|

মোহিনী মালদ্বীপ এখন বই হয়ে বইমেলায়


Published: 2017-02-23 10:03:00 BdST, Updated: 2017-10-22 05:18:35 BdST

 


মনে আছে মোহনীয় সেই লেখা। ডাক্তার প্রতিদিনে ধারা বাহিক প্রকাশ হয়েছিল। মোহিনী মালদ্বীপ এখন ঢাকা বইমেলায়। বেস্ট সেলার তালিকায় আছে বইটি । সবার জন্যে মোহিনী মালদ্বীপের মোহনীয় অংশ নিয়ে লিখেছেন স্বয়ং লেখক
ডা. মোরশেদ হাসান । 

 

 

 

ডা. মোরশেদ হাসান
__________________________


দ্বীপের মানুষকে তাদের ইতিহাস সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করলে মাথা নেড়ে উত্তর দেয়, নেঙ্গে।
'নেঙ্গে' অর্থ জানি না; আর 'এঙ্গে' অর্থ জানি।
বড় হতাশ হলাম এদের কথা শুনে। একশ বছর আগের ইতিহাসও এরা জানে না। আমার প্রশ্ন না বুঝে বলে বসে, হুরিয়া মিহু মারু গিয়া।
হুরিয়া মানে সব, মিহু মানে মানুষ, আর মারু গিয়া তো বোঝাই যাচ্ছে মরে গেছে।

-দ্বীপে একশ বছর আগের কোনো ঘর নেই?
-থাকবে কী করে? এখন তো সব পাকা ঘর।
একতলা, দোতলা, তিনতলা বাড়িও আছে। এরা ইটকে বলে ‘গা’। এখন এই ‘গা’ দিয়ে বাড়ি তৈরি করা হয়। গা বানানো হয় সাগর সৈকতের বালিকে ছাঁচে ফেলে শক্ত রূপ দিয়ে। তারপর একের পর এক ‘গা’ বসিয়ে সিমেন্ট দিয়ে যথারীতি পাকা বাড়ি তৈরি করা হয়। ভালো কথা এরা বেশিরভাগ মানুষ নিজের বাড়ি নিজেই বানাতে পারে। আসলে বাধ্য হয়েই এরা বেশিরভাগ কাজ পারে। বাড়ি বানাতে পারে, ইলেকট্রিসিটির কাজসহ দৈনন্দিন জীবনের কাজগুলো তারা শিখে নেয়। বুঝতেই পারেন এই দ্বীপে একটা চুল কাটার সেলুন নেই। একজন আরেকজনের চুল কেটে দেয়। যা-ই হোক ত্রিশ চল্লিশ বছর আগে বাড়ি বানানো হত ছোট ছোট প্রবাল পাথরের টুকরোকে সাগরের প্রবাল বা ঝিনুক থেকে তৈরি এক ধরনের সিমেন্ট জাতীয় আঠালো পদার্থ দিয়ে জোড়া দিয়ে। আরও আগে বাড়ি বানাতো কাঠ ও নারকেল পাতার ছাউনি দিয়ে --যেসবের কোনো অবশিষ্টাংশ এখন আর নেই। রান্নাবান্না হতো লতা পাতা ও লাকড়ি দিয়ে। এখন সেখানে গ্যাসের সিলিন্ডারে রান্না হয়।

ইতিহাস প্রসঙ্গে বলছিলাম। সাধারণ মানুষ ইতিহাস সম্পর্কে বিশেষ কিছু না জানলেও ইতিহাসবিদরা ঠিকই বের করে নিয়েছেন। তিন হাজার বছর আগেও এখানে মানুষের বসতি ছিল। তবে তারা কারা সে সম্পর্কে সুস্পষ্ট কিছু জানা যায়নি। প্রত্নতাত্ত্বিকরা ধারণা করেন তারা সূর্য দেবতার উপাসনা করত। প্রাচীন আমলের কিছু স্টোনের শরীরে সূর্যের খোদাই করা ছবি এখানের কিছু দ্বীপে পাওয়া যায়।
এখানে মানুষ কেন বসতি করবে বা আসবে? বসতি কেন করবে তা জানি না, মালদ্বীপের কদর ছিল বিশেষ একটি কারণে সারা বিশ্বে। সেটা কি ছিল বলতে পারবেন?

সেটা হচ্ছে টাকা। জি, ছাপানো টাকা বা পাঞ্চ মুদ্রারও আগে বিশ্বের প্রথম টাকা ছিল কড়ি। কড়ি কী বুঝতে পারছেন তো! সাগরে যে কড়ি পাওয়া যায় সেই কড়ি। আর নাম দিয়েই তো বোঝা যাচ্ছে। টাকা-কড়ি; আর সাহিত্যানুরাগী হলে সুসাহিত্যিক বিমল মিত্রের "কড়ি দিয়ে কিনলাম" পড়েছেন তো অবশ্যই। ইংরেজিতে বলা হয় Cowry shell।
জি, কড়ি দিয়েই সেই আমলে সব কিছু কিনতে হত। আর এই মালদ্বীপ সংলগ্ন ভারত মহাসাগরের সৈকতে পাওয়া যেত উন্নত মানের কড়ি। সেই কড়ির চাহিদা ছিল বিশ্বব্যাপী। মালদ্বীপের কড়ির প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে ইউরোপে, আফ্রিকায়, চীন ও আরব দেশগুলোতে। এক ব্যাগ কড়ি দিয়ে তখন এক বস্তা বেঙ্গল চাউল পাওয়া যেত। ভাত! সে তো আবহমান কাল থেকে এ অঞ্চলের প্রধান খাদ্য। আর বাংলার ধানের সুখ্যাতি আমাদের বহুকাল আগে থেকেই।

সুতরাং বুঝতেই পারছেন আমাদের কল্পনার মনশ্চক্ষুতে যে সাত পালওয়ালা জাহাজের ছবি ভাসে সেসব জাহাজ এসে ভিড়ত মালদ্বীপের সমুদ্র উপকূলে। শুধু কি কড়ির জন্য? সাথে আরও কিছু পেলে ক্ষতি কী! পালতোলা জাহাজ ঝড়ের মুখে পড়লে ইংলিশ মুভিতে দেখেছেন নিশ্চয়ই নাবিক, খালাসীরা বিশাল বিশাল ঢেউয়ের মুখে জাহাজের মোটা মোটা দড়ি দড়া টেনে জাহাজের গতি পরিবর্তন করার চেষ্টা করত। সেই শক্ত দড়ি কী দিয়ে তৈরি হত? সেই দড়ি তৈরি হত নারকেলের ছোবড়া দিয়ে যাকে ইংরেজিতে বলে Coconut coir। দিবেহিরা নারকেলকে বলে কুরুম্বা। এই কুরুম্বা বা উন্নত মানের নারকেলের ছোবড়া সংগ্রহ করা হত মালদ্বীপের দ্বীপগুলো হতে। এছাড়া ছিল কচ্ছপের রং বেরঙের সুদৃশ্য খোল। আর একটি জিনিস ছিল অ্যাম্বারগ্রিস (Ambergris) নামক সুগন্ধি। এই এলাকায় একটি বিশেষ ধরনের তিমি মাছ পাওয়া যেত। এ তিমি মাঝে মাঝে ঢোক গিলে বা বমি করে সাগরে তার পিত্তথলি থেকে পিত্ত বের করে দিত। তিমি মাছের মুখ থেকে বের হওয়া জিনিস বুঝতেই পারছেন সেটিও হত বিশাল আকৃতির। এটি সাগরে ভেসে থাকত। এর সুগন্ধ ছিল মৃগনাভীর সমজাতীয়। 'Ambergris' শব্দটি এসেছে আরবি 'অ্যাংবার' থেকে -- মানে হচ্ছে সুগন্ধি বা পারফিউম। আরবি এই অ্যাম্বারগ্রিস সংগ্রহের লোভেও জাহাজীরা ছুটে আসত।


আচ্ছা জাহাজী জীবন কেমন? সেটা যে একবার জাহাজে চাকরি করেছে সেই জানে। শহীদুল্লাহ কায়সারের অমর উপন্যাস ‘সারেং বৌ’ উপন্যাসটি পড়েছেন বা আবদুল্লাহ আল মামুনের ফারুক, কবরী অভিনীত সিনেমায় নিশ্চয়ই দেখেছেন সারেঙের মন বাড়িতে দীর্ঘদিন টেকে না। ঝঞ্ঝাবিক্ষুদ্ধ সাগর তাকে কয়েকদিন পরপর টান দেয়। এ এক আশ্চর্য রোমাঞ্চকর জীবন। পদে পদে বিপদ আর মৃত্যুর হাতছানি, তবু তাকে সাগর ডাকে – আয় আয় আয়। সেই হাতছানির প্রবল প্রলোভন কাটানো বড্ড মুশকিল। এভাবেই প্রাচীনকালে এখানে এসেছে আরবরা, এসেছে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের কালো মানুষেরা। আর সবচেয়ে কাছের প্রতিবেশী ৭০০ কিমি দূরের সিংহলী বা শ্রীলংকানরা তো আছেই। আর আছে অবশ্যাম্ভাবীভাবে ভারতের দাক্ষিণাত্যের মানুষ। বিশেষ করে কন্যাকুমারী – যেখানে আরব সাগর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর মিলিত হয়েছে এক আকুল তৃষ্ণায় একই মোহনায়। সেই কন্যাকুমারী সংলগ্ন কেরালা ও তামিলনাড়ুর মানুষ এখানে এসেছে। এখানকার মানুষের চেহারায় যেমন ভারত বা শ্রীলংকার মানুষদের অবয়ব পাওয়া যায় আবার চুল ও মুখের গড়নে আফ্রিকার মানুষদের অবয়বের সাদৃশ্য মেলে। গাত্রবর্ণ কালো; আবার ফরসা মানুষও আছে যা আরব পূর্বপুরুষদের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।

_____________________________

ডা. মোরশেদ হাসান
সুলেখক ।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।