Ameen Qudir

Published:
2019-08-02 12:15:34 BdST

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল নিয়ে মিডিয়ার অপপ্রচার :" আপু, কি পাপ করলে মানুষ ডাক্তার হয়? "


 



ডা. মিথিলা ফেরদৌস
___________________________
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীতে করিডোরগুলো যখন ভরতে শুরু করলো। হাটার জায়গা নাই, তখন সেখানকার জুনিয়র ডাক্তাররা পায়ের জুতা খুলে রোগীদের বিছানার পাশে বসে বসে যেখানে চিকিৎসা দিচ্ছিলো। সেখানে একটা টিভির ক্যামেরাম্যানকে দেখলাম জুতা পরে বেডের উপরে ক্যামেরা নিয়ে স্টিল দাঁড়িয়ে থাকতে। ইচ্ছা করতেছিল ছবি তুলে রাখতে।

কেন্টিনের গ্লাসের পাশে থেকে ক্যামেরাম্যানদের দেখিয়ে এক জুনিয়র বলল- সারাক্ষণ এরা ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়েই থাকে। কি যে অস্বস্তি লাগে!

অস্বস্তি লাগা স্বাভাবিক। তবুও মজা করে বলি- ভাল তো! এত কষ্ট করছো তা ওরা হয়তো জাতিকে দেখাতে চাচ্ছে। যদিও আমার মনে হয়েছে এরা ক্যামেরা আনে ডাক্তারদের পাহাড়া দিতে। রোগীর প্রতি বিন্দুমাত্র মমতাবোধ এদের আছে বলে মনে হয় না। জুনিয়র মেয়েটার চোখের কোনে কালো দাগ। বললাম- হঠাৎ রোগী বেড়ে গেছে, রোগীর পাশে পাশে যে ঘুরছো, সাবধানে থেকো।

- আপু, ওডোমাস দেই। কিন্তু কতটা প্রটেক্ট করবে কে জানে? সবচেয়ে কষ্ট গরমের মধ্যে এতগুলো রোগীর ফলো আপ দেয়া। তবুও রোগীগুলো ভাল হোক আপু।

সবচেয়ে কষ্ট করছে শিশু বিভাগ আর মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র ডাক্তাররা। শিশুবিভাগের এক মেয়ে তো মন খারাপ করে বলেই ফেলল- আপু, কি পাপ করলে মানুষ ডাক্তার হয়? এত যে কষ্ট! ঘর নাই সংসার নাই, নিজের বাচ্চার খবর নাই, নিজের যত্ন নেয়ার সময় নাই। তবুও রোগীরা ভাল হয়ে যাক সবাই। একটা রোগী মারা গেলেও খুব কষ্ট হয়।

শুনে মন খারাপ হয়।

হাসপাতালের ল্যাবে গিয়েছিলাম, যেখানে একমাত্র মেডিকেল রিলেটেড লোক ছাড়া কারো প্রবেশ নিষেধ। হুড়মুড় করে ক্যামেরা নিয়ে তেনাদের প্রবেশ কাজের ব্যাঘাত ঘটায়। আমি অবাক! ইচ্ছা করে ছবি তুলে রাখি। কিন্তু আসলে আমরা এইসব পারিনা। কিন্তু পারা উচিৎ। এই ছবিগুলো তখন উঠিয়ে রেখে এইসব জনগণকে দেখানো উচিৎ।

যাইহোক, ল্যাবে ক্যামেরাম্যান প্রবেশ কতটা যুক্তিযুক্ত? বা যেকোনও সরকারি প্রতিষ্ঠানে তারা কি এমন র‍্যান্ডম প্রবেশ করার অধিকার রাখে?

একটা ভিডিওতে, গাড়ি থেকে একটা বাচ্চাকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া থেকে শুরু করে জুনিয়র ডাক্তার যারা দিন রাত এক করে রোগীর জন্যে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছে তাদের রাগিয়ে দেয়া কি প্রমাণ করেনা তারা সস্তা জনপ্রিয়তার জন্যে কতটা নীচে নামতে পারে? তারা কতটা তাদের দায়িত্ব পালন করেছেন? তা না করে অন্যের কাজে ব্যাঘাত সৃষ্টি করে অসহায় মানুষগুলোকেই বিপদে ফেলছেন না কি?

"ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা নাই।" প্রচলিত বাক্যটি অনেককেই বলতে দেখছি। আচ্ছা প্রতিদিন কত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন, সবাই কি মারা যাচ্ছেন? কত জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন? কতজন মারা যাচ্ছে সেইসব সম্পর্কে আমাদের বিজ্ঞ সাংবাদিকদের কিছু বলতে শুনেছেন? শুনবেন না। কারণ, তারা নাটক সাজাতে ব্যস্ত।

"ডাক্তাররাই তো মারা যাচ্ছে, ওরা আর কি চিকিৎসা দিবে?" মনোভাবটা কি একটু উদার করা যায় না? উপরে যে উদাহরণ দিলাম, আমাদের জুনিয়র কলিগদের, তাতে কি মনে হয় না ডাক্তাররা কতটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকে। নিজের যত্ন নেয়ার সময় কই?

কর্তব্যরত অবস্থা কোন পুলিশ বা আর্মি অফিসার মারা গেলে আপনারা তাদের জাতীয় হিরো বানিয়ে ফেলেন, তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়িয়ে পরেন। অথচ কাউকে বলতে শুনিনি, কি শিখলো, বন্দুক চালাইতে জানেনা? একটা ডাক্তার কর্তব্য পালন করতে গিয়ে মারা যাচ্ছে, ডাক্তাররা কি এমন জাতীয় শত্রু হয়ে গেলো যে, তাদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানো বা তাদের জাতীয় বীর না ভাবেন, মিনিমাম সহানুভূতিটুকুও তো দিতে পারেন তাই না?

সারাক্ষণ নেগেটিভ সাংবাদিকতা না করে অন্তত কিছু পজিটিভ সাংবাদিকতা করে নিজেদের পেশাটাকেও তো সম্মানিত করা যায় তাই না? আপনাদের সবসময় সবার সম্পর্কে নেগেটিভ অবস্থান আপনাদের সম্পর্কেই কি জনমনে নেগেটিভ ধারনার জন্ম দেয় না? কারণ সাধারণ মানুষ ডাক্তারদের ভালবাসে, বিশ্বাস করবেন কি বেশিরভাগ মানুষ ডাক্তারদের ভালবাসে?

কিছু মানুষ যারা আপনাদের নেগেটিভ সংবাদে উৎসাহিত হয়ে ছেলেধরা সন্দেহে এক অসহায় মা কে পিটিয়ে মারে, এরাই বাচ্চাদের রেপ করে, এরাই ডাক্তার পিটায়। অন্যায়কারীদের গলার জোর বেশি হওয়ায়, এদের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভেবে আপনারা তাদের জন্যে মিথ্যা নিউজ বানিয়ে বার বার পরিবেশন করে আসলে কি এই সংকট মুহুর্তে আপনাদের পেশাকেই কলংকিত করছেন না?
__________________________

ডা. মিথিলা ফেরদৌস। সুলেখক। ঢাকা।

আপনার মতামত দিন:


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়