Ameen Qudir

Published:
2017-03-06 14:56:25 BdST

আমরা ডাক্তার, "মাল" নই



 

মুশতারী মমতাজ মিমি
____________________________

"মাল" কথন ।
 জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজের এক মহিলা ইন্টার্ণ চিকিৎসককে রোগীর অ্যাটেনডেন্ট "মাল" বলে অপমান করলো।

মেয়েটির সহকর্মীরা সেটার প্রতিবাদ করলো বলে তাদের মধ্যে চারজনকে ছয়মাসের জন্য বহিষ্কার করা হলো। বড় বড় নারী সংগঠনের নেত্রীরা কোথায় আপনারা? নারীবাদী সুশীল ব্যক্তিরাই বা কোন কথা বলছেন না কেন? ইভটিজিং নিয়ে এতো আন্দোলন,এতো আইন,এতো সচেতনতা কিন্তু ইভটিজিংয়ের শিকার এই ডাক্তার মেয়েটার জন্য কারো গলায় প্রতিবাদ উঠলো না কেন?নাকি ডাক্তার মেয়েরা নারীর আওতায় পড়েনা ?

 

ধরুন এই একই ঘটনা যদি ভার্সিটি পড়ুয়া কোন ছাত্রীর সাথে ঘটতো তাহলে তার সহপাঠী ছেলেরা কি হাত পা গুটিয়ে বসে থাকতো? ইভটিজারের শরীরের কয়টা হাড়ের জয়েন্ট ঠিক রাখতো তারা ? আপনার চোখের সামনে আপনার বোন কিংবা মেয়েকে কেউ 'মাল', I repeat 'মাল' বললে আপনি কি তাকে ছেড়ে দিতেন? একজন পারভার্ট ইভটিজার যে কিনা হাসপাতালে নিজের অসুস্থ বাবাকে ভর্তি রেখে কর্তব্যরত ডাক্তারকে 'মাল' বলার মতো মনমানসিকতা রাখে তাকে কান ধরে উঠবোস করানো কিংবা দু একটা উত্তম মধ্যম দিয়ে কি অন্যায়টা করেছিল ওই চারজন চিকিৎসক,যেজন্য তাদেরকে বহিষ্কার করা হলো?


ধরুন না হয় বহিস্কারটাও মেনে নেয়া গেলো কিন্তু যে পারভার্টটা ইভটিজিং করলো স্বাস্থ্যমন্ত্রী তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নিলেন না কেন? নাকি ইভটিজিং কোন সামাজিক অপরাধের মধ্যে পড়ে না?

পত্রিকাতে আসছে ডাক্তারকে আপা বলায় নাকি মারধোর করা হয়েছে।আরে আমরা যারা লেডি মেডিকেল স্টুডেন্ট কিংবা ডাক্তার তাদেরকে বেশিরভাগ রোগী ও রোগীর স্বজনরা খালা,আন্টি,সিস্টার এসব বলে ডাকে।আপা বলা তো দূরের কথা।আপা বলে ডাকলে আমরা খুশিতে গদগদ হই। আপা বললে যদি চিকিৎসকরা রোগী আর অ্যাটেন্ডেন্টদের মারধোর করতো তাহলে প্রতিদিন শতশত লোক ডাক্তারের মার খেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হতো। কেননা আমাদের আপা কিংবা ম্যাডাম লোকজন খুব কমই ডাকে..একজন ইভটিজারের টিজিং ঢাকতে এতো সেলুকাস!!

 

প্রতিদিনই আমদের কোন না কোন ডাক্তার মার খায়,অপমানিত হয়।এমনকি দু-একজন মারাও গেছেন। কই তখন তো কেউ কিছু বলেনি! তখন সাংবাদিকরা কোথায় ছিলেন? কোথায় ছিলো মন্ত্রনালয়ের হস্তক্ষেপ? একজন ইভটিভজারকে কান ধরে উঠবস করানোকে অপরাধ ধরে নিয়ে যদি তদন্ত কমিটি গঠন করা যায় ,সংশ্লিষ্টদেরকে ছয়মাসের জন্য বহিস্কার করা যায় তবে ডাক্তাররা মার খেলে কিছুই করা যায় না? ডাক্তারদের ব্যাপার আসলেই কেবল আইন শিথিল হয়ে যায়...তাইতো?


আমদের ডাক্তারদের এই অবস্থার জন্য আমরা নিজেরাই দায়ী।গ্রে, গাইটন, ডেভিডসনের মতো বড় বড় বড় বইয়ে মুখ ডুবিয়ে থাকতে থাকতে আমরা ব্রয়লার মুরগীর হয়ে গেছি।আমাদের মেরুদন্ডের কিছুই অবশিষ্ট নেই।ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্সি বলে যে একটা শব্দ আছে আমি বাজি ধরে বলতে পারি আমাদের বেশিরভাগ ডাক্তারই সেটা জানেন না। সেখানে তাদের অবস্থান কোথায় সেটা জানা তো আরো দূরের কথা। আমরা শুধু জানি রোগ নির্ণয় আর রোগীর চিকিৎসা।আর কিছু নিয়েই আমরা মাথা ঘামাই না।


দেশের সমস্ত ক্যাডাররা যেখানে নিজ নিজ কর্মস্থানে পদবল আর পদমর্যাদা নিয়ে সসম্মানে কাজ করছে আমরা সেখানে মার খাওয়ার ভয়ে শিটিয়ে থাকি।আমাদের হাতে তো কোন প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই-ই,উল্টো আমদের বিরুদ্ধে মামলা করার জন্যই আইন করে দেয়া হয়।


দেশের কোন সেক্টরে প্রথম শ্রেণীর মহিলা কর্মকর্তাকে খালা কিংবা সিস্টার বলা হয়? আমাদের ডাক্তারদের বলা হয়।কারণ আমরা এতোদিন ধরে সেটা শুনে এসেছি।খালা কিংবা সিস্টার বলার সাথেই কানের পিছে দুইটা দেয়া শুরু করতাম যদি তবে ম্যাডাম ম্যাডম বলে ঠিকই মুখে ফেনা তুলতো।

যমুনা টিভিতে দুদিন আগের সাক্ষাতকারে বহিষ্কৃত কুতুবউদ্দিন ভাইয়াকে এক পর্যায়ে উপস্থাপক বলেছে 'আপনি ভুলে যাবেন না জনগনের ট্যাক্সের একটা বড় অংশের টাকায় আপনারা ডাক্তারি পড়েন।'

এটা কেন ধরনের কথা? জনগনের ট্যাক্সের টাকায় কোন সরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পড়ে না?মেডিকেল ছাড়া অন্যান্য সরকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্টুডেন্টরা নিজের টাকায় পড়ে বলে তো শুনি নি!
অশিক্ষিত ও নির্বোধের মতো স্বাস্থ্য খাতে সবথেকে বেশি ব্যয় হয় বলে ডাক্তারদের দুষলে হবে? সরকার দেশের সমস্ত সরকারী মেডিকেল এবং জেলা,উপজেলা এমনকি ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত রোগীদেরকে বিনামূল্যে অষুধ দেয়,সরকারী হাসপাতালের বেড দেয়,ভর্তিকৃত রোগীদেরকে তিনবেলার খাবার দেয়। এইসব করতেই কিন্তু স্বাস্থ্যখাতের সবথেকে বড় অংশ ব্যয় হয়। রোগীর পিছনে যে টাকাগুলো খরচ হয় সেগুলোর ভাগ কি ডাক্তারদের কাঁধে দেবেন নাকি?

 

আর এমবিবিএস পাশের পেছনের খরচের কথা যদি বলেন তবে বলবো আমাদের পেছনেই খরচটা সবথেকে কম হয়।আমরা শিখি সরকারী হাসপাতালের রোগী থেকে।এবং এখানে রোগী কিংবা সরকার আমাদের টাকা দেয় না।আমাদের শিক্ষা পারপাসে কোন যন্ত্রপাতিও লাগে না। সরকার জনগণ মানে রোগীদের রোগ নির্ণয়ে যেসব মেশিন দেন ওসব থেকেই আমরা শিখে নেই।আঙ্গুল তুলে কথা বলার সুযোগ একদমই নেই।

জনগনের সাথে সবথেকে বেশি মুখোমুখি হতে হয় ডাক্তারদেরকে।রোগীর কিংবা রোগীর সাথে যারা আসেন তারা সবাই রোগের জন্য চিন্তাগ্রস্ত থাকেন।তাদের মানসিক অবস্থা ভালো থাকেনা।কাজেই তারা অল্পতেই রেগে গিয়ে ডাক্তারদের গায়ে অযথাই হাত তুলতে পারেন।কে না জানে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় মানুষ ভালো ব্যার করতে পারে না!রোগী কিংবা তার লোকও পারে না অনেকসময়।যার দরুণ ডাক্তাররা একের পর এক মারধরের স্বীকার হতেই থাকেন। এই সত্য এবং সহজ কথাটা কেউ মাথায় আনেন না।বরং ডাক্তারের পেছনে উঠেপড়ে লাগেন।


আমদের নিরাপত্তা দরকার।প্রচুর নিরাপত্তা দরকার।ওয়ার্ডের সামনে,চেম্বার কিংবা ডিউটি রুমের সামনে অস্ত্রধারী মেডিকেল পুলিশ দরকার। চাইলেই যে কেউ যেন আমদের কলার ধরে হুমকি দিতে না পারে,আমাদের গায়ে হাত তুলতে না পারে তার নিশ্চয়তা দরকার আমদের।মেয়ে ডাক্তাররা যেন পারভার্ট, ইভটিজারদের হাত থেকে নিরাপদ থাকে তার নিশ্চয়তা দরকার।

আমরা ডাক্তার, "মাল" নই।
আমাদেরকে কর্তব্যস্থলে নিরাপত্তা দিন,সম্মান করুন,চিকিৎসা নিন।
___________________________

মুশতারী মমতাজ মিমি
। Studied Bachelor of Medicine and Bachelor of Surgery(MBBS) at Rangpur Medical College

আপনার মতামত দিন:


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়