SAHA ANTAR

Published:
2020-12-22 20:25:21 BdST

ক্যাডেট জীবনের পানিশমেন্ট


 
মোশতাক আহমদ  
কবি ও চিকিৎসক
_______________________

আমাদের সময়ের খাকি চত্বরে জুনিয়ররা প্রায়ই সিনিয়রদের কাছ থেকে শাস্তি পেত, ফ্রি টাইমে ছাত্রাবাসের ভেতরে এবং বাইরেও দেখা যেত জুনিয়র অপরাধীকে শাস্তি দেয়ার সময় দাঁড়িয়ে থেকে তা নিশ্চিত করছেন সিনিয়র বিচারক। আমি তেমন একটা শাস্তি পাইনি বড় ভাইদের কাছ থেকে, তবে লেখালিখির সূত্রে অর্জিত হয়েছিল দুটো স্মরণীয় পুরস্কার (তিরস্কার)! আজ মনে হয়, দুটো অপরাধই আসলে বড় মাপের ছিল। প্রথম অপরাধটা করেছিলাম দু’বছরের সিনিয়র সালাহউদ্দিন ফারুক (চঞ্চল) ভাইয়ের সাথে যার ছোট ভাই আমার ব্যাচমেট এবং আজীবনের বন্ধু জিয়াউদ্দিন ফারুক (চপল) ; দ্বিতীয় অপরাধটা করেছিলাম চঞ্চল ভাইদেরই ব্যাচমেট নজরুল ভাইয়ের সাথে। দুজনেই ছিলেন আমাদের সোহরাওয়ার্দি হাউসের জুনিয়র হাউস প্রিফেক্ট; ওঁরা যখন একাদশ শ্রেণীতে ফিরে এলেন, আমরা তখন নবম শ্রেণী ।
ক্রাইম নাম্বার ওয়ান
চঞ্চল ভাইকে তাঁর নাইন-টেনের ক্যাডেট জীবনে যেমন দেখেছি তাতে তিনি আমাদের সাথে যথেষ্ট বন্ধুসুলভ ছিলেন এবং নিয়মকানুনের প্রতি অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল বলে মনে হয়নি, এবং এই প্রজাতির ক্যাডেটরা সাধারণত প্রিফেক্ট হন না। যারা শুরু থেকেই আইনের শাসনে বিশ্বাসী এবং সেই সূত্রে কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষকদের আস্থাভাজন হয়ে থাকেন তারাই প্রিফেক্ট হয়ে আইনের শাসন নিশ্চিত করে থাকেন । নেতা হিসেবে চঞ্চল ভাইয়ের সাফল্যের কথা অস্বীকার না করেও বলবো, সম্ভবত তিনি নেতৃত্বের শূন্যতার কারণে প্রিফেক্ট হলেন। নেতা হয়েই তাঁর ভাব গেল পালটে এবং বিশেষ করে আমাদের ব্যাচের উপর খড়গহস্ত হলেন, ডিসিপ্লিনের ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দিতেন না- বকাঝকা করতেন বা প্রচলিত নানাবিধ শাস্তি দিতেন। সেই হাসিমুখের অমায়িক চঞ্চল ভাই আর থাকলেন না। মনে মনে এক ভয়াবহ প্ল্যান করলাম। ঈদের ছুটিতে বাসায় গিয়ে বন্ধু চপলের জন্যে একটা অভিনব ঈদ কার্ড বানালাম দিস্তার কাগজের এক পৃষ্ঠায় । আমাদের বাসা কাছাকাছি ছিল ( বাসাবো থেকে খিলগাঁও), তবুও কার্ডটা পোস্ট করেছিলাম। একটা ছড়া লিখেছিলাম – ‘ঈদের দিনে সে বেরুলে’ , সাথে একটা কার্টুন। ছড়াটা শুরু হয়েছিল এভাবে –
মুখটি তাহার Litter Box
জিহ্বাটি তাঁর নোংরা Shocks
ভিতরে আরও ছিল,
এক আধুলির দুইটি পিঠ
তাই দেখে যে হলাম ফিট!
ছড়ায় কারো নাম ছিল না, একজন অনাহুত ব্যক্তির কৌতুককর বর্ণনা দিয়ে শেষে বলা হয়েছিল,
ঈদের দিনে দেখলে তারে
পিটিয়ে দিও বেদম হারে!
উদ্দেশ্য ছিল, চপল কার্ডটা পেলে নিশ্চয়ই চঞ্চল ভাইকে দেখাবে, আর উনি দেখে শুধু ফুঁসবেন, সইতেও পারবেন না আবার কিছু বলতেও পারবেন না কারণ ওই ছড়ায় তো কারো নাম বলা হয়নি, তবে কিছু সূত্র হয়তো রাখা হয়েছিল যাতে ছড়াটা পড়ে বা কার্টুনটা দেখেই উস্কে উঠেছিলেন!
ছুটি শেষে ফেরার পর এই অপকর্মের জন্য আমাকে একদিন দুপুরের খাবারের পর থেকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল, যথাক্রমে সিঁড়ির ওপর ডিগবাজি দিতে দিতে দোতলা থেকে একতলায় নামা, সেই ‘লিটার বক্সে’ (অনেকে সেখানে থুতু-টুতুও ফেলতো) দাঁড়িয়ে থাকা ইত্যাদি। আমি কিছুতেই স্বীকার করিনি যে আমি তাকে উদ্দেশ্য করে ছড়াটা লিখেছিলাম, বারবার বলছিলাম এটা আমি চপলকে পাঠিয়েছিলাম স্রেফ মজা করার জন্য। এক সময় ওনার ফাইভ-সিটেড রুমে নিয়ে গেলেন, বারবার ‘Confess, confess’ বলছিলেন এবং শেষে বললেন confess না করলে slap করবেন! চড় মারলে উনিই উলটো অপরাধী হয়ে যাবেন কিন্তু উনি confident ছিলেন যে আমাকে এই মামলায় যত বড় শাস্তিই দেয়া হোক না কেন, আমি এ নিয়ে কোনো উচ্চবাচ্চ করবো না। এই ছিল মাইন্ড গেম! রুমে সে সময় রিজু ভাই নামে আমাদের আরেক প্রিয় সিনিয়র ভাইও ছিলেন, লিখি বলে আমাকে পছন্দও করতেন কারণ তিনিও লিখতেন। কিন্তু এই মামলায় উনি হস্তক্ষেপ না করে বসে বসে গভীর মনোযোগে নিজের পড়াশুনা করছিলেন।
ক্রাইম নাম্বার টু
দ্বিতীয় অপরাধ করেছিলাম একটা রম্য রচনা লিখে; শিরোনাম মনে নাই, তবে সেটা ছিল ‘একটি লুঙ্গির আত্মকাহিনি’ । তখন সম্ভবত ক্লাশ টেনে উঠে গেছি। নজরুল ভাই তখন এসিস্টেন্ট হাউস লিডার। আমাদের লুঙ্গি ব্যাবহার করা নিষেধ ছিল; লুঙ্গিতে আমি তখন স্বচ্ছন্দবোধও করতাম না। কিন্তু সিনিয়র হচ্ছি, সিনিয়র ভাইরা লুঙ্গি ব্যাবহার করেন, তাই অনেকটা জাতে ওঠার জন্য একটা বাটিকের লুঙ্গি নিয়ে এলাম। নজরুল ভাই ইনসপেকশনে এসে সেটা seize করে নিয়ে গেলেন। তখন আন্তঃছাত্রাবাস দেয়ালিকার জন্য লেখা সংগ্রহের কাজ চলছে। আমি কবিতার পাশাপাশি একটা রম্য রচনাও লিখলাম যেখানে মাধব নামের এক লুঙ্গি চোরের আলমারিতে একটা চুরি হয়ে যাওয়া লুঙ্গি তাঁর জীবনকাহিনি বলছে! দুর্ঘটনাক্রমে নজরুল ভাইয়ের ডাকনাম ছিল ‘মধু’; আমার দৃঢ় বিশ্বাস (!!) ছিল ‘মধু’ আর ‘মাধব’এর মধ্যে কোনও সম্পর্ক নাই, ‘দৈবাৎ ঘটনাচক্রের সংঘটন!’ কিন্তু কে শোনে কার কথা! আবারও শাস্তি হল।
বোনাস
শাস্তি পেয়েছিলাম একজন কবির কাছ থেকেও! সেটা আমার আগের লেখায় উল্লেখিত ১৯৮১র একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমার শহিদ মিনারে কবিতা পাঠের দিনটিতেই! ঘটনাক্রমে সেদিন আমি ডিউটি ক্যাডেট ছিলাম; কাজের অংশ হিসেবে সকাল থেকে রাত্রি পর্যন্ত সারাদিনের সমস্ত কর্মকান্ডের জন্য ঘন্টা বাজাতে হত। ডিউটি ক্যাডেট সাধারণত ক্লাশ নাইন থেকেই নিযুক্ত হত, চক্রাকারে একেকদিন একেকজন। একাডেমিক ভবনের ঘন্টার নাম ছিল ‘আলবিরুনি’, ডাইনিঙের ঘন্টার নাম ছিল ‘ Glutton’! মূল ঘণ্টাটার নাম এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না। ডিউটি ক্যাডেটের আরেকটা দায়িত্ব ছিল ডাইনিঙের খাবারের সরবরাহ এলে তার গুনগত আর পরিমানগত মান নিশ্চিত করা। খাবার সাপ্লাই এলে ক্লাশ থেকেও ডেকে আনা হত। আমরা বিশেষভাবে কলার সাপ্লাই এলে সেটা খুব নিবিস্টভাবে, রিলিজিয়াসলি পরীক্ষা করে দেখতাম; অনেক সময় একা না গিয়ে সাথে বন্ধুদেরকেও অবিরাম কলা ভক্ষণে সঙ্গী হিসেবে নিয়ে যেতাম। সেই কলা খেতে গিয়ে লেট হল ১১টার চায়ের ঘন্টা বাজাতে! কলেজ প্রিফেক্ট এহসান ভাই নিজেই ঘন্টা বাজিয়ে আমার শাস্তি ( মাঠের চারপাশে দুই চক্কর) আরো নিশ্চিত করেছিলেন !
পুনশ্চ
লেখা শেষ করে মনে হল, ১ম এবং ২য় ঘটনার সময়টা আলাদা ছিল না। ঈদের ছুটিতে ১ম অপরাধ ঘটানোর পর ক্যাম্পাসে ফিরে এসেই ২য় অপরাধ করেছিলাম। নজরুল ভাই সম্ভবত আমাকে আলাদা করে শাস্তি দেননি; চপল ভাইয়ের কাছে রেফার করেছিলেন কিংবা চপল ভাই-ই একসাথে দুই কঠিন অপরাধের শাস্তি দেয়াটাকেই সঙ্গত মনে করেছিলেন!
Moral
বড় ভাইদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ ; আমার কিছু কিছু প্যারোডি করার প্রবণতা টিকে থাকলেও এর পরে জীবনে আমি আর কখনও সজ্ঞানে কাউকে হেয় করে বা আঘাত করে কিছু লেখার কথা চিন্তাও করি নাই।

আপনার মতামত দিন:


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়