Ameen Qudir

Published:
2019-10-06 10:20:30 BdST

সিনিয়র হয়ে জুনিয়র ডাক্তারের কাছে হেরে যাওয়ার কাহিনি


ডা. তারিক অনি, অস্ট্রেলিয়া থেকে____ 

সপ্তাহখানেক আগে ডা: আবদুল করিম( ছদ্মনাম) যিনি একজন নন- এমবিবিএস প্রাকটিশনার, অর্থাৎ এমএলএফ, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, স্বাস্থ্যকর্মী, ইত্যাদি অথচ ডাক্তার লিখে প্রাকটিস করে যাচ্ছেন, তাদের কিভাবে মূল স্বাস্থ্যব্যবস্থার সাথে সম্পৃক্ত করা যায় এই শীর্ষক একটি লিখা লিখেছিলাম। শিরোনাম ছিল “ডাক্তারী ভাবনা: এমবিবিএস বনাম নন-এমবিবিএস ডাক্তার” । ডাক্তার প্রতিদিনসহ লেখাটি বেশ কটি ম্যাগাজিন ছেপেছে, সামান্য কিছু লাইক শেয়ার পেয়েছে। ডাক্তার প্রতিদিনের প্রকাশনাটি শেয়ার পেয়েছে ১৯০০ । দৃশ্যমান রিপোর্ট তাই বলছে।
এরকম কিছু লিখার পর আমি সাধারণত চুপ মেরে যাই। সোসাল মিডিয়ার পেজগুলোতে ঘাপটি মেরে বসে থাকি, কোন লাইক কমেন্ট তেমন করি না, বসে বসে নজরদারি করি। ব্যাপারখানা অনেকটা রচনা লিখে ছাপিয়ে ফেলেছি- এবার খালি “লাইক- কমেন্ট - শেয়ার” গুনে ফলাফল দেখার পালা। স্বভাবতই আমিও খাঁটি বাঙালী হওয়ায় এই চরিত্রদোষে দুষ্ট। ওই আলোচনা থাকুক।

প্রতিবারের মত আমার এবারের লেখাটি তেমন সমাদৃত হল না। কারণ লেখাটির পুরোটা জুড়েই কিভাবে এসব নন-এমবিবিএস প্রাকটিশনারদের দমন পীড়ন না করে পুনর্বাসন করে দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তর করে স্বাস্হ্য সহায়ক ভূমিকায় নিয়ে আসা যায় তাই ছিলো মূল আলোচ্য। লেখাটি প্রকাশিত হলো বেশিরভাগ ডাক্তার পেজে, যেখানে ডাক্তাররা নানা কারণে আব্দুল করিমদের উপর যারপরনাই ক্ষেপে আছে। নিজে এমবিবিএস ডাক্তার হয়ে স্বজাতির বিরুদ্ধাচারণ করে উল্টো নন-এমবিবিএস আবেদুল করিমদের পক্ষে সাফাই গাওয়া, বেশিরভাগ ডাক্তারই ব্যাপারটা ভালোভাবে নিলেন না। ফলস্বরুপ লাইক- কমেন্ট কম পড়লো। শেয়ারের সংখ্যা কমে গেল।
কিছু ডাক্তারবন্ধু আমার চিন্তাভাবনার ভূয়সী প্রশংসা করলেও বেশিরভাগ বন্ধু চুপ থাকলেন। কম খাতির যাদের সাথে তাদের সমালোচনা পেলাম বেশ কিছু। কিছু আক্রমনাত্মক ডাক্তার আমাকে অতি সুশীল/ নতুন আইনস্টাইন/ সাদা চশমা দিয়ে ঘন কালো কুয়াশাচ্ছন্ন সমস্যা সমাধান করার প্রচেষ্টাকারী উপাধি দিলেন। যারা এরচেয়ে বেশি ক্ষেপে গেলেন তারা আমার চিন্তা ভাবনা অবান্তর বলে উড়িয়ে দিলেন। দু’জন ইনবক্সে জানালেন, আব্দুল করিমদের অপচিকিৎসায় দেশে এমবিবিএস ডাক্তারদের ত্রাহী মধুসুদন অবস্থা, এমতাবস্থায় তাদের ট্রেনিং দিয়ে তাদের হাতে রোগী দেওয়া মানে সুইসাইড ডিসিশন। এসব চিন্তা নিজের মধ্যে রাখাই ভাল।

আমি মোটামুটি ফুটা বেলুনের মত চুপসে আছি। পেজগুলোতে এমন ভাব নিয়ে ঘুরে বেড়াই যেন, এই লেখার মালিক তো আমি না। কেই নাম ট্যাগ করে কমেন্ট করলেও আমি গুম মেরে বসে থাকি, রিপ্লাই দেইনা। আমার অবস্থা অনেকটা এরকম- নিশ্চিত এ প্লাস পাওয়ার আশায় রচনা জমা দিয়েছিলাম, পেয়েছি এফ গ্রেড, উপরন্তু আরেক সাবজেক্ট থেকে দুই পয়েন্ট কাটা। পুরো বিসিএস এর নৈর্ব্যক্তিক প্রশ্নের নেগেটিভ মার্কিং এর মত। ভুল করলে শুদ্ধ উত্তরের নম্বর ও কাটা !

যাই হোক, এমন সময় একটা ম্যাজিক ঘটলো। ইনবক্সে নক পেলাম। আমার মেডিকেলের এক জুনিয়র নক দিয়েছে। সে বিসিএস করে মেডিকেল অফিসার হিসেবে বাংলাদেশের একটি উপজেলায় সেবা দিচ্ছে। তার সাথে টেক্সট এবং ফোনে কথা হল। সে গর্ব করে লিখলো, “ভাই, ভিলেজ ডক্টর নিয়ে আপনার আইডিওলজী আমি প্রথম বাংলাদেশে ইমপ্লিমেন্ট করেছি।” সে তার উপজেলার সব ভিলেজ ডক্টর আব্দুল করিমদের এক করেছে, একসাথে ডেকেছে। তাদের সাথে মিটিং করে ধৈর্য ধরে বুঝিয়েছে। আমি এটুকু শুনেই আশ্চর্যান্বিত হয়েছি, কারণ আমি বাংলাদেশের পেরিফেরির অবস্থা জানি। আবদুল করিমদের একসাথে এক টেবিলে বসানো চারটিখানি কথা নয়। তারউপর তাদের সাথে বসে তাদের বর্তমান কর্মকান্ড সম্পর্কের সমালোচনা করে ভুল-শুদ্ধ তুলে ধরা - প্রায় অসম্ভব একটি কাজ। সে এটা করে ফেলেছে !!

ব্যাপারটা এখানেই থেমে নেই। সে আবদুল করিমদের “কি করা যাবে/ কি করা যাবে না/ কখন অবশ্যই রোগীকে ডাক্তাদের কাছে রেফার করতে হবে অর্থাৎ প্রাকটিস পরিধি( Scope of Practice) তৈরী করেছে এবং তা কাগজে খসড়া লিপিবদ্ধ করেছে। সেখানেই সে ক্ষান্ত হয়নি- সে কাগজে ডীড( Deed Agreement) করেছে তাদের সাথে, এই মর্মে তাদের বুঝিয়ে তাদের সম্মতিপত্র নিতে সক্ষম হয়েছে যে তারা তাদের পারদর্শিতার বাইরে প্রাকটিস করবেন না এবং তা দলিল চুক্তির মত সংরক্ষিত। অর্থাৎ সে মোটামুটি ডাক্তার এবং আবদুল করিমদের মাঝে যে সাংঘর্ষিক পরিধি তা কমিয়ে একটা সমঝোতার ( Memorandum of Understanding) মধ্যে নিয়ে এসেছে।

সে আরও অনুধাবন করেছে যে কাগজে সই নিয়ে শুধু একটি হ্যা/ না লিস্ট ধরিয়ে দিয়ে আব্দুল করিমদের মাঠে নামিয়ে দেওয়া যাবে না। তাদের ট্রেনিং দরকার। তাদের দক্ষতার সাথে নিরাপদভাবে রোগীর রোগ নির্ণয় , চিকিতসা, রেফেরাল নির্বাচন এসব শিখানো দরকার। সে তার উপজেলা হাসপাতালে নিজ উদ্যোগে আবদুল করিমদের জন্য ট্রেনিং এর ব্যবস্থা ও করেছে এবং তা নিয়মিত চলবে।

আরও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা হচ্ছিল- সে আলোচনা আজ থাকুক। আমি সাধারণ লোভী মানুষ। কোন লেখা ছাপার পর লাইক-কমেন্ট- শেয়ারের সাথে আমার আনন্দ-তৃপ্তি ও আনুপাতিক হারে বাড়ে। এই প্রথম একটি লেখা সবচেয়ে কম সমাদৃত হলেও মনে হচ্ছে আমার বিভিন্ন সময়ের ভাবনা/ লেখাগুলোর মধ্যে এযাবতকালে এটাই সবচেয়ে সার্থক লেখা। আমার এই লেখাটা দেশের একটা উপজেলায় একটা পরিবর্তনের সূচনা করতে পেরেছে। সরকারের যেকোন একটা প্রজেক্ট বাস্তবায়ন করতে শত কোটি টাকায় ব্যয়ের পরও ফলাফল প্রায়সই হয় শূণ্য। সেখানে বিনা পয়সায় নিজ উদ্যোগে শুধুমাত্র মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে এমন একটা অসাধ্য সাধন করে আব্দুল করিমদের ট্রেনিং নিশ্চিত করে তাদের দক্ষ জনশক্তিতে রুপান্তর করার কাজ সে শুরু করে দিয়েছে মনিটরিং সহ।

এই প্রথম কাউকে ঈর্ষা হল। আমি অলস মস্তিস্ক ভেবে চিন্তে কিছু একটা লিখেছি- যেটা খুবই সহজ। কিন্তু একজন তা বাস্তবায়ন করে পরিবর্তনের সূচনা টা দেখিয়ে দিয়েছে, যেটা দেশের বাস্তবতায় প্রচন্ড কষ্টসাধ্য এবং সে আমার জুনিয়র। জুনিয়র হারিয়ে দিয়েছে সিনিয়রকে। আমার নিজের মেডিকেলের জুনিয়র, আমার চেয়ে বেশি পারদর্শী। সিনিয়র হয়ে নিজের মেডিকেলের জুনিয়রের কাছে জ্ঞান/পারদর্শিতায় পরাজিত হওয়ার পরও আমার আনন্দ হচ্ছে।
দেশে প্রচুর হতাশার চিত্র প্রায়সই ফলাও করে ছাপা হয়। ভালো খবরগুলো বিষাদকথনে চাপা পড়ে যায়। তবে এটা খুবই আশাব্যঞ্জক যে দেশে এত এত বিষাদকথনের মধ্যেও স্ব-উদ্যোগী, পরিবর্তনপ্রত্যাশী, উদ্যমী তরুণ বিসিএস অফিসার রয়েছে যারা স্রোতের বিপরীতে কিছু করে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে। মাথার উপর পলেস্তারা খসে পড়া জরাজীর্ণ সাবসেন্টারের ছাদের নিচে আর পুরাতন ঘুণে ধরা টেবিল-চেয়ারে বসে, একজন তরুণ বিসিএস অফিসার পরিবর্তন চাইছে। এদের সযত্নে লালন করাটা খুব জরুরী। খুব খুব জরুরী। এরা যেন বিষাদকথনের স্রোতে কখনও হারিয়ে না যায় বা উদ্যম হারিয়ে না ফেলে। দেশ এগিয়ে যাক দেশ গড়ার কারিগরদের কর্মপ্রয়াসে।
আমার জুনিয়র, বিসিএস কর্মকর্তা ডাক্তার সাহেবের নাম প্রকাশ করে তাকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়ে লজ্জা দিচ্ছিনা। আমি আসলে তাকে না জানিয়েই তাকে নিয়ে লেখাটি লিখেছি। সে অবধারিতভাবে আমার লেখাটি পড়ছে। তার টেক্সট মেসেজ ম্যাগাজিন প্রকাশকের কাছে প্রমাণস্বরূপ দেওয়া হয়েছে ।
________________________

ডা. তারিক অনি, ব্যাচ কে -৬১

ঢাকা মেডিকেল কলেজ

রেজিস্ট্রার, এক্সিডেন্ট এন্ড ইমার্জেন্সী

সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড হাসপাতাল,

অস্ট্রেলিয়ার কর্মরত।

আপনার মতামত দিন:


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়