Dr.Liakat Ali

Published:
2021-10-12 14:10:36 BdST

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ, বদলি, তোলপাড়,দুপক্ষের বক্তব্য


 

ডেস্ক
______________

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কর্মরত এক নারী চিকিৎসককে যৌন হয়রানির অভিযোগে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কর্মরত এক মেডিকেল অফিসারকে বদলি করা হয়েছে। একইসঙ্গে অভিযোগ আমলে নিয়ে ঘটনা তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে অধিদপ্তর। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত বলেছেন, ওই নারী চিকিৎসকের অবৈধ কাজ সম্পাদনের অন্যায় আবদার পূরণ করতে না পারায় তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে।
বিচারাধীন বিষয় বিধায় নাম গোপন রাখা হল।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. এ বি এম খুরশীদ আলম শুক্রবার (৮ অক্টোবর) গণমাধ্যমকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

তিনি বলেন, অধিদপ্তরে পরিকল্পনা ও গবেষণা বিভাগের এক মেডিকেল অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তাঁদের কাছে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে তদন্ত চলছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে তাকে বরগুনা জেলার একটি এলাকায় বদলি করা হয়েছে।

হয়রানির প্রতিকার চেয়ে সম্প্রতি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের করা আবেদনে ওই নারী চিকিৎসক উল্লেখ করেন, সম্প্রতি কর্মস্থলে অনুপস্থিতিজনিত কারণে ব্যক্তিগত শুনানি প্রদানের জন্য চলতি বছরের ২৯ আগস্ট তাকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ডাকা হয়। এরপর তিনি একজন সিনিয়র চিকিৎসকের মাধ্যমে অধিদপ্তরের অভিযুক্ত মেডিকেল অফিসার সম্পর্কে জানতে পারেন যে তিনি এসব বিষয়ে ভালো জানেন। এ বিষয়ে তার কাছ থেকে পরামর্শ নেওয়া যায়। এর পর ব্যক্তিগত শুনানির কার্যক্রম সম্পর্কে জানার ব্যাপারে তার সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন তিনি। অভিযুক্ত ডাক্তার তাকে ২৪ আগস্ট সশরীরে তার অফিসে দেখা করতে বলেন। এ সময় তিনি ভয় দেখিয়ে বলেন যে, সামান্য দেরি করলে ওই নারীর বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

অভিযোগপত্রে তিনি জানান, মেডিকেল অফিসারের কথা মতো নারী চিকিৎসক ওইদিন সাড়ে ৪টার দিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে তার সঙ্গে দেখা করতে যান। এ সময় তিনি ব্যক্তিগত শুনানির ব্যাপারে নানা রকম ভয়ভীতি প্রদর্শন করতে থাকেন। মেডিকেল অফিসার ওই নারী চিকিৎসককে ঘায়েল করার জন্য নানা কৌশল অবলম্বন করেন। তাকে মানসিকভাবে হেনস্থা করার চেষ্টা করেন। এ ব্যাপারে একমাত্র তিনিই সাহায্য করতে পারবেন জানিয়ে মেডিকেল অফিসার বলেন, চাকরি বাঁচাতে চাইলে তিনি যা যেভাবে বলবেন সেভাবেই চলতে হবে। তার কথা না শুনলে ভুক্তভোগীর বড় বিপদ হবে।

অধিদপ্তরে নিজের সুসংহত অবস্থানের দাবি করে তিনি বলেন, ‘মহাপরিচালকের সঙ্গেও তার সুসম্পর্ক রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঁচজন টপ অফিসারের মধ্যে উনি (মেডিকেল অফিসার) একজন।’

অভিযোগপত্রে ওই নারী আরও উল্লেখ করেন, নানা কাজে ব্যস্ততা দেখান মেডিকেল অফিসার। কাজ শেষে তাকে সময় দেবেন বা সাহায্য করবেন বলে ওইদিন সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত তার অফিসে বসিয়ে রাখেন। ৭টার পর কোনো রকম সাহায্য বা দিকনির্দেশনা প্রদান ছাড়াই ওই নারীকে পরদিন ২৫ আগস্ট সকাল ৯টার আগে অফিসে দেখা করতে বলেন। এ সময় সান্ত্বনা দেয়ার ছলে মেডিকেল অফিসার তার পিঠে ও ঘাড়ে হাত রাখেন। এতে অস্বস্তিবোধ করেন নারী চিকিৎসক। দ্রুত অফিস থেকে বের হয়ে যান তিনি। এ সময় ডা. মেডিকেল অফিসারও তার সঙ্গে সঙ্গেই অফিস থেকে বের হন।

ভুক্তভোগী আরও জানান, পরদিন মেডিকেল অফিসারের কথামতো অফিস শুরুর আগে উপস্থিত না হয়ে ৯টা ৩৫ মিনিটের দিকে তার অফিসে যান। এ সময় অফিসে মেডিকেল অফিসার ছাড়া কেউ ছিল না। ভুক্তভোগী নারী চিকিৎসক কেন দেরি করে এসেছেন এ জন্য বিরক্তি ভাব প্রকাশ করেন মেডিকেল অফিসার। এ সময় নানা ধরনের অপমানজনক কথা বলতে থাকেন। দেরি করে আসায় এখন সাহায্য করতে পারবেন না বলে জানান। বিপদে পড়তে না চাইলে আবার বিকেলে দেখা করতে বলেন মেডিকেল অফিসার। আতঙ্কিত ওই নারী চিকিৎসক তার কথা অনুসারে ৪টার দিকে দেখা করতে অফিসে যান। এ সময় অফিসে সকলেই ছিলেন। কিন্তু তিনি পাঁচটা পর্যন্ত বসিয়ে রাখেন। পাঁচটার পর ধীরে ধীরে অফিসের সবাই একে একে চলে যেতে শুরু করেন।

‘আমি উনার ডেস্কে উনার সামনের চেয়ারে বসেছিলাম। উনি আমাকে উঠে এসে তার পাশের চেয়ারে বসতে বলেন। আমি এতে অপারগতা প্রকাশ করলে উনি তার চেয়ার থেকে উঠে আমার চেয়ারের পেছনে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেন এবং শরীরের স্পর্শকাতর অংশে হাত দেয়ার চেষ্টা করেন। এক পর্যায়ে উনি আমার কাপড়ের ভেতর দিয়েও হাত দেয়ার চেষ্টা করেন। আমি ছিটকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করলে উনি আমার হাত চেপে ধরেন। তার ওয়ার্কিং ডেস্কটি এমনভাবে অবস্থিত যে ঘরে ঢুকে ডেস্কের সামনে না গেলে সেখানে কেউ অবস্থান করছে কিনা বোঝা সম্ভব হয় না। লোকজন ডাকবো বললে তিনি আমাকে বলেন, তার রুম এভাবেই বানানো যেন বাইরে থেকে কেউ দেখতে না পায়। তাছাড়া এখন অফিসে কেউ নেই, এইটাও আমাকে বলেন। অফিসের এই অংশে দরজা খোলা থাকলেও বাইরে থেকে দেখা যায় না। অন্য কেউ আছে কি না বুঝতে পারছিলাম না বলে তার কথায় আরও ভয় পেয়ে চলে যেতে চাইলে তিনি শক্ত করে আমার হাত চেপে ধরে বাধা দেন। বলেন, তার জন্য এইটুকু স্যাক্রিফাইস না করলে তিনি তাকে কেন সাহায্য করবেন? একই সঙ্গে নানা ধরনের চরম অবমাননাকর ও অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করেন মেডিকেল অফিসার’, উল্লেখ করা হয় অভিযোগপত্রে।

এক পর্যায়ে ওই নারী এক প্রকার জোর করে হাত ছুটিয়ে তার রুম থেকে বের হয়ে যান। এ সময় অত্যন্ত আতঙ্কিত অবস্থায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ত্যাগ করেন বলে নারী চিকিৎসক অভিযোগে উল্লেখ করেন। পরবর্তীতে মেডিকেল অফিসার ফোন দিলে আর কথা বলেননি ওই নারী।

অভিযোগ আমলে নিয়ে সরকারি চাকরিবিধি মোতাবেক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান হয়রানির শিকার ওই চিকিৎসক। একই সঙ্গে নিজের যথাযথ নিরাপত্তা প্রদান ও গোপনীয়তা রক্ষার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানান তিনি।

যা বললেন অভিযুক্ত মেডিকেল অফিসার

তবে নিজের ওপর আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত মেডিকেল অফিসার। তিনি বলেন, ওই নারী চিকিৎসকের অবৈধ কাজ সম্পাদনের অন্যায় আবদার পূরণ করতে না পারায় তাকে পরিকল্পিতভাবে ফাঁসানো হয়েছে।

৩৫তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারে নিয়োগ পাওয়া এ চিকিৎসক বলেন, ‘এটি মোটেও সত্য না। শতভাগই মিথ্যা অভিযোগ। তিনি একটি অবৈধ কাজের জন্য এসেছিলেন। আমি তাঁকে সাহায্য করিনি। এ কারণে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে অভিযোগটি করেছেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে কাজ করতাম। কাজ করতে গিয়ে সব সময় সবার মন জয় করা যায় না। এতে হয় তো অনেকের মন খারাপ হয়। অনেকে ক্ষুব্ধ হন।’

 

 

আপনার মতামত দিন:


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়