Ameen Qudir

Published:
2019-05-02 11:09:32 BdST

একজন তরুণ ডাক্তারের কান্না কেউ শোনে না


 

 

ডা.মারুফ রায়হান খান
________________________

ইন্টার্নশিপ শেষ করার সাথে এমবিবিএস ডাক্তারটি যখন বেকার হয়ে যায় কেউ শোনে না৷ এমবিবিএস পাশ করেও বাসা থেকে টাকা নেয়ার বেদনা, শুধু একটা বিশ-পঁচিশ হাজার টাকার চাকরির জন্যে পাগলের মতো এ দ্বারে ও দ্বারে ঘোরার সময়গুলোতে কে পাশে থাকে?

ক্লিনিকে "খ্যাপ" নামক ডিউটিতে যখন স্টোর রুমে ডাক্তারকে থাকতে দেয়, মালিকপক্ষের নানা দুর্ব্যবহার, অযাচিত অনৈতিক চাপে যখন মনে মনে আর কখনও খ্যাপ মারতে আসব না বলা ডাক্তারটি টানা ২৪ ঘণ্টা ডিউটি শেষে ২০০০ টাকা, ১ ঘণ্টায় ৮৩.৩৩ টাকা হাতে পায় তখন তার দীর্ঘশ্বাস কেউ শোনে না।

সন্তান বড় হয়েছে এবার সংসার তো একটু দেখবে। অন্তত বাবা-মা-ভাই-বোন-আত্নীয়দের তো ঈদে ভালো কিছু উপহার দেবে। যে তরুণ ডাক্তারটি বড় পরিবার-আত্নীয়দের ঈদের উপহার দিয়ে খুশি করতে গিয়ে টাকা ধার করে ফেলে তার বুকের পাথরের ওজনটা কেউ মাপে না।

পাশ করে বেরুতে না বেরুতেই শুরু হয়ে যায়, আপনার সন্তান এখন কোন বিষয়ের বিশেষজ্ঞ, কীসের ডাক্তার? ও সিম্পল এমবিবিএস? ৬ বছর পড়াশোনা করার পর আবার ৪/৫ বছরের কোর্সে ঢোকার জন্যে মাসের পর মাস প্রস্তুতি। কোচিং-এ ভর্তি, আবার বই কেনা...নিজের ইন্টার্নশিপে জমানো ২১০০০ টাকা যখন কোচিং-এ দিতে হলো সেদিন তার চোখের জল লুকানোটা কারও চোখে পড়েনি।

বিসিএস না পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশান? পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশান না বিসিএস? সরকারি ডাক্তার না হলে সমাজে আবার দাম নেই। বেসরকারিতে মালিকপক্ষ দু আনার সম্মান দিতে চায় না। আবার অসম্ভব রকমের কাঠখড় পুড়িয়ে সরকারি চাকরি নামক সোনার হরিণের দেখা পাওয়ার পর গ্রামে পাতি নেতাদের উপদ্রব, কিছু থেকে কিছু হলেই জনগণের মারমুখী আচরণ--তার এ জ্বালা নিভে কীভাবে তা কেউ জানতে চায় না।

একবার এফসিপিএস দিতে লাগে ১১০০০ টাকা, রেসিডেন্সি/ডিপ্লোমা দিতে ৫০০০ টাকা। এম আর সিপির জন্যে ৭০০০০-৮০০০০ টাকা। একজন তরুণ চিকিৎসকের জন্যে শুধু একটা পরীক্ষার জন্যে ১১০০০ টাকা দিয়ে ফর্ম ফিল আপ করার বেদনা কে বোঝে? তাও সে পরীক্ষা ১০০ জন দিলে পাশ করে ২/৩/৪ জন। তাও সে পরীক্ষায় কোয়ালিফাই করতে অর্থ ইনকামের সব চিন্তা মাটিচাপা দিয়ে একটানা চেয়ার টেবিলে বসে থাকতে হয় তাকে। এভাবে কতোবার পরীক্ষা দিতে থাকার পর যে খুব সৌভাগ্যবান হলে একটা ডিগ্রি করার সুযোগ ঘটে তা কে বোঝে? শুধু চান্স পেলেই কি হলো? সেখানে ফেইল করে/কোর্স আউট হয়ে কতো মানুষের জীবনটা নির্জীব হয়ে যায় তা কে বোঝে?

অনারারি ডিউটি নামে বর্বরপ্রথায় বছরের পর বছর বিনা বেতনে খেটে যাওয়া তরুণ চিকিৎসকটিকে কেউ জিজ্ঞেস করে না তোমার সংসার কীভাবে চলে। তুমি কীভাবে খাও? কীভাবে পরো? এতোকিছু সামলে আবার কীভাবেই বা অবিশ্বাস্য কঠিন পরীক্ষায় অবতীর্ণ হও? কেউ জিজ্ঞেস করে না তোমার পরিবারকে তুমি দিনে কয় ঘণ্টা সময় দাও? তুমি যখন বের হও তখনও তোমার সন্তান ঘুমে, তুমি ফেরার সময়েও সে ঘুমে? তোমার সন্তানকে পিতৃ/মাতৃস্নেহ থেকে যে বঞ্চিত রাখছো তোমার কান্না পায় না? তুমি দিনের পর দিন ৩-৪ ঘণ্টা করে ঘুমাও তোমার অসুখ করে না?

তরুণ ডাক্তারগুলো কেন হয় ডিপ্রেশান না হয় এংজাইটি না হয় স্ট্রেস ডিজ অর্ডারের রোগী হয়ে যায় কেউ গবেষণা করে না কেন?

একজন তরুণ ডাক্তার তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় যৌবনকালটা কী করে কাটিয়ে দেয় তা কেউ দেখেও দেখে না কেন?
_____________________________
ডা.মারুফ রায়হান খান , চিকিৎসক , প্রভাষক ও সাবেক শিক্ষার্থী এনাম মেডিকেল কলেজ ।

আপনার মতামত দিন:


ক্লিনিক-হাসপাতাল এর জনপ্রিয়