Ameen Qudir

Published:
2019-02-26 12:14:40 BdST

এবার চলচ্চিত্রে অপপ্রচার:" চিকিৎসক রুগি বাদ দিয়ে সারাদিন গানবাজনা,রাতে মজমা বসান"


দেশা নামক চলচ্চিত্রে এই অপপ্রচার চলে। প্রধান চরিত্র করেন তারিক আনাম খান। দেশা  চলচ্চিত্র নামের মত ডাক্তারকে দেখানো হয় অদ্ভুত অবাস্তব কৌতুক চরিত্র হিসেবে। ফাইল ছবি

 

ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ
_____________________________

সম্প্রতি স্যোসাল মিডিয়ায় ভাইরাল হওয়া জাজ মিডিয়া কর্তৃক নির্মিত একটি নাট্যচিত্র দেখলাম।
নাট্যচিত্রটি দেখে যেমন ব্যাথিত হয়েছি একইভাবে তেমনি ক্রোধান্বিতও হয়েছি!

নাট্যচিত্রটিতে দেখানো হয়েছে আয়নাপুর নামক বাংলাদেশের কোন এক এলাকার স্বাস্থ্যকম্প্লেক্সের চিকিৎসক রুগি দেখা বাদ দিয়ে সারাদিন গানবাজনা করেন আর রাতে ঢোল-তবলা-ডুগডুগি নিয়ে আসর-মজমা বসান!

নাট্যচিত্রটিতে আরো দেখানো হয়েছে যে স্বাস্থ্যকম্প্লেক্সের এ্যাম্বুলেন্সটি রুগি পরিবহনের পরিবর্তে চিকিৎসকদের বউয়েরা বিভিন্ন দাওয়াতে আসাযাওয়া করতে ব্যাবহার করেন!

কি ভয়ঙ্কর সব অভিযোগ!

আমরা মনে করি এই ভিডিওচিত্রটি শুধু চিকিৎসাপেশাকেই অবজ্ঞা করেনি বরং তা এদেশের স্বাস্থ্যখাতে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যমন্ত্রনালয় এবং সর্বোপরি সরকারের সকল অর্জনকেও কটাক্ষ করেছে!!

বন্ধু তালিকায় যেসব অচিকিৎসক বন্ধুরা আছেন তাদের কাছে উদাত্ত আহ্বান রেখে বলতে চাই সারা বাংলাদেশের যে কোন একটি স্বাস্থ্যকম্প্লেক্সেও যদি এমন কোন চিকিৎসক আছে বলে আপনি মনে করেন তাহলে উপযুক্ত প্রমানসহ এই স্ট্যাটাসে কমেন্ট করুন।
কথা দিচ্ছি আমরা সমস্ত চিকিৎসক সমাজ সেই চিকিৎসকের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেবো।

আর যদি তেমন না হয় তাহলে আশা করবো চিকিৎসাপেশাকে অবজ্ঞা করে জাজ মিডিয়া কর্তৃক নির্মিত এই নাট্যচিত্রের প্রতিবাদে আপনারাও আমাদের মতো সোচ্চার হবেন।

এই চিত্রনাট্যের যে অভিযোগটার অনেকটা সত্যতা আছে সেটি হলো দেশের অধিকাংশ স্বাস্থ্যকম্প্লেক্সের এ্যাম্বুলেন্সের চেহারা দেখার সৌভাগ্য সেইসব অঞ্চলের রুগিদের কপালে জুটে না।

এর কারন অবশ্য এই নয় যে এই এ্যাম্বুলেন্সগুলো সারাবছর চিকিৎসকদের বউ ও পরিবার পরিবহনের জন্য ব্যাবহৃত হয় বরং এর কারন এই যে এইসব এ্যাম্বুলেন্সের অধিকাংশই বছরের অধিকাংশ সময়ই বিকল থাকে!

সামান্য একটা নাটবল্টু বা অতিশয় ক্ষুুদ্র যন্ত্রাংশ নষ্ট হলেও তার জন্য সরকারি টেণ্ডার আহ্বান করতে হয়!
একটা নাটবল্টু কিনতেও লালফিতার দৌড়ে টেবিলে টেবিলে ফাইল ঘুরতে ঘুরতে যতদিন সময় লাগে ততদিনে স্বাস্থ্যকম্প্লেক্সের গ্যারেজে ধুকতে ধুকতে পুরো এ্যাম্বুলেন্সটিরই জীবনীশক্তি শেষ হয়ে যায়!

নাট্যচিত্রের আরেকটি দৃশ্যে দেখা যাচ্ছে স্বাস্থ্যকম্প্লেক্সের চিকিৎসকটি চিত্রনাট্যের নায়ককে আবেগে আপ্লুত হয়ে লম্বা স্যালূট ঠুকছে!
এই দৃশ্যটির সাথে অবশ্য দ্বিমত করতে পারেনি কারন চিকিৎসকদের নতজানু ভূমিকার সাথে এটি পুরোপুরি মিলে যায়!

স্বাস্থ্য কম্প্লেক্সে কাজ করার সময় দেখেছি আমাদের উর্ধতন চিকিৎসক কর্মকর্তারা(UHFPO) পারলে থানার ওসিকেও চেয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে সালাম ঠুকে!!
ফিল্মস্টার কিংবা নেতা পাতিনেতারা তো তাদের কাছে আরো নমস্য!!

যাইহোক আসল প্রসঙ্গে আসি,
সারাদেশের সকল পেশার মানুষগুলো কেন এমন উঠেপড়ে লেগেছে ?
কেন তারা চিকিৎসাপেশার বিরুদ্ধে এমন অকৃতজ্ঞ জিঘাংসু ভূমিকায় নেমেছে ?

প্রতিদিন মাত্র নব্বই হাজার চিকিৎসক কর্তৃক আঠারো কোটি জনতার মাঝে লাখ লাখ রুগির বিমারী দূর করে তাদের জীবন বাঁচানোর লাখ লাখ গল্পগুলো না হয় বাদই দিলাম!

কয়েকবছর আগে ঘটে যাওয়া নিমতলি ট্রাজেডির শিকার অগ্নিদগ্ধ অসহায় মানুষগুলোর জীবন বাঁচাতে সীমিত সামর্থ্য নিয়ে ঝাপিয়ে পড়া চিকিৎসকদের ভূমিকার কথা এই অকৃতজ্ঞ মানুষগুলো
কেমনে ভুলে যায়!?

কয়েকবছর আগে রানাপ্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে হাজার হাজার মৃত্যুপথযাত্রী মানুষকে বাঁচাতে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে রাতদিন চব্বিশ ঘন্টা শতশত মেডিকেল শিক্ষার্থী আর চিকিৎসকের নিরলস শ্রম আর ত্যাগের গল্পগুলো এই অকৃতজ্ঞ মানুষগুলো কেমনে ভুলে যায়!?

সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডে লণ্ডভণ্ড সোহরাওয়ার্দি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শতশত ভীতসন্ত্রস্ত রুগিকে পার্শ্ববর্তী হাসপাতালের নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে মেডিকেল শিক্ষার্থী আর চিকিৎসকদের জীবনবাজি রাখা স্বেচ্ছাশ্রমকে এই অকৃতজ্ঞ মানুষগুলো কেমনে ভুলে যায়!?

এইতো দু'দিন আগে চকবাজার অগ্নিকাণ্ডের শিকার আধমরা মানুষগুলোকে বাঁচাতে চিকিৎসকরা এখনো প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
চিকিৎসকদের এই চিকিৎসাসেবা আর ভালোবাসার গল্পগুলো এই অকৃতজ্ঞ মানুষগুলো কেমনে ভুলে যায়!?
_______________________

অপপ্রচার মূলক নাট্যচিত্রের ভিডিও লিঙ্ক :

https://www.facebook.com/Atiquzzaman.Philip.Jessore/videos/10219341569756780/

https://www.facebook.com/Atiquzzaman.Philip.Jessore/videos/10219341569756780/

_________________________

শুধু কি এইসব গল্প ?
এই গল্পগুলোর বাইরে আরো হাজারো গল্প আছে!
শুধু এইদেশের মানুষের জন্যই নয়, এইদেশটার স্বাধীকার স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র অর্জনেও এই চিকিৎসকদের হাজারো ত্যাগ আর সাহসিকতার হাজারো গল্প আছে!

সেই বায়ান্ন থেকে শুরু করে উনসত্তর একাত্তর পেরিয়ে নব্বই!
কোনটাতে চিকিৎসকদের ভূমিকা নেই!?

বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনে আমরা চিকিৎসকরা ছিলাম!
উনসত্তরের গণ অভূৎথানে আমরা চিকিৎসকরা ছিলাম!
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে আমরা চিকিৎসকরা ছিলাম!
নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধি আন্দোলনে আমরা চিকিৎসকরা ছিলাম!

প্রতিটা আন্দোলনেই এদেশের চিকিৎসকদের অগ্রনী ভূমিকা ছিলো এবং আজও আছে।
একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে অপরাপর পেশাজীবীর মধ্যে শিক্ষকদের পরেই চিকিৎসক পেশাজীবীদের শহীদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী!

নব্বই'র শহীদ শামসুল আলম মিলনও পেশায় একজন চিকিৎসকই ছিলেন!

এতো এতো ত্যাগ শ্রম ভালোবাসা আর পরার্থপরতার পরও কেন এদেশের কিছু মানুষ প্রতিনিয়ত এদেশেরই চিকিৎসক ও চিকিৎসাপেশার বিরুদ্ধে এই সমাজে বিষবাষ্প ছড়ায়!?

কেন তারা বারবার আমাদেরকে কষ্ট দেয়, অবহেলা করে, তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে, কখনো কখনো শারিরীকভাবেও লাঞ্জিত করে!?

আমরা কি এভাবে লাঞ্জিত হতেই থাকবো না-কি কোমর সোজা করে দাঁড়াবো ?

আমাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রণালয়, বিএমএ নেতা কিংবা চিকিৎসক নেতারা যদি সত্যিকারার্থেই চিকিৎসাপেশার নেতা হয়ে থাকেন তাহলে আশা করি এই পেশাটাকে তারা ওয়োন করবেন।

আশা করি এই পেশাটাকে ওয়োন করে এই পেশার মর্যাদা রক্ষার্থে জাজ মিডিয়ার এই অপসৃষ্টির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার ন্যূনতম গাটসটুকু তারা দেখাবেন।
_________

 

ডা. আতিকুজ্জামান ফিলিপ।
সহ-তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ,স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ
যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক, চিকিৎসক পরিষদ, বিএসএমএমইউ।
Doctor ,t Bangabandhu Sheikh Mujib Medical University
Former Secretary General বাংলাদেশ ছাত্রলীগ দিনাজপুর মেডিকেল কলেজ শাখা ,দিনাজপুর।
Studied MBBS. at Dinajpur Medical College, Dinajpur

আপনার মতামত দিন:


বিনোদন এর জনপ্রিয়