Ameen Qudir

Published:
2020-03-05 10:35:15 BdST

সিলেট মেডিকেলের আবু সিনা ছাত্রাবাস :ইতিহাসের পাতায় এবং স্মৃতির জানালায়


ডা. মোরশেদ হাসান
মননশীল লেখক
_______________________

১.
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তার হয়েছেন এবং সাহিত্যচর্চা করছেন এমন কে কে আছেন? আমি খুব সামান্যই জানি। সে জানার সূত্র হল সেবা প্রকাশনী। আমার শৈশবে অনিন্দ্য সুন্দর অনেক কিছুর সঙ্গে জুড়ে আছে সেবা প্রকাশনী। আমি যখন চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র তখন হাতে উঠে এল জুল ভার্নের মিস্টিরিয়াস আইল্যান্ড বইটি অবলম্বনে লেখা শামসুদ্দীন নওয়াবের ‘রহস্যের দ্বীপ’ বইটি। পরিবারে বড়ো কেউ বই নিয়ে এলে সেটি অবধারিতভাবে আমার কচি হাতেও এসে যেত। ছোটোদের বই পড়ছি নাকি বড়োদের এ ব্যাপারে বাসায় কোনো বিধিনিষেধ ছিল না। ঘরে বসে তো পড়তামই আর বাইরে শুনশান নির্জন বুনো ঝোঁপের মধ্যে শুয়ে পড়া যায় এমন এক চিলতে জায়গায় খোলা আকাশের নিচেও পড়তাম। কারও সাধ্য নেই খুঁজে বের করে। সে সময়ে বাড়ির আশেপাশে এমন অনেক জায়গায়ই ছিল যেখানে কেউ যেত না নিতান্ত খেয়ালের বশবর্তী না হলে। নির্জন পুকুরপাড়ে এমন অনেক আমগাছ ছিল যার আম পেকে পাহাড় থেকে নেমে আসা ছরা বা খালের মধ্যে পড়ে থাকত অবহেলায়। কে তার খবর রাখে! তখন মানুষ ছিল অনেক কম, গাছ-গাছালি ছিল প্রচুর।

নেশায় পড়ে গেলে যা হয়, নতুন বই না পেলে এক বই-ই বারবার পড়তাম। ‘রহস্যের দ্বীপ’ অসংখ্যবার পড়েছি। পঞ্চম শ্রেণিতেই মাসুদ রানায় হাতে খড়ি। এভাবেই একদিন সিলেট মেডিকেল কলেজের ছাত্র হীরক চৌধুরীর লেখা সেবা প্রকাশনীর একটি বই হাতে এল। সেবার বইয়ের শেষ প্রচ্ছদে কাহিনির সংক্ষিপ্তসার এবং লেখকের নাম থাকত। সেবার বই আমাদের কাছে ছিল অফুরন্ত আনন্দের খনি। এছাড়াও ছিল ঘুড়ি ওড়ানো, ফুটবল খেলা, হান্ড্রেড, বাবু-চোর-ডাকাত-পুলিশ, যদু-মধু-রাম-সাম খেলা। স্টার ও সিজার সিগারেটের প্যাকেট ছিঁড়ে এসব খেলার সামগ্রী বানাতাম। পুকুরে নাইতে নামলে দুঘন্টার আগে ওঠাউঠির নাম নেই। প্রতিদিন সকালে চোখ খুললেই যেন আনন্দ আর আনন্দ। আনন্দধামেই যেন বুঁদ হয়ে পড়ে থাকা দুচোখের তারায় রাত নেমে আসার আগ পর্যন্ত। অনেকদিন পর্যন্ত হীরক চৌধুরী ছিলেন আমার কাছে এক বিস্ময় জাগানিয়া নাম। সেই সিলেট মেডিকেলে একদিন আমিও ভর্তি হলাম। চলুন না সিলেট মেডিকেল থেকে ঘুরে আসি। এর ঘটনা শুরু করতে হবে সিলেট মেডিকেল কলেজের আবু সিনা ছাত্রাবাস থেকে।

ঐতিহ্যবাহী নান্দনিক এক ভবন আবু সিনা ছাত্রাবাস। এখানে আমি দুবছর ছিলাম। পুরো সিলেটে পুরনো ভবন খুব বেশি নেই। এর একটি কারণ হল ১৮৬৯ ও ১৮৯৭ সালে সিলেটে বড় আকারের দুটি ভূমিকম্প ঘটে। বেশিরভাগ পুরনো ভবন তখন ধ্বংস হয়ে যায়। কিন্তু টিকে থাকে আবু সিনা ছাত্রাবাস। তখন অবশ্য এর নাম আবু সিনা নয়। এ নাম পরে দেওয়া হয়। ভবনটি নির্মাণ করা হয় ১৮৫০ সালে। ভবনটির নকশার নির্মাণশৈলীতে মিশে আছে ব্রিটিশ, আসাম ও বাংলার অনুপম স্থাপত্যকৌশল। ব্রিটিশ স্থাপত্যরীতির বিশাল ভবনটির উপরিভাগে রয়েছে আসামের নিজস্ব রীতিতে গড়া পানি নিষ্কাশনের সুবিধার্থে ঢালু টিনের ছাদ। ছাদে আরও রয়েছে বায়ু চলাচলের জন্য নির্মিত টাওয়ার। এই টাওয়ার বা চূড়াগুলোর অপূর্ব সমন্বয় এই ভবনটির এক অনন্য ও বিরল বৈশিষ্ট্য। ভবনের মাঝে রয়েছে আয়তাকার একটি খোলা সবুজ ঘাসে মোড়া মাঠ, যেটি বাংলাদেশের চিরকালীন উঠোনের কথা মনে করিয়ে দেয়। বড়ো বড়ো থাম, খিলান, প্রশস্ত বারান্দা, কলোনিয়াল আমলের দরজা-জানালা; আলো-হাওয়া প্রবেশের জন্য প্রতিটি রুমে জানালা আকৃতির ভেন্টিলেটর ছিল। মানুষ দাঁত থাকতে নাকি দাঁতের মর্যাদা বোঝে না। এখন মনে হয় কোনো রাজবাড়িতেই বোধকরি আমরা ছিলাম। এমসি কলেজের ঐতিহ্যবাহী হোস্টেলের চেয়েও পুরনো এই ভবন। এই অসাধারণ সৌন্দর্যময় প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন ভবনটিকে গত বছর গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে নতুন হাসপাতাল ভবন নির্মাণের জন্য। জাতিগতভাবে আমরা এমনই অবিমৃষ্যকারী।

২.
সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের আবু সিনা হোস্টেল নিয়ে প্রথম পর্ব আগে লিখেছিলাম। যখন আবু সিনা হোস্টেলে ছিলাম তখন এই পুরনো ভবনটিকে নিয়ে কী ভেবেছিলাম তা আজ স্মৃতির জালে বন্দি হয়ে আছে। ভবনটি এখন আর নেই। এখন মনে হয় বুঝিবা কোনো রাজবাড়িতে তখন ছিলাম। কাজলহাওরে নতুন মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাস হওয়াতে একসময়ের মেডিকেল কলেজ ভবনটি তখন শুধু ছাত্রাবাস।

আমার আবাস ছিল ১০০৬ নম্বর রুম। বন্ধু সোয়েব ছিল ১০০১ নম্বর রুমে। সোয়েবের রুমমেট ছিল রবিন। ১০০১ নম্বর রুমের সামনে থেকে প্রশস্ত সিঁড়ির ধাপ নেমে গেছে মখমলের মতো সবুজ ঘাসের মাঠে। কিছু অলস বিকালে সিঁড়ির ধাপে সোয়েবসহ বসে গল্প করতাম। ফিফথ ইয়ারের বাবুল ভাইয়ের সঙ্গে শিলা আপা গজেন্দ্র গমনে অতিক্রম করে যেতেন ১০০৫ -এর দিকে। রহস্যঘেরা হাজার পাঁচ। কক্ষের ভেতর আরেকটি ছোটো প্রকোষ্ঠ। ফার্স্ট ইয়ারের চোখে ফিফথ ইয়ারের ছাত্র-ছাত্রীরা তখন অনেক বড়ো কিছু। সসম্ভ্রমে তাকাতাম। রবিন চলতি পথে সিনিয়র কাউকে দেখলে কায়দা করে সিগারেট লুকিয়ে ফেলত।

সোয়েবের রুমের সামনে ও পেছনে টানা বারান্দা। তারপর ভবনের প্রাচীর দেওয়াল। এখানে একদিন দেখতে পেলাম দেয়ালে সাঁটানো রয়েছে প্রাচীন স্লেট পাথরে খোদাই করা একটি স্মৃতিফলক বা এপিটাফ। এই এপিটাফটির সামনে অনেকবারই বিস্ময়ভরা চোখে দাঁড়িয়েছিলাম ছাত্র থাকাকালীন। হয়েছিলাম কালের সাক্ষী।

১৮৫০ সালে তৈরি এই ভবন। এপিটাফটিতে লেখা ছিল ইন মেমোরি অব বাবু সারদা নাথ গুহ। বাবু সারদা নাথ ছিলেন সেসময়ের খ্যাতিমান চিকিৎসক। তাঁর মৃত্যুতে স্মৃতিকথাটি লেখা হয়। এপিটাফে সাল লেখা ৭ জুন ১৮৮০। এই ভবনটির সঙ্গে সিলেটের ঐতিহাসিক অনেক ঘটনাই মিশে আছে অস্থিমজ্জার মিলেমিশে থাকার মতোই। ১৮৭৬ সালের পহেলা জানুয়ারি প্যারীচরণ দাস এই ভবন থেকেই প্রকাশ করেন সিলেটের প্রথম সংবাদপত্র ‘শ্রীহট্ট প্রকাশ’। ১৯১৪ থেকে ১৯১৯, প্রথম মহাযুদ্ধের সময় ভবনটি ব্যবহৃত হয়েছে সেনাছাউনি হিসেবে।

১৮৭৪ থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত (১৯০৫ থেকে ১৯১১ সাল ছিল পূর্ববাংলা ও আসাম প্রদেশের সঙ্গে) সিলেট ছিল আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত। অসমীয়াদের সঙ্গে সিলেটিদের একটি রেষারেষি বা প্রতিযোগিতা বরাবরই ছিল। ১৯৩৪ সালে ব্রিটিশ শাসনামলে সিলেটে আসাম প্রদেশের প্রথম মেডিকেল কলেজ নির্মাণের প্রস্তাব এলেও পরে তা ডিব্রুগড়ে স্থানান্তরিত হয়। পরে ১৯৩৬ সালে এই ভবনটিতে চিকিৎসাসেবার জন্য ছোটো পরিসরে হাসপাতাল ও মেডিকেল স্কুল চালু হয়।

১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় এই হাসপাতালের বর্ধিতাংশে বার্মা-ইংরেজ সৈন্যদের চিকিৎসাদানের জন্য চালু করা হয় মিলিটারি হাসপাতাল। যুদ্ধোত্তরকালে ১৯৪৮ সালে নগরীর চৌহাট্টা এলাকায় ফার্গুসন রোডের ( বর্তমান নাম ডা. চঞ্চল সড়ক) দক্ষিণ পাশে এটিকে সংস্করণ ও বর্ধিতকরণ করে দক্ষ সেবক ও লাইসেন্সশিয়েড মেডিকেল ফ্যাকাল্টি (এলএমএফ) চিকিৎসক তৈরির জন্য সিলেট মেডিকেল স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়। ভবনটির মিলনায়তন পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে সিলেটের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহৃত হয়েছে।

১৯৫৫ সালে সুরসম্রাট ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ সিলেটে এলে ভবনের মিলনায়তনে শাস্ত্রীয় সংগীত পরিবেশন করেন। অবশেষে ১৯৬২ সালে দাবির মুখে পাকিস্তানের আয়ুব খান সরকার মেডিকেল স্কুলকে মেডিকেল কলেজে রূপান্তরিত করে। ১৯৬২ সালের ২২ অক্টোবর এমবিবিএস ১ম ব্যাচের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম শুরুর মধ্য দিয়ে যাত্রা শুরু হয় নব আঙিকে সিলেট মেডিকেল কলেজের। আবু সিনা ভবনটিতে ছিল দুটি লেকচার গ্যালারি ও আরও অসংখ্য কক্ষ।

১৯৭১-৭২ সালে কাজলহাওর এলাকায় হাসপাতাল ও মেডিকেল কলেজ স্থানান্তরিত হওয়ার আগে এটিই ছিল মেডিকেল কলেজ ভবন। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় রোগী ও যুদ্ধাহতদের সেবাদানের জন্য পুরনো মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরেই পাকিস্তান হানাদার বাহিনির ক্যাপ্টেন রিয়াজের নেতৃত্বে গুলি করে হত্যা করা হয় সার্জারি বিভাগের অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান ডা. শামসুদ্দীন আহমদকে। একই সঙ্গে নিহত হন ডা. শ্যামল কান্তি লালা, পিয়ন মো মুহিবুর রহমান ও মোখলেছুর রহমান, অ্যাম্বুলেন্স ড্রাইভার কোরবান আলীসহ মোট নয়জন। সবাইকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে নির্মমভাবে গুলি করা হয়।

আবু সিনা হোস্টেলের পশ্চিমপাশ থেকে বেরোলে ডান দিকের গলিটি চলে গেছে হযরত শাহজালালের মাজার শরীফে। আর একটু সামনে গেলে ছোট্ট একটি ব্রিজ। ব্রিজ পেরোলে ডান পাশে সরকারি পাঠাগার আর ডানদিকে ডা. শামসুদ্দীন আহমদ ছাত্রাবাস।

১৯৭৮-৭৯ সালে হাসপাতাল ও কলেজ ভবন পরিপূর্ণভাবে কাজলহাওরে স্থানান্তরিত হয়ে যায়। তখন এই ঐতিহাসিক ভবনটিকে আরব মহান চিকিৎসক ইবনে সিনার নামে নামকরণ করে মেডিকেল কলেজের ছাত্রাবাস করা হয়। ১৯৮৬ সালে এরশাদ সরকার বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনির চিফ ইন কমান্ডার জেনারেল মুহাম্মদ আতাউল গণী ওসমানীর নামানুসারে কলেজটির নামকরণ করে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ যা সংক্ষেপে সিওমেক নামে পরিচিত।

ইতিহাসের পথ বেয়ে স্মৃতির সিঁড়ি নেমে যায় ধাপের পর ধাপ। কেউ আজ নেই, কিছু নেই। ঐতিহাসিক ভবনটি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। কালের ধুলোয় স্মৃতির রেনু ওড়ে শুধু কিছু মানুষের বুকের খাঁচায় কোমলাস্থির কোমল ছোঁয়ায়।

(নতুন ভবনে কলেজ স্থানান্তর সম্পর্কীয় সাল-তারিখ নিয়ে কোনো ভ্রান্তি থাকলে তা সংশোধনযোগ্য।)
____________________

ডা. মোরশেদ হাসান

আপনার মতামত দিন:


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়