Ameen Qudir

Published:
2019-08-19 00:02:30 BdST

মফস্বলের ডেঙ্গি রোগীদের বড় অংশ ঢাকা থেকে মাইগ্রেটেড নয়; তারা গ্রামে থেকেই আক্রান্ত


 

 

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল

__________________________

ডেংগিতে মৃত্যুর খবর প্রতিদিনই পাচ্ছি। তবে বোধ করি আর সব কিছুর মত এটাও আমাদের সয়ে গেছে। এখন আর গায়ে তেমন লাগছেনা৷ নিউজ ভ্যালুও কমে গেছে। পত্রিকাগুলোর স্বাস্থ্যপাতায় "কুরবানীর মাংস সাবধানে খাবেন", "মাংস খেয়ে কি কি করবেন" বা "কিভাবে ফ্রিজে সংরক্ষন করবেন কুরবানীর মাংস" এ জাতীয় লেখাই প্রাধান্য পাচ্ছে৷ পাবলিক ডিমান্ড।

বাস্তবতা হলো ঢাকার বাইরে ডেংগি ছড়িয়ে পড়েছে৷ প্রায় সব জেলাতেই ডেংগি রোগী ভর্তি আছে৷ অনেক উপজেলা হাসপাতালেও ভর্তি আছে। আমার এক ডাক্তার বন্ধু ফোনে জানালেন লক্ষীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলাতেও পাঁচটি নতুন রোগী সে ডেংগি পজিটিভ পেয়েছে।

এই রোগীদের বড় অংশ ঢাকা থেকে মাইগ্রেটেড নয়। মানে গ্রামে থেকেই আক্রান্ত হয়েছে। "গ্রামে সাধারণত এডিস মশার অস্তিত্ব নেই" এটা একটা ভ্রান্ত ধারণা মাত্র। একটু ইন্টারনেট ঘাঁটলেই দেখবেন ফিলিপাইন ও ভিয়েতনামে গ্রামগুলি কিভাবে আক্রান্ত হয়েছে৷

গ্রামে এডিস না থাকবার কোন কারণও আসলে নেই। এডিসের উপযুক্ত পরিবেশ গ্রামেও আছে৷ গ্রামে এডিস ইজিপ্টির পাশাপাশি সেকেন্ডারি ভেক্টর হিসেবে এডিস এলবোপিক্টাসও আছে। এগুলো এতদিন ইনফেক্টেড ছিলনা। এখন হয়েছে।

এই চক্র থেকে বাংলাদেশ সহজে বেরিয়ে আসতে পারবে বলে মনে হচ্ছেনা। প্রান তো যাচ্ছেই, যারা সুস্থ হচ্ছেন তাদের যে দুর্ভোগ হচ্ছে সেটাও তো কম নয়।

অর্থনীতিবিদরা হিসাব করলে বলতে পারবেন কত শ কোটি টাকার ক্ষতি হয়ে গেল বাংলাদেশে এই ডেংগি আউটব্রেকে। হাসপাতালে ভর্তি,পরীক্ষা নিরীক্ষা, প্রায়ভেটে ডাক্তার ভিজিট, স্যালাইন, ওষুধ সব মিলিয়ে কম টাকার ধাক্কা তো নয়। অনেক বেসরকারি হাসপাতালে দেখেছি পঁচিশ হাজার প্লেইটলেট দেখলেই আইসিইউতে ভর্তি করে নিয়েছে৷ এসব রোগী দেড় দুইলাখ টাকা খরচ করে হাসপাতাল ছেড়েছে৷ তবু খুশি বেঁচে তো গেলাম।

যা বলছিলাম ডেংগি থেকে সহজে মুক্তি পাবেনা বাংলাদেশ। ইতোমধ্যেই জেনে গেছেন যে এডিসের ডিমগুলি কেমন। মাস থেকে বছর অব্দি বেঁচে থাকতে পারে। আধা চা চামচ পানি, মানে জাস্ট ডিমগুলি ডুবে যেতে পারে এরকম পানি পেলেই ডিম ফুটে লার্ভা বেরোয়। স্বচ্ছ পানি বা নোংরা পানি যাই হোক, স্থির পানি ( Stagnant water) হলেই তার কাজ হয়ে যায়। এডাল্ট এডিস একবার ইনফেক্টেড হলে তিন জেনারেশন সে ভাইরাস বহন করে। এগুলো খুবই ভয়ংকর তথ্য৷

আমাদের দেশে এন্টোমলজিস্ট খুব কম। ফেসবুকে, টিভিতে, খবরের কাগজে যারা ডেংগি নিয়ে লিখছে অধিকাংশই আমরা খুব কম জানি এই এডিস মশা নিয়ে৷

একটা জার্নালে দেখলাম ভিয়েতনামের কয়েকটি গ্রামে এডিস মশা নির্মুলে তারা বায়লজিক্যাল পদ্ধতি ব্যবহার করেছেন। এবং ভাল ফল পেয়েছেন। এখানে বিশেষ ধরণের কিছু ব্যক্টিরিয়া ব্যাবহার করা হয়েছে। আমাদের দেশে কি এসবের কোন চেষ্টা আছে?
বাংলাদেশে মশা নিয়ে গবেষণা করেছেন আমার জানামতে এরকম বিশেষজ্ঞ একজনই আছেন। তিনি জাহাংগীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রানী বিভাগের অধ্যাপক। তাঁকে কি কাজে লাগানো হচ্ছে?

প্রচলিত কেমিক্যাল পারমিথ্রিন কিংবা ম্যালাথিওনে এডিস মশা মরেনা৷ ইতোমধ্যে আমি কথাগুলো গণমাধ্যমেও বলেছি। গায়ের জোরে তর্ক করেছেন দায়িত্বশীলেরা৷ কিন্তু কাজের কাজ কিছু হচ্ছে কি? সেই ফগার মেশিনই চলছে। আর নতুন যোগ হয়েছে কিছু স্টান্টবাজি। দফায় দফায় ডাক্তারদের নোটিশ, এটা করা যাবেনা ওটা করা যাবেনা, বিভিন্ন হাসপাতাল পরিদর্শন করে ডাক্তার নাই, চিকিৎসা ঠিকভাবে পাচ্ছেনা এসব বলে জনপ্রতিনিধিরা তাদের পুরনো তরিকামত পাবলিকের সিম্প্যথি নিচ্ছে।

ডেংগি আমাদের সহসা ছেড়ে যাচ্ছেনা৷ সামনের বছরগুলিতে ডেংগি আরো সংহারী ভূমিকা নেবে। এবছর যারা আক্রান্ত হয়েছে সামনের বছর তারা আবার আক্রান্ত হতে পারেন। হলে ভয়াবহ বিপর্যয় হবে৷ মৃত্যুহার আরো বাড়বে।

এই অবস্থায় আমাদের লেপ্রোসি হাসপাতাল, কলেরা হাস্পাতালের মত আলাদা ডেংগি হাসপাতাল লাগবে৷ গবেষণা কেন্দ্র লাগবে৷ এন্টমলজিস্ট লাগবে। নতুন কেমিক্যাল লাগবে৷ বা বায়োলজিক্যাল মেথড লাগবে৷

দ্রুত লাগবে৷ কমিটি করলাম, একুশ জন প্রতিনিধিকে সাতদেশ ঘুরিয়ে আনলাম অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য এসব করলে হবেনা৷ তবে মন বলছে এসবই হবে৷

_______________________________

ডা. গুলজার হোসেন উজ্জ্বল । রক্তরোগ বিশেষজ্ঞ। প্রথিতযশ সঙ্গীতশিল্পী।
কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ
৭ম ব্যাচ

আপনার মতামত দিন:


ক্লিনিক-হাসপাতাল এর জনপ্রিয়