষ নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যকে উদ্ধারে এগিয়ে আসে। আপনাদের হয়ত মনে আছে, ( কিন্তু আমি ভুলে গেছি) সেই ছেলেটার নাম যে ছোটো একটু সুরঙ্গ দিয়ে অনেক মানুষকে টেনে বের করে এনেছিল। মেন্টাল ট্রমা হয় তাঁর। একদিন ট্রলিতে থাকা অবস্থায় তাকে পাওয়া যায় ঢাকা মেডিকেলের বারান্দায়। মৃত। প্রতিদান বা পুরস্কারের আশা করেনি। মৃত্যুর ভয় করেনি। অনেকগুলো জীবন বাঁচিয়ে দিয়ে, দিয়ে গেছে নিজের জীবন। এবারো এমন ঘটনা ঘটবে। ডেঙ্গুর সময়ে ঘটেছে। চিকিৎসক মারা গেছেন। আমরা সেই ডাক্তারদের মনে রাখিনি।
আসুন এবার আবার রুখে দাঁড়াই, সম্মিলিত ভাবে। যদি করোনা তাণ্ডব ছড়ায় , প্রয়োজন হবে সব সুস্থ মানুষের অংশগ্রহণের। যারা কোয়ারেন্টাইনে আছেন তাদের খাদ্য পৌঁছে দেওয়া, অসুস্থ ব্যক্তিকে সঠিক হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, মৃতের সৎকার, ওষুধ সরবরাহ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা এরকম হাজারটা কাজে লাগবে সেচ্ছেসেবক। হেল্পলাইন , হটলাইন লাগবে প্রতি জেলায় উপজেলায়।
হয়ত কিছুই লাগবে না, তাহলে সেটা হবে পৃথিবীর সেরা সুখ!
যদি লাগে , আসুন আমরা আগে থেকে তৈরি হই!
___________________________

ডাঃ অসিত বর্দ্ধন
এনেস্থেটিস্ট , ল্যাংলি মেমোরিয়াল হাসপাতাল
ভ্যঙ্কুভার , কানাডা

আপনার মতামত দিন:


ক্লিনিক-হাসপাতাল এর জনপ্রিয়