ডাক্তার প্রতিদিন

Published:
2020-05-18 11:02:27 BdST

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স -এর ওপিডি-র হালচাল




ডা. আজাদ হাসান

_________________


উপজেলা হাসপাতালের আউট ডোর চিকিৎসার দৈনন্দিন চিত্র হলো :
এখানে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরকে নিয়ন্ত্রণ করে সুশৃঙ্খল ভাবে চিকিৎসক কর্তৃক চিকিৎসা সেবা দিতে সহযোগিতা করার জন্য কোনো সহযোগী স্টাফ নেই। ফলে রোগীর ভীড় সামলাতে এবং এ ধরনের বৈরী পরিবেশের মাঝে চিকিৎসা দিতে যেয়ে চিকিৎসক -দের গলদগর্ম হতে হয়।


এখানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এর একটি ওপিডি-র ছবি সংযুক্ত করা হলো। সংযুক্ত ছবিটি লক্ষ্য করুন।
(সৌজন্যঃ ছবিটি Citizens Forum থেকে নেয়া)
এবার নিজেকে প্রশ্ন করুন....

এইভাবে কি মান সম্মত চিকিৎসা দেয়া সম্ভব?
পুরো রুম ভর্তি রোগী, চিকিৎসকের টেবিলেও এক বাচ্চাকে দাড় করানো হয়েছে। রীতিমতো এক বিশৃঙ্খল পরিবেশ। এভাবে কি ঠান্ডা মস্তিষ্কে কাজ করা বা চিকিৎসা সেবা দেওয়া সম্ভব? তাছাড়াও উটকো ঝামেলা হিসেবে রয়েছে~
★ বিদ্যুতের যখন তখন খেয়াল খুশি মতো আসা যাওয়ার খেলা।
★ আছে স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব দেখানো লিডার কাম মাস্তান এবং
★ স্থানীয় ভুঁইফোড় সাংবাদিকের সিরিয়াল ভেংগে আগে চিকিৎসা নেয়ার খায়েশ।

এরপরও দিনশেষে চিকিৎসকদের সেবা প্রসংগে যে সব অভিযোগ আসবে তা হলো -
★ ডাক্তার কথা বলে নাই।
★ ডাক্তার ঠিক মত দেখে নাই।
★ ডাক্তার মাত্র ৩/৪ মিনিট দেখেছেন।
★ ডাক্তার টেস্ট ধরাইয়া দিছে...

অথচ মান সম্মত চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে হাসপাতাল প্রশাসন কর্তৃক সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জনসাধারণ এবং জনপ্রতিনিধিসহ সাংবাদিকদেরও দায়িত্বশীল আচরণ করা আবশ্যক।


এবার তা হলে, আলোচ্য সমস্যার সমাধানে কি করা যায় (?) সেটার দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক।

ওপিডি-তে সুষ্ঠু ভাবে চিকিৎসা দিতে এবং মান সম্মত সেবা প্রদানের স্বার্থে এখানে প্রতিটি বিভাগের জন্য আলাদা ভাবে স্টাফ থাকা অত্যন্ত জরুরী।
বিষয়টি একটু ব্যাখ্যা করছি।

১) বহিঃবিভাগে মেডিসিন, সার্জারী, গাইনী-অবস্ এবং শিশুবিভাগেই চিকিৎসার জন্য অধিকাংশ রোগীরা এসে থাকেন।
এই সব বিভাগে রোগীর চাপ বেশী হওয়ায়, প্রত্যেক বিভাগের আউট ডোরের রোগীদের বেসিক তথ্য এবং ভাইটাল সাইন রেকর্ড করার জন্য আলাদা আলাদা করে একজন করে স্টাফ নার্স নিয়োগ দেয়া প্রয়োজন।

উক্ত স্টাফ নার্স পূর্ন-বয়স্ক (পুরুষ /মহিলা) রোগীদের ক্ষেত্রে ভাইটাল সাইন অর্থাৎ টেম্পারেচার, পাল্স, বিপি নোট করে তারপর সিরিয়াল দিবেন এবং ক্রম অনুযায়ী রোগীকে ডক্টরের কাছে পাঠাবেন। তবে ডায়বেটিস এর হিস্ট্রি থাকলে সে ক্ষেত্রে হেলথ কমপ্লেক্সের ল্যাব. হতে রোগীকে FBS / RBS পরীক্ষা করিয় আশার পরামর্শ দিতে পারেন।

★ আর শিশু রোগীদের ক্ষেত্রে বাচ্চার তাপমাত্রা, পাল্স এবং ওজন রেকর্ড করে তারপর সিরিয়াল দিবেন এবং ক্রম অনুযায়ী রোগীকে ডক্টরের কাছে পাঠাবেন।

★ আর অবস্-এর রোগী হলে টেম্পারেচার, পাল্স, বিপি নোট, ওজন নোট করবেন এবং তারপর সিরিয়াল দিবেন এবং ক্রম অনুযায়ী রোগীকে ডক্টরের কাছে পাঠাবেন। তবে সেই সাথে হেলথ কমপ্লেক্সের ল্যাব. হতে গর্ভবতী রোগীর FBS / RBS পরীক্ষা করিয়ে আশার পরামর্শ দিতে পারেন।

★ অন্যান্য রোগী যেমনঃ চক্ষু, নাক-কান -গলা বিভাগ, দন্ত বিভাগ এসবের জন্যে একজন স্টাফ নার্স থাকবেন যিনি সংশ্লিষ্ট রোগীর ভাইটাল সাইন রেকর্ড করতঃ রোগীকে সিরিয়াল নম্বর দিবেন এবং সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের নিকট পাঠাবেন। তবে ডায়বেটিস এর হিস্ট্রি থাকলে সে ক্ষেত্রে হেলথ কমপ্লেক্সের ল্যাব. হতে রোগীকে FBS / RBS পরীক্ষা করিয় আশার পরামর্শ দিতে পারেন।

এখানে উল্লেখ্য এ কাজ গুলো যদি আউট ডোরে নিয়োজিত স্টাফ নার্সরা সম্পন্ন করেন তা হলেঃ
★ টিকেট কাউন্টারের সামনে অযথা রোগীর ভীড় কমে যাবে।
★ চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও দ্রুততার সাথে রোগীর চিকিৎসা সেবা প্রদান করা সহজ হবে।

প্রসংগত উল্লেখ্য, রোগীদের চিকিৎসা প্রদানের ক্ষেত্রে রোগীর হিস্ট্রি এবং ভাইটাল সাইন খুব গুরুত্বপূর্ণ। মেডিসিন-এর রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট রোগীর ব্লাড প্রসার কিংবা ডায়বেটিস আছে কিনা, কিংবা ব্লাড প্রেসার এবং ডায়বেটিস থাকলে সেটা নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা তা জানা একজন চিকিৎসকের জন্য আবশ্যক। তেমনি সার্জারী কিংবা গাইনী কিংবা
দাতের রোগীর চিকিৎসার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট রোগীর ব্লাড প্রসার কিংবা ডায়বেটিস আছে কিনা, কিংবা ব্লাড প্রেসার এবং ডায়বেটিস থাকলে সেটা নিয়ন্ত্রণে আছে কিনা তা জানা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের জন্য আবশ্যক। আমাদের নার্সিং স্টাফরা যদি ব্লাড প্রেসার এবং ডায়বেটিস এর স্ট্যাটাস সম্পর্কে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ করেন তা হলে চিকিৎসকদের ক্ষেত্রে ওনাদের কাজ অনেক সহজ হয়ে যায় এবং রোগীর হয়রানী হ্রাস পাবে।

এখানে প্রশ্ন আসতে পারে কিভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব?
এর জন্য কিছু লজিস্টিক সাপ্লাই প্রয়োজনঃ
★ রোগীর তথ্য সংগ্রহের জন্য প্রত্যেক ওপিডি স্টাফ নার্সকে একটি করে ট্যাব সাপ্লাই করতে হবে।
★ উক্ত ট্যাবে হাসপাতালের জন্য উপযোগী প্রোগ্রাম থাকবে। রোগীদের তথ্য এন্টার করার সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাটা বেজ-এ উক্ত তথ্য সেভ হয়ে যাবে।
★ বর্তমান ডিজিটাল যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চিকিৎসা কার্যে ব্যবহৃত টেম্পারেচার রেকর্ড এর জন্য থার্মাল স্কেনার, ডিজিটাল বিপি ইন্স্ট্রুমেন্ট, ডিজিটাল ওয়িং স্কেল সরবরাহ করতে হবে।
★ বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে ওপিডি-তে আসা রোগীদের রেজিষ্ট্রেশন ফি বাবদ নূন্যতম ১০/= টাকা হওয়া উচিৎ। ফ্রি চিকিৎসা বন্ধ হওয়া আবশ্যক। (তবে হত দরিদ্র আর ছিন্নমূল মানুষের কথা আলাদা।)

২) তাছাড়া প্রতিটি ওপিডি-তে একজন করে এমএলএসএস থাকা আবশ্যক, যিনি রোগীদের সিরিয়াল মোতাবেক রোগীকে প্রথমে নার্স-এর কাছে এবং পরে ডক্টরের কাছে পাঠাতে সহায়তা করবেন।
চিকিৎসা শেষে রোগী কোথায় ফার্মেসী সেটা দেখিয়ে দিবে বা যদি ইনভেস্টিগেশন এর প্রয়োজন থাকে সে ক্ষেত্রে যে দিকে প্যাথলজি ল্যাব. আছে তা দেখিয়ে দিবে।

৩) প্রসংগত উল্লেখ্য, মেডিসিন, সার্জারী, শিশু রোগ, স্ত্রীরোগ ও প্রসূতি বিভাগের ওপিডির জন্য আলাদা চিকিৎসকের পোস্ট তৈরী করে পোস্টিং দিতে হবে।
৪) আউটডোর সেবা ইম্প্রুভ করতে আউটডোরের জন্য আলাদাভাবে নার্সিং স্টাফ এবং এমএলএসএস এর নিয়োগ দিতে হবে এবং প্রয়োজনীয় স্টাফের সংখ্যা বৃদ্ধি করতে হবে।

দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা হলো ওপিডি-তে চিকিৎসার জন্য উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা ডিস্ট্রিক্ট সদর হাসপাতাল গুলোতে আজো কোনো স্ট্যান্ডার্ড সিস্টেম গড়ে উঠেনি।

আশা করি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সুদৃষ্টি দিবেন এবং সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিবেন।

AD..

 

 

আপনার মতামত দিন:


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়