Dr. Aminul Islam

Published:
2020-11-20 11:59:39 BdST

মহামান্য আদালতের উপর বাংলাদেশের চিকিৎসকদের আস্থা আছে


ডা. রাজীব দে সরকার 

__________________

মহামান্য আদালতের উপর এখনো বাংলাদেশের চিকিৎসকদের আস্থা আছে। হয়তো ডাঃ মামুন তার সাথে হওয়া অন্যায় এর বিচার পাবেন।

হয়তো ওয়ারেন্ট ছাড়া, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছাড়া বা চার্জশীট ছাড়া এবং কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমূতি ছাড়া (সরকারী চাকুরী আইন, ধারা ৪১) গ্রেফতার হওয়া ডাঃ মামুন এর হাত থেকে পুলিশই হাতকড়া খুলে নেবে।

কিন্তু ডাঃ মামুন এর এই ঘটনা প্রায় ৩০,০০০ হাজার সরকারী চিকিৎসক এবং প্রায় তার দ্বিগুণ সংখ্যক বেসরকারী চিকিৎসককে এদেশে নতুন করে এক পুরোনো শিক্ষা দিয়ে গেলো।

'কৃতঘ্ন' শব্দটা হয়তো এজন্যই শুধু বাংলাতেই আছে। এর কোন ইংরেজী সমার্থক শব্দ আমি গুগল হাতড়িয়েও পাইনি।

চিকিৎসকদের ক্ষমতার দাপট কোন কালেই ছিলো না। ক্ষমতার দাপট দেখাতে কেউ চিকিৎসক হয়ও না। চিকিৎসা পেশার সাথে পুরোটাই জড়িয়ে আছে 'সম্মান'। সম্মান ছাড়া এই পেশায় আর দ্বিতীয় কোন স্বার্থ নেই আমাদের। কারন আয়-রোজগার পৃথিবীর সব পেশাতেই হয়।

অনেক কথা বলতে গিয়েই আটকে যাই।

কারন আমি একজন সরকারী চাকুরীজীবী। কিন্তু এটুকু জানি এবং দেখেছি, আমাদের স্বাস্থ্য ক্যাডার বছরের পর বছর বঞ্চিত একটি ক্যাডার। পদোন্নতিবিহীন একটি ক্যাডার। প্রণোদনাবিহীন একটি ক্যাডার। তাতে আমাদের দুঃখ নেই। দুঃখ করে লাভও নেই।

সিনিয়র এএসপি জনাব শিপন সাহেব মারা গেছেন (তার আত্নার শান্তি কামনা করি) এবং চিকিৎসক হিসেবে কোন মৃত্যুই আমাদের কাঙ্খিত নয়।

কিন্তু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর মেধাবী একজন ছাত্রের প্রতি কতিপয় মিডিয়ার যে সহানুভূতি, অসংখ্য শিক্ষার্থীকে পিছনে ফেলে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় টিকে চিকিৎসক হওয়া মেধাবী ছেলেটার প্রতি সেই সহানুভূতিটা দেখি না কেন?

এ দেশে রোগীর 'চিকিৎসা করার জন্য' বার বার পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছেন আমাদের চিকিৎসকরা। তাই আশ্চর্য হই না। আশ্চর্য হয়ে লাভও নেই।

রোগাক্রান্ত মানুষের চিকিৎসা করাটা আজ এদেশে 'ফৌজদারী' অপরাধ!

যেখানে বৈশ্বিক মহামারীতে পর্যদুস্ত গোটা পৃথিবী, সেখানে গত ৯ টা মাস 'শতাধিক' সহকর্মীর 'লাশ' কাঁধে নিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে গেছেন আমাদের দেশের চিকিৎসকরা।

মজা হচ্ছে, আমাদের মিডিয়ার একটি অংশ জানতেও পারলো না, তারা নিজেদের কি ক্ষতিটাই না করলো!

এদেশে যদি চিকিৎসকরা 'নিয়মমেনে' চাকুরী করেন, দেশের অর্ধেক মানুষকে বিনা চিকিৎসায় মরতে হবে।

- ৮৫০ শয্যার হাসপাতালে ৮৫১ নম্বর রোগীকে চিকিৎসকরা যদি নিয়ম মেনে ভর্তি না দেন?

- আউটডোরের সরকারী সাপ্লাই এর ঔষধ ফুরিয়ে যাওয়া মাত্রই যদি চিকিৎসরা বাইরের ঔষধ লেখা বন্ধ করে অসম্পূর্ণ চিকিৎসাপত্র রোগীর হাতে ধরিয়ে দেন?

- ইন্ডোরের ভর্তি রোগীদের জন্য যে সব ইনজেকশন স্যালাইন সাপ্লাই থাকে, তার বাইরে যদি চিকিৎসকরা আর প্রয়োজনীয় একটি ইনজেকশনও না লিখে দেন? তাতে রোগীর জীবনশঙ্কা থাকলেও চিকিৎসক যদি সিদ্ধান্ত নেন, তিনি সরকারী নিয়মের বাইরে যাবেন না?

- কয়েকজন নামী দামী অধ্যাপকের যদি হঠাৎ করে মেরুদন্ডটা গজিয়ে যায় আর তারা যদি সিদ্ধান্ত নেন, ডাঃ মামুন এর প্রতি অবিচার এর প্রতিবাদে তারা আর চেম্বার করবেন না। সরকারী চাকুরীর অফিস টাইমের পরে গান শুনে আর কবিতা আবৃত্তি করে দিনের বাকি সময়টা কাটাবেন, তাহলে কি হবে?

- 'নিয়ম সকলের জন্য সমান' এই অজুহাতে নেতা-এসপি-সাংবাদিক সবাইকে যদি সরকারী হাসপাতালের আউটডোরে ৫০-১০০ জন লোকের পিছনে দাঁড়িয়ে সিরিয়াল মেনে সেবা নিতে হয়?

আসলে এগুলো কিছু হবে না। এগুলো কিছুই আমরা করি না। করবোও না।

কারন সরকারী চাকুরীতে ঢোকার অনেক আগে আমরা পড়েছি মানুষের শরীরবিদ্যা। মৃত লাশ, যার ডিসেকশন হচ্ছে অ্যানাটমির টিউটোরিয়াল রুমে, তার প্রতিও সম্মান দেখাতে বলা হয়েছে আমাদের বইগুলোতে।

তাই বাংলাদেশের চিকিৎসকরা সরকারী চাকুরী করেও 'অফিসার' হতে পারে নি। সরকারের চাকুরী করেও এখনো মানবিক রয়ে গেছে। একজন অফিসারকে গ্রেফতার করবার নিশ্চয়ই প্রটোকল আছে। কিন্তু মানবিক একজন বলদকে চাইলেই ঘরের পোশাকে তুলে থানায় নেওয়া যায় এবং পরে গ্রেফতার দেখানো যায়।

তাই একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি ভীত। আমরা ভীত।

ভয় মাথায় নিয়ে আর যাই হোক, চিকিৎসা করা সম্ভব না। আমরা মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েছি।

ঠিক এই মুহুর্তে যদি টেলিভিশন চ্যানেলের কোন মালিক বা সেলিব্রিটি সাংবাদিক অসুস্থ হয়ে পড়েন, আমাদের এই ভয়ের কারনে বিপদে পড়বেন তিনি বা তার পরিবার। কোন প্রাইভেট হাসপাতাল তাকে রাখবে না। কারন প্রাইভেট হাসপাতাল মালিকগণ ব্যবসা করেন এবং ঝামেলা পরিহার করেন। আর যদি সরকারী হাসপাতালে তিনি আসেন, চিকিৎসকরা হয়তো যথাসম্ভব নিয়মে থাকবেন। নিয়মে থেকে যতোটুকু চিকিৎসা সম্ভব ততোটুকুই হয়তো তিনি পাবেন। 'মানবিক' হতে গিয়ে গ্রেফতার হতে কে চাইবে?

ডাঃ মামুন এর ঘটনা এই শিক্ষাই কি দিয়ে গেলো না?

কিছু কিছু পেশার মানুষকে সাধারণ মানুষ ভয় পায়। কিন্তু আমাদেরকে মানুষ ভয় পায় না। এটা আমাদের ব্যর্থতা না। এটা আমাদের অর্জন। আমাদের রিভলভারটা থাকে আমাদের চোখে। আমাদের র‍্যাংক ব্যাজ গুলো থাকে আমাদের আঙ্গুলের মাথায় মাথায়।

আমরা রোগীর খুব কাছে যাই। রোগীকে অভয় দেই। রোগীর ব্যাথায় ভরা শরীরটা স্পর্শ করি আমাদের হাত দিয়ে। সেই হাতে কখনো কখনো 'হ্যান্ডকাফ' ওঠে। হাতে হ্যান্ডকাফ পড়া একজন চিকিৎসক এর ছবি ভাইরাল হয়।

আমরা মিডিয়া ট্রায়াল শুরু করি।

খেয়াল করে দেখি না,
হ্যান্ডকাফ হাতে পড়া চিকিৎসক "ডাঃ মামুন" কাঁপছেন।
তিনি কাঁদছেন। তার চোখজোড়া ভেজা।
এমন দুঃস্বপ্নের মতো একটা দিন, তার জীবনে আসবে, তিনি কোনদিন ভাবেন নি।

ভালো থাকো বাংলাদেশ।
নিয়মের কড়া হ্যান্ডকাফ উঠুক তোমার হাতে।

[পঞ্চদশ প্রজন্ম, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ]

আপনার মতামত দিন:


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়