ডা শাহাদাত হোসেন

Published:
2022-09-14 09:03:17 BdST

বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজ হাসপাতাল যেভাবে বিশ্বমানের সুপার সেবা দেবে জানালেন উপাচার্য


বিএসএমএমইউ সুপার স্পেশালাইজ হাসপাতাল:অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ, উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

 

অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ, উপাচার্য,

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

______________________

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নামে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়। তদানিন্তন আইপিজিএমআর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সানুগ্রহ ও পৃষ্ঠপোষকতায় দেশের প্রধানতম চিকিৎসাসেবাকেন্দ্র হিসেবে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সুনাম অর্জন করে। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যকন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার দায়িত্ব নেবার পর আইপিজিএমআরকে ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। আবার তাঁরই হাত ধরে দেশের রোগীরা যাতে দেশেই বিশ্বমানের চিকিৎসাসেবা পান তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে যাত্রা শুরু করলো আন্তর্জাতিক মানের সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। ৭৫০ বেডের সেন্টার বেইজড হাসপাতাল চালু হওয়ায় দেশের চিকিৎসাখাতে নতুন যুগের সূচনা হলো।

চিকিৎসা ক্ষেত্রে নতুন নতুন গবেষণা ও উদ্ভাবনের সাথে পরিচিত হতে এবং তা জনগণের স্বাস্থ্য সেবায় প্রয়োগ ঘটাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে গড়ে তোলা হয়েছে সেন্টার অফ এক্সিলেন্স হিসেবে। দেশে উন্নততর চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরণ, চিকিৎসকদের জন্য অত্যাধুনিক পোস্ট গ্রাজুয়েট ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা, বায়োমেডিক্যাল রিসার্চ, জিন থেরাপি, রোবটিক সার্জারি এবং জনগণের জন্য উচ্চমানসম্পন্ন স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছে। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালে হৃদরোগ, কিডনি রোগ, লিভার, গল ব্লাডার ও প্যানক্রিয়েটিক, অরগান ট্রান্সপ্লান্ট, ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনিরোগ, নিউরোসার্জারিসহ বিভিন্ন জটিল রোগের বিশেষায়িত চিকিৎসার ব্যবস্থা বাংলাদেশে চিকিৎসাক্ষেত্রে একটি নতুন মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে।

 

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন চালু হচ্ছে দেশের প্রথম সেন্টার ভিত্তিক ৭৫০ শয্যার সুপার স্পেশাইলজড হাসপাতাল। বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে নির্মিত হচ্ছে এই সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল। ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সিলেন্সে পরিণত করার উদ্যোগ নেন। সেই লক্ষ্যে ২০১২ সালে হাসপাতাল সংলগ্ন পাশের প্রায় ১২ বিঘা জমি অধিগ্রহণ করেন। পরে ২০১৬ সালের ২ ফেব্রুয়ারি জনগণের জন্য বিশেষায়িত সেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে ১ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল স্থাপনের প্রকল্প একনেকে অনুমোদন করা হয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের ইডিসিএফের অর্থায়নে ১ হাজার ৪৭ কোটি টাকা ঋণ সহযোগিতার মাধ্যমে প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বরে ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

 


হাসপাতালটির কার্যক্রম চলবে ৬টি বিশেষায়িত সেন্টারের মাধ্যমে। কার্যক্রম চালু হলে এসব সেন্টারে ২ বছরের জন্য নিয়োজিত থাকবেন ৬ জন কোরিয়ান ইঞ্জিনিয়ার ও ৫০ জন কোরিয়ান বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক। এদেশীয় জনবলকে প্রশিক্ষিত করতে তারা ভূমিকা রাখবেন। এছাড়া সেবাখাতে বিশে^র বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা আমাদের দেশীয় জনশক্তিকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে এই হাসপাতালে নিয়োগ করা যায় কিনা সে বিষয়েও পরিকল্পনা চলছে।

বিশেষায়িত সব ধরনের সেবা নিয়ে বাংলাদেশে এটিই প্রথম সেন্টার ভিত্তিক হাসপাতাল। দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের অর্থায়নে হাসপাতালটির ২টি বেসমেন্টসহ ১৩তলা ভবনে থাকবে বিশ্বমানের সব ধরনের সেবা কার্যক্রম। হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগে থাকবে ১৪টি অত্যাধুনিক অপারেশন থিয়েটার, ১০০ শয্যার আইসিইউ, জরুরি বিভাগে থাকবে ১শ’টি শয্যা, ভিভিআইপি কেবিন ৬টি, ভিআইপি কেবিন ২২টি এবং ডিলাক্স শয্যা থাকবে ২৫টি। সেন্টার ভিত্তিক প্রতিটি ওয়ার্ডে স্থাপন করা হচ্ছে ৮টি করে শয্যা। গুণগতমান বজায় রাখতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে এনে ফার্নিচার ও সরঞ্জামগুলো স্থাপনও করা হয়েছে। হাসপাতালটিতে থাকছে নিউম্যাটিক টিউব যার মাধ্যমে রক্ত সংগ্রহের পর অটোমেটিক্যালি নির্দেশিত বিভাগে চলে যাবে। যা সম্পূর্ণ সংক্রিয়ভাবে হবে।

নবনির্মিত হাসপাতাল ভবনের প্রথম পর্যায়ে থাকবে স্পেশালাইজড অটিজম সেন্টারসহ মেটারনাল অ্যান্ড চাইল্ড হেলথ কেয়ার সেন্টার, ইমার্জেন্সি মেডিকেল কেয়ার সেন্টার, হেপাটোবিলিয়ারি ও গ্যাস্ট্রোঅ্যান্টারোলজি সেন্টার, কার্ডিও ও সেরিব্রো ভাস্কুলার সেন্টার এবং কিডনি সেন্টার। দ্বিতীয় পর্যায়ে থাকবে রেসপিরেটরি মেডিসিন সেন্টার, জেনারেল সার্জারি সেন্টার, অপথালমোলজি, ডেন্টিস্ট্রি, ডার্মাটোলজি সেন্টার এবং ফিজিক্যাল মেডিসিন বা রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার। চিকিৎসক, নার্স ও কর্মকর্তাদের জন্য রাখা হচ্ছে বিশ্বমানের প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা ও মৌলিক গবেষণার জন্য আলাদা সেন্টার। রোগীবান্ধব এই হাসপাতালে থাকবে সানকেন গার্ডেন, রুফটপ গার্ডেন ও বিভিন্ন পরিবেশবান্ধব সুযোগ-সুবিধা। থাকবে উন্নতমানের আধুনিক ব্যবস্থাপনার বহির্বিভাগ ও ইনফো ডেস্ক ও ডিজিটাল ইনফরমেশন সেন্টার।

এই স্পেশালাইজড হাসপাতালে সেবা নিতে এসে গ্রাহককে অন্য কোনো জায়গায় যেতে হবে না। কারণ হাসপাতালের ভিতরেই থাকবে একটি কনভেনিয়েন্স শপ, ব্যাংকিং সুবিধা, ফার্মেসি, ৩৫০ সিট বিশিষ্ট উন্নত কিচেন যার আওতায় ৩টি ক্যাফেটেরিয়া থাকবে, ৯০ সিট বিশিষ্ট ডক্টরস ক্যাফেটেরিয়া, উন্নত লন্ড্রি হাউসসহ কার পার্কিংয়ের বিশাল সুবিধা। এখানে ১টি ভিভিআইপি এলিভেটর সহ ১৬টি এলিভেটর ও ১টি এসক্যালেটর, অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থাপনা, হিটিং, ভেনটিলেশন ও এয়ার কন্ডিশনিং সিস্টেম সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে কেন্দ্রীয় কন্ট্রোল রুম থেকে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নিয়ন্ত্রণ করা হবে।

বঙ্গবন্ধু স্পেশালাইজড হাসপাতালের কার্যপরিধি-কার্যক্রম বিবেচনা করে তথ্য ও প্রযুক্তি ভিত্তিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে এই হাসপাতালে থাকবে এক মেগা হসপিটাল ইনফরমেশন সিস্টেম (এইচআইএস), যার আওতায় অন্তর্ভুক্ত কাটিং এজ ইনফরমেশন সিস্টেম যেমন PACS-Picture Archiving and Communication system, OCS-Order Communication system, Advanced EMR-Electronic Medical Record, App based interactive platform integrated appointment management (App Based) সহ নানাবিধ আইটি সিস্টেম। এই অটোমেটেড হসপিটাল ইনফরমেশন সিস্টেমের আওতায় রোগীদের ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ইভিডেন্স বেইজড মেডিসিন সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের মানুষ যাতে দেশেই সবধরণের উন্নত চিকিৎসাসেবা পান। রোগীদের যাতে চিকিৎসাসেবা নিতে বিদেশ যেতে না হয়। সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল চালু হওয়ায় সেই লক্ষ্য অনেকটাই পূরণ হবে বলে আমি বিশ্বাস করি। এতে করে রোগীদের বিদেশে যাওয়ার ভোগান্তি যেমন কমবে একইভাবে দেশের মানুষ ও দেশ উভয়ই অর্থনৈতিক দিক থেকে লাভবান হবেন।

বর্তমান প্রশাসন দায়িত্বভার গ্রহণের পর চিকিৎসাসেবা ও চিকিৎসা শিক্ষার সাথে সাথে অতীতের যেকোনো সময়ের চাইতে গবেষণা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের জেনোম সিকোয়েন্সিং করাসহ এই ভাইরাসের টিকার কার্যকারিতা বিষয়ক গবেষণা কার্যক্রম চলমান রয়েছে এবং নিয়মিতভাবে এই গবেষণা কার্যক্রমের ফলাফল প্রকাশ করা হচ্ছে। কারণ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে উচ্চতর চিকিৎসা শিক্ষা, উন্নতমানের চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি গবেষণার মাধ্যমে উদ্ভাবনী চিকিৎসা পদ্ধতি ও সেবা চালু এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের সর্বশেষ অগ্রগতি সমূহ সংযোজনের গুরু দায়িত্ব রয়েছে। সে কারণেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রত্যাশা অনুযায়ী বর্তমান প্রশাসন গবেষণা কার্যক্রমকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে বাজেট ৪ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। সর্বাধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির প্রয়োজনীয় সকল বিষয়েরই গুরুত্বপূর্ণ সংযোজিত সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল সে লক্ষ্য পূরণেও বিরাট ভূমিকা রাখবে।

চিকিৎসা খাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা ও প্রচেষ্টা প্রসংশনীয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের এই অগ্রযাত্রা বাংলাদেশকে স্বাস্থ্য খাতে আরো একধাপ এগিয়ে নিবে এবং রোগী সেবায় অসামান্য অবদান রাখবে।

 

লেখক: অধ্যাপক ডা. মো. শারফুদ্দিন আহমেদ, উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

আপনার মতামত দিন:


বিএসএমএমইউ এর জনপ্রিয়