Desk

Published:
2022-09-14 09:26:00 BdST

বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল : স্বাস্থ্যখাতের নতুন সূর্য


লেখক : অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল  ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

 

লে অধ্যাপক ডা. মামুন আল মাহতাব স্বপ্নীল

 ডিভিশন প্রধান, ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

___________________

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল- একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল। হাসপাতালটি উদ্বোধন হচ্ছে আজ ১৪ সেপ্টেম্বর। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের উদ্বোধনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আশা, উৎসাহ-উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। মানুষের বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করছি। এই উৎসাহ-উদ্দীপনা বা প্রতিক্রিয়া অত্যন্ত যৌক্তিক। হাসপাতালটির নির্মাণ ব্যয় তেরশ কোটি টাকার বেশি। বর্তমান সরকারের উন্নয়ন পলিসির দিকে তাকালে হয়তো এই অর্থ খুব বেশি নয়। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়েরও বড়-বড় একাধিক প্রকল্প আছে। বিভিন্ন মেডিকেল কলেজগুলোতে ইউনিট সংযোজিত হচ্ছে। আমাদের বিরাট করোনা ভ্যাকসিন যজ্ঞ পরিচালিত হয়েছে, যেখানে ৪০ হাজার কোটিরও বেশি টাকা খরচ হয়েছে। সবই নিঃসন্দেহে এই প্রজেক্টের চেয়ে অনেক বড়। তবুও কেন সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল নিয়ে সকলের এতো আগ্রহ? উদ্দীপনা। উৎসব-উৎসব একটা ভাব বিরাজ করছে? এতো কথাবার্তা? কারণ এটি ১৩’শ কোটি টাকার একটা অবকাঠামোর চেয়ে এর তাৎপর্য অনেক বেশি। কেননা এই হাসপাতালই হতে যাচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্যখাতকে অন্য একটি উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার প্রথম সোপান।

যদি বলি, আমাদের স্বাস্থ্যখাতের গেম চেঞ্জার হবে এই বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল, তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না। কারণ এই প্রথম আমরা এমন একটি হাসপাতাল নির্মাণ করেছি সরকারি খাতে, যা পাঁচতারকা লেভেলের। আমাদের মানুষ কেন চিকিৎসার জন্য বিদেশে চলে যান? অনেকে বিদেশে যান, তাদের সেই স্বাচ্ছন্দ আছে। তারা বিশ্বাস করেন, দেশেও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা আছে। কিন্তু এখানে নার্সিং ভালো হয় না। এখানকার হাসপাতালগুলো অতো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন নয়। বলে থাকেন, সিঙ্গাপুর, ভারত বা অন্য কোনো দেশে তমুক সেবা পেয়েছিলাম, যা এখানে পাওয়া যায় না। সরকার সাহস করেছে স্বাস্থ্য খাতকে একটি উন্নত পর্যায়ে নিয়ে যাবে।

বিএসএমএমইউতে এমন সব চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, যা এখন দেশে সব জায়গা পাওয়া যায় না। নতুন হাসপাতালটি বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্ট করা হবে, যা আমার জানা মতে, সিএমএইচ ছাড়া কোথাও হচ্ছে না। যদিও একাধিক সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে শুরু হয়েছিলো, কোভিডের সময় থেমে গেছে। কিডনি ট্রান্সপ্লান্ট করা হবে, যা সরকারি পর্যায়ে সীমিত পরিসরে বাংলাদেশে হচ্ছে। আরও বড় পরিসরে হওয়া উচিত ছিলো। এখানে জিন থেরাপি হবে। বিএসএমএমইউতে আমরা স্টেম সেল থেরাপি করছি। এটি ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি বিভাগে করছি। এই চর্চাকেই পরবর্তী ধাপে নিয়ে যাওয়া হবে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে।


সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে লিভার ট্রান্সপ্ল্যানটেশনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। যা দেশে একাধিকবার শুরু করার পর থমকে যেতে হয়েছিলো। সেই কাজটি এখানে করা হবে। হাসপাতালটি যে কেবল মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রদান করবে তা নয়। এখানে যারা কাজ করবেন, তারা বিদেশ থেকে প্রশিক্ষিত হয়ে আসবেন। এখানে পাশ্চাত্যের উন্নত প্রযুক্তি নিয়ে এসে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হবে রোগীদের।

আমরা জানি, দেশের চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের কেউ-কেউ আছেন, যারা হয় ভারতবর্ষ অথবা ইউকে-আমেরিকা থেকে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। আমাদের এখানে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে প্রশিক্ষিত হয়ে ফিরে আসবেন। দক্ষিণ কোরিয়া-জাপানের ভিন্ন ক্যাটাগরির হেলথ্ কেয়ার করে থাকে। আমরা একটি উন্নত হেলথ কেয়ারের সঙ্গে পরিচিত হতে যাচ্ছি। ওখান থেকে যারা প্রশিক্ষিত হয়ে এই হাসপাতালে কাজ করবেন, তারা আমাদের দেশে নতুন ধারা বা নতুন ঘরানার স্বাস্থ্যসেবা ইন্ট্রোডিউস করবেন বলে আমরা আশা করছি। সব দিক বিবেচনায়, বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল একটি পাঁচতারকা মানের হাসপাতাল। যেখানে সব সেবা প্রদান করা হবে, সরকারি খাতে। যা আগে কখনো সরকারি ব্যবস্থাপনায় করা যেতো না।
সরকারি চিকিৎসকরা এখন যেভাবে পে-স্কেলে বেতন পান, সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের চিকিৎসকদের বেটার পে-স্কেল দেওয়া হবে। যাতে তারা ধীরে-ধীরে হাসপাতালমুখী হন। আমাদের যে প্রাতিষ্ঠানিক প্র্যাক্টিসের কথা বলা হচ্ছে, অনেকেই সেটা করেননি অথবা আগ্রহী নন। হয়তো সেই চিকিৎসকের বিকল্পও নেই। কিন্তু বিশ্বের অনেক দেশে প্রাতিষ্ঠানিক প্র্যাকটিস আছে, আমাদের এখানেও একটি সুন্দর পাইলট প্রজেক্ট হয়ে যাবে। বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল ঘিরে যেভাবে স্বপ্ন দেখা হয়েছে, সেভাবে যদি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সত্যিকার অর্থে আমাদের স্বাস্থ্যখাতের গেম চেঞ্জার হবে। এই মডেল যদি সফল হয়, তাহলে আমি নিশ্চিত সরকার আরও অসংখ্য হাসপাতাল নির্মাণে উদ্যোগী হবে।

বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল দেশের বাইরে বাংলাদেশের রোগী যাওয়া বন্ধ করবে। কারণ আমরা গর্ব করে বলি, ভারতের দিকে তাকান, সেদেশের কতোজন মানুষ এইমস-এ, পিজিআই চন্ডিগড় অর্থাৎ সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য যায়? ভারতের স্বাস্থ্যখাতের যে উন্মেষ, বিকাশ বা উন্নতি তা হচ্ছে বেসরকারি খাতের হাত ধরে। আর বাংলাদেশের যা কিছু হয়েছে, তা সরকারি খাতের হাসপাতালগুলোর মাধ্যমে। বেসরকারি হাসপাতালের নামকরা চিকিৎসকেরাও সরকারের সৃষ্টি। অর্থাৎ এ দেশে সরকারই পারে স্বাস্থ্যখাতকে একটি উন্নত লেভেলে নিয়ে যেতে। সরকারই কোভিড মোকাবেলা করেছে। ৭০ শতাংশ মানুষ বিনামূল্যে করোনা ভ্যাকসিন প্রদান করেছে। সরকারি হাসপাতালের হাত ধরেই দেশের স্বাস্থ্যখাত উন্নত পর্যায়ে যাবে। বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের মাধ্যমে সেটি শুরু হচ্ছে বলে আমি বিশ্বাস করি।

#

আপনার মতামত দিন:


বিএসএমএমইউ এর জনপ্রিয়