Dr. Aminul Islam

Published:
2020-12-09 19:48:58 BdST

লকডাউনে ছাদবাগান




দেবব্রত তরফদার
______________________


বাসাবাড়ি ত্যাগ করে যখন নিজেই আস্ত একটি বাড়ির মালিক হলাম তখন টবের গাছগাছালির প্রতি আকর্ষণ তৈরি হল । ছাত্রদের মধ্যে অনেকেরই এই অভ্যাস রয়েছে তাই জুড়িদার পেতে সময় লাগেনি । গাছ কেনার এক বিশ্বগ্রাসী খিদে তখন । যে গাছ দেখি তাই ভাল লাগে । অহরহ বিভিন্ন নার্সারিতে আনাগোনা । পাড়ার ছেলেরা "মালিভাই" নামে ডাকতে শুরু করলো । শীতে মরসুমী ফুলে ভরে উঠল ছাদ । সেই সঙ্গে ছাদ আলো করে ফুটে থাকে গোলাপের দল । অতঃপর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সংসারের চাপ , কাজের চাপ বাড়ে , ফুরসৎ কমে । পুরোনো গাছ বড় হয় , টবে আর স্থান সঙ্কুলান হয়না সাইকাস পামেদের । টব থেকে চলে যায় পাড়ার শিশু উদ্যানে । না , তাদের সঙ্গে এখনো দেখা সাক্ষাৎ হয় বৈকি । টবের সেই কৃষ্ণচূড়া এখন প্রাপ্ত বয়স্ক । গরমে ফুলে ফুলে ভরে থাকে । দেখা হলে মাথা নাড়ে । হয়তো বলে , " টবে খেতে না দিয়ে খুব কষ্ট দিয়েছ , এই দ্যাখো আমার আসল রূপ ।" তেমনি বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোলাপের ফুল ছোট হয় । মাটি পাল্টানো সম্ভব হয়না । এর সঙ্গে বাড়ে শাখামৃগকুলের উৎপাত । কাজেই ছাব্বিশ গোলাপ বন্ধুর ছাড়াছাড়ি হয়ে যায় । তারা চলে যায় অন্য অন্য ছাদে । থাকে শুধু কিছু বনসাই , মিলি আর অ্যাডোনিয়াম , স্থবিরের মত । শুধুমাত্র শীতে মরশুমি ফুলে ছাদ রঙিন । এরপর আবার ছাদ মেরামতের কারণে তাদের স্থান হয় নিচে । আর তারা উপরে ওঠে নি । গত তিন বছর শীতে ছাদ ধূসরই আছে ।
এ বছর মার্চে লকডাউনের শুরু । সময় আর কাটেনা । ইউটিউবে একদিন দেখলাম নারকেল ছোবড়ার আর কেঁচো সার দিয়ে নাকি সহজেই গাছপালা করা যায় । লকডাউন হলেও বেরোতাম এদিক সেদিক , প্রায় প্রতিদিনই । হঠাৎই মনে হলো নার্সারি যাই না কেন । তাই দীর্ঘদিন পর আবার সেই পুরনো জায়গায় । সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এতকিছু পাল্টেছে , তাতে গাছ লাগানোর ধরনধারণই বা ব্যতিক্রম হবে কেন । কোকোপিটের মধ্যে গাছ লাগানো ( এ নিয়ে পরে আলোচনা করব) মাথায় উঠল । পুরনো প্রায় একশ খানা টব ঝাড়াঝাড়ি করে শুরু হলো মালিভাইয়ের নতুন ইনিংস । ছাদবাগানের চরিত্র পাল্টাল , ফুলের জায়গায় দখল নিল ফল আর সবজি । বুঝতে পারছি লঙ্কা টমেটো বরবটি পেয়ারা কুল ডালিমে ফুলও কম শোভাবর্ধন করে না । প্রথম বছর তাই বেগুন পেঁয়াজ আলু বরবটি লঙ্কা গাজর স্ট্রবেরি বাঁধাকপি এসব নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে । আলু পেঁয়াজ লঙ্কার যে আকাশছোঁয়া দাম ভবিষ্যতে এ নিয়ে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে মধ্যবিত্তের । অবশ্য সবজির সঙ্গে রয়েছে আপেল নাশপাতি আলুবোখরা পেয়ারা ডালিম আমড়া জামরুল গোলাপজাম সবেদা ড্রাগণফ্রুট মালটা কমলালেবু বাতাবিলেবু মিষ্টি করমচা। সবই অবশ্য শিশু অবস্থায় । তাই একটা কচি পাতা বেরোলেই উত্তেজনা আসে আর ফুল ফুটলে তো কথাই নেই । আশায় বাঁচে চাষা তাই অপেক্ষায় থাকি।।

#সবুজ_প্রেম : ২
আগের লেখার হেডিং দেখে অনেকে আন্দাজ করছেন এটা একটা সিরিজ হবে । গাছপ্রীতি ব্যাপারটি চিরকালই ছিল মানুষের মধ্যে এবং এটি যে ক্রমবর্ধমান তা আমরা সহজেই আন্দাজ করতে পারছি । এটি সংক্রামকও বটে কেননা প্রতিবেশীর বাড়িতে বা ছাদে তাজা ফুল ফলের গাছ দেখলে ইচ্ছেটা সংক্রমিত হয় অন্যের মধ্যে । লকডাউনের শুরুতেই মানুষ হয়ে গেল ঘরবন্দি । এরকম দুঃসহ অবস্থা কারো জীবনেই আসেনি । স্থবিরতা কাটাতে বিকল্পের খোঁজ করতে থাকে হন্যে হয়ে । বিকেল হতেই আকাশে ঘুড়ির মেলা , অনেক জায়গায় গজিয়ে ওঠে অস্থায়ী ঘুড়ির দোকান । তেমনি সাধারণ মানুষের মধ্যে জেগে উঠলো সবুজের প্রতি প্রেম । গাছ করতেন এমন মানুষ হয়ত কাজের চাপে সরে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন তাঁরা আবার পুরোনো টবে যত্নে মন দিলেন , বহুদিন পর খোঁজ নিলেন নার্সারিতে গিয়ে । পাড়ায় পাড়ায় ঘুরতে শুরু করল গাছ আর টবের ফেরিওয়ালা । এরই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়তে শুরু করেছে গাছের নতুন ভালবাসার মানুষ ।
যাঁরা নুতন গাছ করতে শুরু করেছেন তাঁদের উদ্দেশ্যে আজকের এই লেখা । বাগান করার ব্যাপারে আমি নিজেও পন্ডিত নোই কিন্তু প্রায় তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা , আগ্রহ , যোগাযোগ এবং যুক্তি বুদ্ধি দিয়ে বিচার করার ক্ষমতা এসবের উপর ভিত্তি করে এই লেখা । সোশ্যাল মিডিয়ায় গাছপ্রেমী মানুষেরা বিভিন্ন গ্রুপে সামিল হয়েছেন , আমিও এরকম কয়েকটি গ্রুপের সদস্য । এইসব গ্রুপে দেখেছি সদস্যরা তাঁদের অসুবিধার কথা তুলে ধরেন বা নতুন কিছু বিষয়ে জানতে চান ।
প্রথমেই বলি এখন মানুষ খুব বেশি সামাজিক মাধ্যমের উপর নির্ভরশীল । বিশেষ করে তা যদি ভিসুয়াল হয় তাহলে তো কথাই নেই। আমি ইউ টিউবের কথা বলছি । সাধারণ মানুষ মনে করেন এটা সার্বিকভাবে মুশকিল আসানের এক উপায় । এখানে সঠিক তথ্য পরিবেশনকারীর তুলনায় বেনোজল বেশি । অন্তত গাছ বিষয়ক উপদেষ্টাদের কাছে । যাঁরা বোঝেন তাঁরা হয়ত আমার সঙ্গে একমত হবেন । বিভিন্ন চ্যানেলের পরস্পরবিরোধী সিদ্ধান্তে আপনার বিভ্রান্ত হবার সম্ভাবনাই বেশি। তাই এইসব পরিহার করাই বাঞ্ছনীয় ।
গাছ সঠিক বৃদ্ধি সুস্বাস্থ্যের জন্য মাটি , আলো বাতাস , রোদ , জল , খাবার এর সমন্বয় ঘটা দরকার । গাছভেদে এর আবার পার্থক্য হয় । প্ৰথম কথা হল একসঙ্গে সবকিছু জানা যায় না । এখানে থিওরির চাইতে প্র্যাকটিক্যাল অনেক বেশী , জরুরি আবার এর জন্য সময়ের প্রয়োজন । তাই সময় দিন তাহলেই আপনি জেনে যাবেন । নার্সারি যদি কাছেই থাকে তাহলে তাঁদের সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখবেন । এঁরা আপনাকে সবসময় সাহায্য করবে। তবে কতকগুলি বেসিক ব্যাপার রয়েছে সেগুলো জানা দরকার । প্রথমত মাটি । শহরে যাঁরা বসবাস করেন তাঁদের কাছে গাছ করার ক্ষেত্রে এটি প্রধান সমস্যা । অনেকের বাড়িতে খালি জায়গায় নেই । তবুও গাছ করতে কোনো বাধা নেই । মাটি সংগ্রহ করুন । সেটাকে ভালভাবে গুড়িয়ে ছেলে নিন। সংগৃহিত এই মাটি অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এঁটেল হবার সম্ভাবনা বেশি। কাদারভাগ বুঝে আপনাকে বালি মেশাতে হবে । পুকুরের সাদা বালি আর লাল বালি
অর্ধেক অর্ধেক বা সাদা বালি না পেলে শুধু ঝিমদানা লাল বালি মিশিয়ে এঁটেল মাটি দোআস করে নিতে হবে । টবের মাটিতে রাসায়নিক সার না মেশানোয় বাঞ্ছনীয় , তবে পুরনো টবের মাটি ব্যবহার করা হলে এতে ছত্রাকনাশক রাসায়নিক সামান্য পরিমাণে ব্যবহার করা যেতে পারে। জৈব সারের মধ্যে রয়েছে গোবর সার , ঘরে তৈরি পাতা পচা সার এবং ভার্মি কম্পোস্ট । প্রথম দুই সার কমপক্ষে দুই বছরের পুরনো হতে হবে । তবে এদের মধ্যে ভার্মি কম্পোস্ট বেস্ট । এই সার তৈরির ক্ষেত্রে কেঁচোর খাবার হিসাবে পচা গোবর , কলাগাছের দেহাংশ এবং কচুরিপানা ব্যবহার করা হয় । এর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমস্ত উপাদান সুষমভাবে পাওয়া যায় । আর থাকে গাছের বন্ধু বিভিন্ন ব্যকটেরিয়া । যার আয়ু সার তৈরির পর আরো ছয় মাস । তবে সার শুকিয়ে গেলে চলবে না । প্ৰথম দুই সারে এত ব্যালেন্স নেই । আবার অনেককেই দেখেছি গোবর সার শুকিয়ে বস্তায় করে রেখে দেয় । ইউ টিউবে অনেক গাছ পন্ডিতকেও বলতে শুনেছি । কিন্তু আসল সত্যটি অন্য ।
ভার্মি কম্পোস্ট এখনো ততটা পপুলার হয়নি । তবে চাষীরা ব্যবহার করতে শুরু করেছেন সবজি চাষে । কয়েক বছর পর জমির চেহারা পাল্টে যাবে। দামও নির্দিষ্ট নয় , যিনি যেমন পারেন মুরগি জবাই এর জন্য ছুরি শান দিয়ে বসে আছেন। ৪০/৫০ টাকা কেজি বিক্রি হতে দেখেছি । আমার কেনা পড়েছে ৭ টাকা কিলো । সৌভাগ্য যে এরা সারা ভারত প্রতিযোগিতায় সেরা প্রাইজ জিতেছে। (যোগাযোগের নম্বর দিয়ে দিলাম ) । মাটিতে সার প্রয়োগের ব্যাপারে অনেকের ভুল ধারনা রয়েছে । বেশি সার দিলেই গাছ ভাল হয়না । আবার অনেক গাছের গ্রোথ বেশি হয়ে গেলে ফুল ফল কম হয় । আন্দাজ পাঁচ কেজি মাটিতে ৫০০ গ্রাম জৈব সার , দশ গ্রাম নিমখোল যথেষ্ট । নিমখোল অনন্ত গাছ লাগানোর দশদিন আগে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে রাখতে হবে । হাড়ের গুঁড়ো বা শিংকুচি বাধ্যতামূলক নয় । সেটা গাছভেদে । পার্মানেন্ট গাছ , ক্যাকটাস জাতীয় গাছ এবং সাকুলেন্ট উদ্ভিদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হলেও ( মাত্রা নিমখোলের মত ) মরসুমী গাছ বা সবজিতে প্রয়োগের দরকার নেই । সেখানে অবশ্য মাসে তিনবার পচা খোলজল দিতে হবে । সেখানে পঁচিশ লিটার জলে ১০০ থেকে ১৫০ গ্রাম যথেষ্ট । পচাতে হবে সাত দিনের বেশি নয় । আগের দিন মাটিতে জল বন্ধ । জল দেবার পর মাটি খুঁচিয়ে দিতে হবে।

#সবুজ_প্রেম : ৩
দ্বিতীয় পর্ব লেখার পর বেশ কিছুদিন হয়ে গেল । আসলে ইচ্ছে থাকলেও সব সময়ে সময় হয়ে ওঠে না । আমার নিজের ভূমিকায় মাঝেমধ্যে নিজেই অবাক হয়ে যাচ্ছি । অনেকেই ইনবক্সে যেসব প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন তাতে মনে হচ্ছে অনেকেই আমাকে গাছের ব্যাপারে বিরাট বোদ্ধা ভাবছেন। আগে আমার পরিচয় ছিল এই শহরে , যে দেবুদা ইকোনমিক্স আর অঙ্ক নিয়েই থাকেন । এদের মধ্যে একদল জানতেন , দেবুদার নাকি শেয়ার মার্কেট গুলে খাওয়া । আনাড়ির মতো তোলা কিছু ছবি ফেসবুকে পোস্ট করার পর অনেকে ভাবতে শুরু করলো দেবুদা ছবি তোলার ব্যাপারে বিরাট হনু । পরবর্তী সময় অনেকে অবাক হয়ে দেখে দেবুদা আবার লেখে টেখে । সবাই তো আর ফেসবুকে নেই তাই গত বছর যখন কৃষ্ণনগর কলেজিয়েট স্কুলের মাঠে নদিয়া বইমেলায় আমার একটি বই প্রকাশিত হয় তখন অনেকেই ভেবে বসেছিল বোধহয় অঙ্কের কোন বই লিখেছি । যাইহোক চক্ষু লজ্জার খাতিরে তাদের দুই এক জন নিমরাজি হয়ে বইটা কেনার পর যে পাঠ প্রতিক্রিয়া পেয়েছি তা অবশ্য আমার অনুকূলেই গেছে সৌভাগ্যক্রমে । তারপর আসলো গাছের ব্যাপার ‌। যেমন সুদীপ ভট্টাচার্য একজন পেশাদার ফটোগ্রাফার , ফেসবুকে কিছু ওর লেখা টেখা পড়েছি । তবে গাছের প্রতি আগ্রহ সম্পর্কে কোন ধারণা ছিল না । দায়িত্ব নিয়ে একটি গ্রুপ খুলে তাতে বহু গাছপ্রেমীদের জড়ো করতে পেরেছে । ওর গ্রুপের শামিল হওয়ার পর দেখলাম এ ব্যাপারে আমার চাইতে অনেকে কম জানেন , সে কারণে যদি তাদের সাহায্যে আসতে পারি তার জন্য এই লেখা ।
একা থাকতে থাকতে কখন মনে হয় যে পৃথিবী বোধহয় থেমে গেছে । কিন্তু জীবনের নিরন্তর খেলা চলে দুনিয়ায় । মাতৃগর্ভে ভ্রূণের বৃদ্ধি ঘটে , মা পাখি ধৈর্য ধরে ডিমে তা দেয় আর ডিমের মধ্যে জন্ম নেয় প্রাণ । একইরকম ভাবে মাটির নিচে বীজ থেকে সৃষ্টি হয় ভ্রূণ , মাটি ফুঁড়ে ওঠে কান্ড , ডালপালা শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে যায় চারদিক । চাষী যেমন বীজ ছড়িয়ে অপেক্ষা করে অঙ্কুরোদগমের । সঠিক অঙ্কুরোদগম হলে তার মুখে প্রথম হাসি ফোটে । কেননা এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে তার রুটিরুজি জীবনযাপন । তবে শুধুমাত্র রুটি-রুজির তাগিদ নয়। গ্রামে থাকার কারণে অনেক চাষিকে দেখেছি কাজ না থাকা সত্ত্বেও মাঠে গিয়ে বসে থাকতে । অতিবৃদ্ধ অশক্ত চাষীকে মাঠের সবুজ ক্ষেতের মধ্যে গিয়ে চাঙ্গা হতে দেখেছি । আরণ্যকের যুগল প্রসাদের মত মানুষ অবশ্যই আছেন আমাদের আশেপাশে । যাঁরা কোন কিছুর তোয়াক্কা না করেই পৃথিবীকে রঙিন করার জন্য লড়ে যাচ্ছেন । আমাদের মনের মধ্যে অনেক আকাঙ্ক্ষা থাকলেও সময় এবং সামর্থের অভাবে টবে দু একটি গাছ লাগিয়ে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর চেষ্টা করি । তাই জানি যে প্রতিটি গাছ প্রেমী মানুষ তার বাগান বা ছাদ বাগানের গাছের প্রতিটি পরিবর্তন যেমন নতুন পাতা গজানো , কুঁড়ি আসা , ফুল ফোটা , ফল ধরা ‌ এসব নিবিষ্ট মনে লক্ষ্য করেন এবং তা থেকে অপূর্ব এক প্রশান্তি লাভ করেন ।
যাক , কাজের থেকে বাজে কথাই বলা হয়ে গেল বেশি । দীর্ঘদিন গাছ লাগানো বা যত্ন করার মধ্যে কোন সম্পর্ক ছিল না । লকডাউন এর শুরুতে একদিন ইউটিউব সার্চ করে দেখলাম , মাটি ছাড়া কিভাবে বাগান করা যায় । কৌতূহলে ভিডিওটিতে দেখলাম কোকোপিট বা নারকেল ছোবড়ার গুঁড়োর সঙ্গে জৈব সার মিশিয়ে ছাদ বাগান করা হয়েছে । সবাই জানেন যে সামাজিক মাধ্যম থেকে যে সমস্ত তথ্যগুলি পাওয়া যায় তার অনেকটাই অতিরঞ্জিত । এক্ষেত্রে মিসগাইড হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে । তবুও হাতে সময় তখন প্রচুর কাজেই নিউ নদিয়া নার্সারিতে ছুটলাম । এর আগে নেদারল্যান্ডস জাত ম্যাট্রিক্স নামে এক ধরনের ফুল করেছিলাম কোকোপিট ব্যবহার করে । তাই এর সম্পর্কে একেবারে কি ধারণা ছিল না তা নয় । পরে বুঝলাম খুব ছোট গাছ ছাড়া কোকোপিটে চাষ করা মুশকিল ইয়ে আছে । শুধু কোকো পিট এবং ভার্মি কম্পোস্ট এর সাহায্যে গাছ করা যেতে পারে ঠিকই কিন্তু স্থায়ী গাছ যদি একটু বড় হয় তখন ওই আলগা অংশে তার পক্ষে দাঁড়িয়ে থাকা মুশকিল । নার্সারি মালিক অভিজ্ঞ দেববাবুও একই কথা বললেন । বুঝলাম অতিরঞ্জিত ব্যাপারটা ইউটিউবে ঘটেছে । কেননা সেখানে যে বড় বড় গাছ দেখানো হয়েছিল তা শুধুমাত্র কোকোপিটের মধ্যে করা সম্ভব নয় । দ্বিতীয়তঃ হল খরচ । 5 কেজি কোকোপিটের একটি কেক যার দাম 200 টাকা । এতে মেরেকেটে সিমেন্টের বস্তা বুঝবে না । এর সঙ্গে সমপরিমাণ ভার্মি কম্পোস্ট মেশালে অন্তত 40 কেজি ভার্মিকম্পোস্ট লাগবে । আমার হিসেবে তার দাম কমপক্ষে 300 টাকা । এতে আর কটি গাছ লাগানো যাবে । কোকো পিট ব্যবহার করা যায় সেই সমস্ত গাছের ক্ষেত্রে যেখানে মাটি খুবই নরম রাখা প্রয়োজন ।‌ এর জল ধারণ ক্ষমতা খুব বেশি সে কারণে মাটি আদ্র থাকে অনেক সময় ধরে । কাজেই গাছ অনুযায়ী প্রয়োজন হলে পনেরো থেকে কুড়ি পার্সেন্ট কোকোপিট ব্যবহার করা যেতে পারে ।
ইদানিংকালে দেখছি বিভিন্ন রকমের সুদৃশ্য প্লাস্টিক টব ব্যবহারের চল হয়েছে । প্লাস্টিক টপ ব্যবহারের সুবিধা অনেক । দাম কম , ওজন কম , অদ্ভুত সুন্দর সব আকার-আকৃতির যা সুদৃশ্য বাড়ির ব্যালকনি বা ছাদের সঙ্গে মানানসই । অবশ্য প্লাস্টিক ব্যবহারের বিপক্ষে কিছু কথা বলা যায় । মাটির টবের সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকায় সেই ছিদ্র দ্বারা পরিবাহিত জল বাইরে বাতাসের সংস্পর্শে এসে বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার ফলে টবের মাটি তুলনামূলকভাবে ঠান্ডা থাকে । প্লাস্টিকের টবের ক্ষেত্রে এই সুবিধা না থাকায় ভিতরের মাটি বেশি ভিজে এবং বাইরের অংশ খুব তাড়াতাড়ি গরম হয়ে যাওয়ার ফলে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নষ্ট হয় । আবার যখন গাছ একটু বড় হয় তখন তার চারদিকে শিকড় ছড়িয়ে যাওয়ায় টবের গায়ে গাছের শিকড় ধাক্কা খায় । প্লাস্টিকের টব সূর্যালোকে প্রচন্ড উত্তপ্ত হবার ফলে এই শিকড় শুকিয়ে যায় এবং গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি নষ্ট হয় । অনেক সময় স্থায়ী গাছ বিশালাকার ধারন করলে বড় প্লাস্টিকের কন্টেনারে সেই গাছ রোপন করা হয় । আসলে বড় টবের অসহজলভ্যতা এবং ওজন এক্ষেত্রে প্লাস্টিক কন্টেনার ব্যবহারের কারণ । কিন্তু সেখানেও মাটির টব ব্যবহার করতে পারলে গাছে এবং এর ফুল-ফলের আকৃতি-প্রকৃতি অনেক ভালো হওয়া উচিত । তাই সযত্নে যতদুর পারা যায় প্লাস্টিকের টব বর্জন বাঞ্ছনীয় । ভালো পোড়ের মাটির টব অনায়াসে কুড়ি পঁচিশ বছর চলে যায় । প্লাস্টিকের আয়ু মোটেই ততদিন নয় । তাই চাকচিক্যে মন না দিয়ে অতীতে ফেরা উচিত । মাটির টব ব্যবহার করুন কিন্তু তাতে অবশ্য রং না করাই বাঞ্ছনীয় ।

আপনার মতামত দিন:


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়