|

ভ্রমণ‘ভদ্র লোকেরা স্বর্গে যায়, আর খারাপ লোকেরা পাতায়ায়’


Published: 2017-08-09 19:37:39 BdST, Updated: 2017-12-18 20:46:54 BdST


 

 

আনন্দের শহর থাইল্যান্ডের পাতায়া । । সম্প্রতি এই শহরটি নিয়ে একটি প্রতিবেদন করেছে ব্রিটিশ পত্রিকা দ্য মিরর।

 


মিররের সেই রিপোর্ট ভাষান্তর করেছেন ডা. সালাউদ্দিন সুমন।


একসময় পাতায়া নামের জায়গাটি ছিল থাইল্যান্ড উপসাগরের একটি জেলেপল্লি। সাগরে অল্প কয়েকটি নৌকা এবং তীরে গ্রামবাসীর থাকার জন্য কিছু কুঁড়েঘর বাদে সেখানে আর কিছুই ছিল না।

১৯৫৯ সালের ২৯ জুন নাখন রাচাসিমার সামরিক ঘাঁটিতে থাকা ৫০০ সদস্যের একটি মার্কিন সেনাদল এক সপ্তাহের বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য পাতায়ায় যায়। ওই সেনারা সৈকতের দক্ষিণাঞ্চলের প্রান্তে স্থানীয় লোকদের কাছ থেকে কয়েকটি বাড়ি ভাড়া নেয়। তখন থেকেই ঘুমন্ত জেলেপল্লির জন্য প্যান্ডোরার বাক্স খুলে যায়। মার্কিন সেনাদের মধ্যে পাতায়ার সৌন্দর্যের খবর ছড়িয়ে পড়ে এবং এটি কংক্রিটের নগর ব্যাংককের পরিবর্তে জনপ্রিয় গন্তব্যে পরিণত হয়।

বর্তমান ইউ-তাপাও বিমানবন্দর নামে পরিচিত পাতায়ার পাশের বান সাত্তাহি বিমানঘাঁটিতে যখন বিপুল পরিমাণে সেনারা আসতে শুরু করে, তখন থেকেই বাড়তে থাকে পাতায়ার জাঁকজমক। এর প্রায় অর্ধশতাব্দী পর ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া সেনা থেকে শুরু করে যৌন পর্যটক এবং থাইল্যান্ডের রেড লাইট অঞ্চলের বাসিন্দাদের গন্তব্যে পরিণত হয় পাতায়া।

ভিয়েতনাম যুদ্ধ চলাকালে থাইল্যান্ডে বিশ্রাম ও বিনোদনের সুবিধা সৃষ্টি করতে থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ১৯৬৪ সালে পাতায়া সৈকতের অদূরে প্রথম মার্কিন ঘাঁটি ইউ-তাপাওয়ে পৌঁছায় জিআইএস। তখন থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত প্রতিবছর প্রায় সাত লাখ আন্তর্জাতিক সেনাকে এক সপ্তাহের বিশ্রাম ও বিনোদনের জন্য থাইল্যান্ডে পাঠানো হয়।

থাইল্যান্ডের সমাজে জীবিকার জন্য দেহব্যবসা নতুন কিছু নয়। ১৬৮০ সালে আয়ুথাইয়া যুগ থেকেই সেখানে পতিতাবৃত্তি বৈধ। এমনকি সেখানে সরকার পরিচালিত যৌনপল্লি ছিল। তবে এই দেহব্যবসা কেবল ব্যাংকক অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে যখন থেকে আন্তর্জাতিক সেনারা আসতে শুরু করেন, তখন থেকেই যৌনকর্মীদের নতুন গন্তব্যে পরিণত হয় পাতায়া। যৌনকর্মীরা নতুন খদ্দেরদের সঙ্গে মানিয়ে নিতে শুরু করেন এবং তারা মুদ্রার বিনিময় হার সম্পর্কে জানতে পারেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের রক অ্যান্ড রোল ধারার সংগীত ও অশ্লীল শব্দের সঙ্গে পরিচিত হন। যুদ্ধে যাওয়ার সপ্তাহ খানেক আগে বিনোদনের জন্য ছুটে আসা তরুণ সেনাদের মনোরঞ্জন করতে থাকেন যৌনকর্মীরা।

 

 

 

 

 

১৯৭৫ সালে উত্তর ভিয়েতনামিরা যখন যুদ্ধে জিতে যায়, তখন পাতায়াতে সাময়িক মন্দাভাব চলে আসে। সব সেনা সেখান থেকে চলে যায়। অনেক বার ও ক্লাব বন্ধ হয়ে যায়। অনেক যৌনকর্মী আগাম অবসরে যেতে বাধ্য হন। তবে ধীরে ধীরে কাছের এবং দূরের দর্শনার্থীদের স্রোত আসা শুরু হলে আবার উজ্জীবিত হয় থাইল্যান্ড। ১৯৭৮ সালে পাতায়া শহরের নামকরণ করা হয়। বৃহত্তর পরিসরে শহরটিতে পর্যটকদের জন্য বাজার তৈরি হতে থাকে।

ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর অনেক সেনা কর্মকর্তা পাতায়াতেই থেকে যান। তারা থাই নারীদের বিয়ে করেন এবং বার ও রেস্টুরেন্টের ব্যবসা চালু করেন। আজকের দিনেও প্রতিবছর কয়েক লাখ সেনা কর্মকর্তা কোবরা গোল্ড নামে পরিচিত থাই-মার্কিন সামরিক মহড়ায় অংশ নিতে পাতায়া আসেন।

নিঃসঙ্গ বয়স্ক মার্কিন নাগরিক ম্যাট। ক্যালিফোর্নিয়ায় বাড়ি ফিরে গিয়ে বিয়ে করার জন্য সুন্দরী কোনো তরুণীকে খুঁজে নেয়া তার পক্ষে অসম্ভব। তবে ৬০ বছর বয়সী ম্যাট তার সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দেননি। পশ্চিমা নারী বিয়ে করার প্রচেষ্টা তিন দফায় ব্যর্থ হওয়ার পর তিনি শ্বেতাঙ্গ মেয়ে খোঁজা বন্ধ করে দেন। কারণ তিনি মনে করেন, তারা ভালোবাসার যোগ্য নন। তিনি এশীয় মেয়ে খোঁজা শুরু করেন। ম্যাট বুঝতে পারেন, তার স্বপ্নপূরণের জন্য পাতায়াই একমাত্র জায়গা।

১০ বছর আগে ম্যাট পাতায়ায় আসেন। ম্যাট বলেন, ‘এখানে প্রতিদিনই ভালোবাসা পাওয়া যায়। আমি সাধারণত বছরে তিন মাসের জন্য এখানে আসি। আমি আমার কেনা সস্তা অ্যাপার্টমেন্টে থাকি। আমি আমার ভালোবাসার নীড়ে কতজনকে এনেছি, তা আপনাকে বলতে পারব না।’ তিনি আরো বলেন, ‘ভদ্র লোকেরা স্বর্গে যায়, আর খারাপ লোকেরা পাতায়ায়।’ ম্যাটের এ অভিব্যক্তি পাতায়া শহরের স্লোগান বলেই প্রতীয়মান হয়। এই স্লোগানের মধ্যে বিদ্রূপের গন্ধ থাকলেও পাতায়ায় আসা অনেক পর্যটকের মানসিকতা যে এটাই, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

 

২৮ বছর বয়সী যৌনকর্মী সুপিন। বয়স যখন ২১, তখন এক বন্ধুর পরামর্শে তিনি এখানে আসেন উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সুরিন প্রদেশ থেকে। বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর অর্থ জোগাড় করতে সুপিন বাড়ি ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। পাতায়া আসার এক বছর আগে রেস্টুরেন্টে খাবার পরিবেশকের কাজ করতে তিনি প্রথম ব্যাংককে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দৈনিক ২৮০ বাথ (থাই মুদ্রা) পেতেন। এর সঙ্গে টিপস থাকত। ওই অর্থ পুরো পরিবারের ভরণপোষণের জন্য যথেষ্ট ছিল না। কেননা, দুই সন্তান রেখে তার স্বামী চলে যাওয়ার পর সব দায়দায়িত্ব তার ঘাড়েই এসে পড়ে। সুপিনকে তার এক বন্ধু পরামর্শ দিয়ে বলেন, পাতায়াতে রোজগারপাতি বেশি। সেখানে কী কাজ করে বাড়তি আয় হবে, সে ব্যাপারে সুপিন সচেতন ছিলেন। তিনি প্রয়োজনীয় অর্থ পেতে যেকোনো কিছুই করতে প্রস্তুত ছিলেন।

৪৮ বছর বয়সী মানবাধিকারকর্মী ও জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব থানাদ্দা নিং সোয়াংনেতর যৌনকর্মী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখে পুরস্কার পেয়েছেন। আর্থিক সংকটে পড়ে তিনি কীভাবে এই পেশা বেছে নিতে বাধ্য হন, বইটিতে তার বর্ণনা দিয়েছেন।

নিং বলেন, ‘কম বয়সে অরক্ষিত শারীরিক সম্পর্কের কারণে আমি একটি বাচ্চার জন্ম দিই। বাচ্চাটিকে গড়ে তুলতে আমার অনেক টাকার দরকার হয়ে পড়ে।…এক বন্ধুর পরামর্শে পাতায়ায় এসে বারে কাজ শুরু করি। সেখানে পানীয় পরিবেশন করে মাসে আমি পাঁচ হাজার বাথ পেতাম। পরে আমি যৌনকর্মী হিসেবে কাজ শুরু করি।’ এই যৌনকর্মী আরো বলেন, এটা এমন এক পেশা, যা কারও কাছে গর্ব করে বলা যায় না। তাই তিনি বহুবার এই কাজ ছেড়ে দেয়ার চিন্তা করেছেন। তবে দিনের শেষে এ পেশাই তার পরিবারের জন্য অর্থ এনে দিয়েছে। তিনি মাঝেমধ্যে অন্য কাজ করেছেন। তবে যৌনকর্মী হিসেবে তিনি যা আয় করতেন, অন্য কাজে তার থেকে অনেক কম আয় হতো।

সকল প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।