Ameen Qudir

Published:
2020-01-17 02:01:07 BdST

মৃত্যু সনদ লেখা বিলম্বিত করা যায় কি?




ডা. অসিত মজুমদার

সুলেখক। লোকসেবী চিকিৎসক

________________

নির্মম নিষ্ঠুর মৃত্যু যে কখন কাকে এসে ধরে
সে কি কভু তবে মৃত্যুকে রোধিতে পারে!

নিশ্চয়ই একথা ঠিক, তবুও আমাদের আরো সচেতন হবার সময় এসেছে। জন্ম - মৃত্যু - বিয়ে তিন বিধাতা নিয়ে ; পুরনো এই অমোঘ সত্যকে আমরা কেউই অস্বীকার করতে না পারলেও কখনও কখনও প্রচেষ্টা, মোটিভেশন এবং প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি মানুষের ভাগ্য অনেকখানি পাল্টে দেয়।
চিকিৎসক হবার সুবাধে জীবনে কতগুলো মৃত্যু সনদ লিখেছি তার কোন হিসাব আমার মনে নাই। সদ্য বিবাহিত যুবকের হেপাটিক এনকেফালোপ্যাথী, দু'তিন বছর বয়সী শিশুর মায়ের সাত লক্ষ টাকা (২০০০ সালে) ব্যয়ের পরও ব্রেস্ট ক্যান্সারজনিত মৃত্যু, মারাত্মক অ্যাজমাজনিত কারণে চোখের সামনে দেখতে দেখতে মধ্য বয়স্ক নারীর মৃত্যুু, একটা শিশুর আচমকা ভাইরাল এনকেফালোপ্যাথী, বা একিউট ব্রঙ্কিওলাইটিসজনিত মৃত্যুতে মোটেও বিচলিত হইনি। ভাবতাম যে মৃত্যু ঠেকানো যায় না সেখানে এসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা করে কি লাভ! প্রচণ্ড মনোকষ্ট পেলেও মেনে নেয়া ছাড়া আর কোন উপায় ছিল না বলে ভাবতাম তখন।

কিন্তু এখন সময়ের পরিবর্তন হয়েছে, চিকিৎসা ব্যবস্থার অত্যাধুনিক উন্নতি সাধিত হয়েছে, চিকিৎসক ঘাটতি কিঞ্চিৎ হলেও পূরণ হয়েছে, মানুষের ব্যয় করার সাধ্য বেড়েছে, মানসিকতারও আমূল পরিবর্তন হয়েছে। সুতরাং চেষ্টার সবটুকু প্রয়োগ করতে এখন তেমন কোন বাধা প্রায় নেই বললেই চলে। সুতরাং প্রয়োজন সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়া। তাহলেই অনেক মৃত্যুকে হয়ত বিলম্বিত করা যায়।

এটা কোন ইগো নয়, নয় কোন দাম্ভিকতা। বিষয়টা একেবারেই অনুভূতির। সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদপুরের তিনটি মৃত্যু আমাকে ভীষণভাাবে নাড়া দিয়েছে। স্বর্গীয় বাবু সমরেন্দ্র সরকার, স্বর্গীয় বাবু পার্থ সারথী মজুমদার এবং স্বর্গীয় বাবু পঙ্কজ মজুমদার। তিনটি মৃত্যুতেই আমি ভীষণভাবে ব্যথিত। মনে হয়েছে আমাদের কিছু করার ছিল কি??
চিকিৎসক হিসেবে মনে হয় সময় মত সঠিক পদক্ষেপ নিতে পারার ব্যাপারে আরো মনোযোগ হওয়ার সুযোগ আছে। আমাদের সব সময় "DO OR DIE" বা টাইপ - ১ পারসোনালিটি মেনে চলার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন ভালভাবে বেঁচে থাকা। কিছুটা ফ্লেক্সিবল হয়ে যদি আমরা আরো ভালভাবে বেশিদিন বাঁচতে পারি তবে সেটা কি খুব বেশী অন্যায়? আমাকে এটা করতেই হবে এমনটা না হয়ে আমাদের ডেল কার্নেগী জাতীয় লেখকের বই পড়াসহ সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। মনে হতে পারে এই কথাগুলো কেন? আসলে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে সামাজিক কাউন্সেলিংটাও অতি জরুরী।

চিকিৎসা ব্যবস্থাটা নিয়ে এখন আমাদের একটু নড়েচড়ে বসার সময় এসেছে। যার তার কাছে যখন তখন চিকিৎসা পরামর্শ না জিজ্ঞেস করে বা নিজে নিজে ঔষধের নাম বলে দোকান থেকে ঔষধ না কিনে একজন পারিবারিক চিকিৎসককে দেখাই। ওনিই বলে দেবেন কখন কার কাছে যেতে হবে বা কি করতে হবে যিনি হবেন বিএমডিসি রেজিস্টার্ড একজন এমবিবিএস চিকিৎসক । একজন এমবিবিএস চিকিৎসক প্রায় ৭০- ৮০ ভাগ রোগের ডায়াগনোসিস করাসহ চিকিৎসা দিতে পারবেন। এক্ষেত্রে এমবিবিএস ডাক্তার রোগী দেখে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ডায়াগনোসিস করে চিকিৎসা দিবে, কিছু ক্ষেত্রে ডায়াগনোসিস করে বা কখনও কখনও ডায়াগনোসিস ছাড়াই যথাযথ রেফারাল এর ব্যবস্থা করবে।

মৃত্যুর মিছিলে আছে আরও কত চেনা আপনজন। আমার সামনে এসেছে শেষ পর্যন্ত যখন চিকিৎসা বিজ্ঞান নিরুপায়। ভাবলেন অনেককে দেখিয়েছি সেখানে আপনি কোন্ -----???
বিষয়টা আসলে এমন নয়। বিষয়টা হল সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেবার ব্যর্থতা। সেই আসলেন তবে শুরুতেই এলে কি ক্ষতিটা হত শুনি। আমি সবাইকে অনুরোধ করব শেষে না এসে শুরুতেই আমাকে দেখান। প্রযোজ্যক্ষেত্রে আমিই আপনাকে সঠিক জায়গায় রেফার করে দেব। বারবার বলছি সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়াটা এত সোজা নয় এবং কেউ অসুস্থ হলে পুরো পরিবারই মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে যায়। তাছাড়া সিদ্ধান্ত নেবেন এমবিবিএস পারিবারিক ডাক্তারের কাছ থেকে, অন্য মানুষের নিকট নয়।

"সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়" -- এই প্রবাদটি আমরা সবাই জানি। আমরা সময়ে ৫০০ টাকা ব্যয় করতে কুন্ঠাবোধ করি অথচ সেটার জন্য শেষমেষ ৫০০০০০ টাকা খরচ করতেও বাধ্য হতে হয়। "জন্মিলে মরিতে হইবে অমর কে বা কোথা রবে" আমরা এই সত্য জেনেও আমাদের এই অবস্থান থেকে দ্রুত বেরিয়ে আসার সময় হয়েছে। আমরা রোগের শুরুতেই একজন এমবিবিএস চিকিৎসককে দেখাই। প্রয়োজনে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে জিপি সিস্টেমের মাধ্যমে যথাযথ রেফারাল ব্যবস্থা মেনে চললে চিকিৎসা ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব।
একথা সর্বৈব সত্য যে সঠিক রেফারাল ব্যবস্থা মেনে চলার মাধ্যমে আমরা মৃত্যুর সনদ লেখা আসলেই বিলম্বিত করতে পারি।

আর সেজন্যই গড় আয়ু ৫৪ থেকে আজ ৭৪ এ এসে ঠেকল।
সবার জন্য সুস্থতা, দীর্ঘায়ু এবং শান্তিময় জীবন কাম্য।

 

আপনার মতামত দিন:


ক্লিনিক-হাসপাতাল এর জনপ্রিয়