Ameen Qudir

Published:
2018-12-05 12:08:23 BdST

'আমি সুইসাইড করিনি: আমি বেঁচে আছি ভাগ্যের জোরে':এক চিকিৎসকের স্কুলজীবনের অভিজ্ঞতা


 

 

ডা. নুসরাত বিনতে রব্বানী
_________________________________

এখন ফেবু তে অরিত্রির আত্মহত্যা নিয়ে অনেক আলোচনা সমালোচনা হচ্ছে। আমি আমার স্কুল জীবনের কিছু এক্সপেরিয়েন্স শেয়ার করি।
আমি পড়তাম হলিক্রস স্কুলে। সেখানে অবশ্যই ভাল শিক্ষক শিক্ষিকা থাকার কথা। হয়ত আছে। কিন্তু উনাদের অনেকেই বাসায় টিউশনিতে ব্যস্ত। আমি শুনতাম হলিক্রস স্কুলে টিচারদের প্যাকেজ ঢাকার অন্য সব স্কুলের তুলনায় খারাপ তাই উনারা প্রাইভেট ব্যাচ পড়াতে বাধ্য হয়। খুব ভাল কথা। প্রাইভেট পড়ানোর জন্য স্টুডেন্ট জোগাড় করার একমাত্র উপায় হিসেবে তারা বেছে নিল ক্লাস টেস্ট, হল টেস্ট ইত্যাদি পরীক্ষায় টেনে টুনে পাশ টাইপের মার্ক দেয়া। কয়েকজন টিচারই এই পদ্ধতি ফলো করে।
আমি দেখলাম এতজনের সাথে যুদ্ধ করে স্কুলে টেকা যাবেনা। তাই তাদের পথেই চলতে হল। বাধ্য হলাম তাদের কাছে ব্যাচ এ প্রাইভেট পড়তে। সবাই দেখলাম ব্যাচ এ সাজেশনের নামে পরীক্ষার আগে প্রশ্নপত্রের বেশীর ভাগ দিয়ে দেয়। কয়েকজন ছিলেন প্রশ্নপত্রে যেই প্রশ্ন থাকত সেই প্রশ্নের সাথে আরো কিছু প্রশ্ন যোগ করে দিতেন, ধরেন প্রশ্ন পত্রে আছে ১০ টা প্রশ্ন আর উনি বাসায় আমাদের সাজেশন দিলেন ২৫ টা প্রশ্ন, যেখানে সিলেবাসে হয়ত আছে ১০০ টার মত প্রশ্ন। দেখা গেল সিলেবাসের প্রায় ৭৫% বাদ দিলেও ৮০% মার্ক পাওয়া যেত যদি উনাদের বাসায় ব্যাচ এ পড়তে যাওয়া হত।
এর মধ্যে 'সা' আদ্দ্যাক্ষর দিয়ে একজন শিক্ষিকা ছিলেন উনি প্রশ্নপত্রের ১০ টা প্রশ্নের ১০টাই দিতেন এবং শুধু ওই ১০ টাই দিতেন। মানে খালি প্রশ্ন পড়লেই ৮০% মার্ক তো অবশ্যই, হাইয়েস্ট ও পাওয়া যাবে। আর উনার পড়ানোর স্টাইল ও ছিল ইউনিক। উনি বই দেখে একটা খাতাতে কিছু প্যারাগ্রাফ লিখতেন। ওইটাই মুখস্ত করলেই হবে। প্রায় সময় উনি বই থেকে কপি করে খাতায় লিখে বাইরে চলে যেতেন। আমরা উনার বাসায় গেলে উনার মা অথবা ছোট বোন আমাদের ওই খাতা দিত। আমরা ওই খাতা হাতে নিয়ে খানিক্ষন গল্প সল্প করে বাসায় চলে আসতাম। মানে লেখাপড়া বলে ওখানে কিছুই ছিলনা।
আমি ১ বছর উনার কাছে পড়ে ক্লাস নাইনে উঠে ঠিক করলাম উনার বাসায় আর পড়তে যাবনা। তখন উনার রাগ জিদ কে দেখে!! উনি ক্লাসে পারলে আমাকে খেয়েই ফেলে। যা তা বলে উনি রেগুলার আমাকে ক্লাসে অপমান করতেন। এবং প্রায় দিন ই উনি আমার নামে স্কুলের সিস্টার বা গারজিয়ানের কাছে নালিশ করতেন। এত অত্যাচার করেও যখন উনি দেখলেন আমাকে বাসায় পড়াতে নিয়ে যেতে পারলেনই না তখন উনি আমার প্র্যাক্টিক্যাল খাতা সাইন করা বন্ধ করে দিলেন।
যখন এসএসসি পরীক্ষার টেস্ট এক্সাম আসল তখন বলা হল প্র্যাক্টিক্যাল খাতা সাইন করা না থাকলে টেস্ট এ প্র্যাস্টিক্যাল জিরো দেয়া হবে। ওই শিক্ষিকা তো এই নোটিশ বলেন আর আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসি দেন। এইবার উনি আমাকে বুঝাবেন উনার কাছে পড়তে না যাওয়ার ফলাফল। আমি কি করব, আমি সম্পূর্ণ নিরুপায়। স্কুলে ওই শিক্ষিকার অত্যাচার , আর ওইদিকে বাসায় এক্সপেক্টেশন আমাকে ভাল করতেই হবে...সব মিলিয়ে আমি ডিসিশন নিলাম অন্যায় করে হলেও আমাকে এই খানে জিতে আসতেই হবে। আমি ওই শিক্ষিকার সাইন নকল করে প্র্যাক্টিক্যাল খাতায় নিজেই সাইন করলাম।
ফলাফল হল আরো খারাপ। ওই শিক্ষিকা ওই নকল সাইন সহ প্র্যাক্টিক্যাল খাতা সিস্টারের হাতে জমা দিল এবং সিস্টার আমার গার্জিয়ান ডেকে পাঠাল। এরই মধ্যে ওই শিক্ষিকা উনার বাসায় যারা পড়তে যায় তাদের সবার মায়েদের বলে রাখল নুসরাত একটা অকাজ করেছে , আমি সিস্টারের কাছে ওর নামে নালিশ করেছি , এবার সে সায়েস্তা হবে। স্বভাব মোতাবেক সেই বয়স্ক মায়েরা স্কুলে এটা মুখে মুখে একে তাকে বলে মার্কেটিং এর কাজ করতে শুরু করে পরিস্থিতি ভয়াবহ করে ফেলল।
আমি গার্জিয়ান নিয়ে দেখা করতে গিয়ে পড়লাম তোপের মুখে। সিস্টার আমার যত ভুল ত্রুটি সব নিয়ে সমানে এক্টার পর একটা গুলি ছুড়তে লাগলেন। আমি অপমান , লজ্জা মেনে নিয়ে মাথা নিচু করে বসে থাকলাম।
নালিশ শেষে আমি প্রমানসহ সিস্টার কে বললাম ওই শিক্ষিকা এভাবে বাসায় পুরা প্রশ্নপত্র দিয়ে দেয়। আমি প্রাইভেট পড়তে যাইনা দেখে উনি আমার প্রাক্টিক্যাল খাতায় সাইন করেন না, তাই আমি অন্যায় করতে বাধ্য হয়েছি। উনার মত বয়সে একটা মহিলা যদি টাকার বিনিময়ে প্রশ্নপত্র ফাসের মত জঘন্য অন্যায় করে মহা দাপটে চলতে পারে তাহলে আমার অন্যায়ের জন্য আর কত বড় সাজা হবে?
সিস্টার আমার কথা শুনে হাতে প্রমান পেয়ে চুপ করে বসে থাকলেন। ওই শিক্ষিকাকে বললেন আমার প্র্যাক্টিক্যাল খাতা সাইন করে ছেড়ে দেয়ার জন্য। অবাক হয়ে দেখলাম ওই শিক্ষিকার এত বড় অন্যায়ের প্রমান থাকার পরও ওই শিক্ষিকার কোন সাজাই হলনা, কোন ব্যবস্থাও নেয়া হলনা।
কিন্তু আমি ক্লাস নাইন টেন এ পড়া কিশোরী একটা মেয়ে আমার উপর মানসিক, পারিপার্শ্বিক , স্কুলে গার্জিয়ান ডেকে অপমান সব অত্যাচার গেল ।
সেইদিন আমিও চেয়েছিলাম সুইসাইড করি। আমার কষ্ট ওইদিন কেউ বুঝতে চায়নি। কেউ আমার পাশে ছিলনা।
কিন্তু আমি সুইসাইড করিনি। আমি বেচে আছি ভাগ্যের জোড়ে।
সেইদিন ওই শিক্ষিকার অত্যাচারে আমি সুইসাইড করলে কি হত? সবাই বলত এই মেয়ে নকল করে সাইন করেছে তাই সিস্টার তাঁর গার্জিয়ানকে ডেকেছে, তাই ওই মেয়ে সুইসাইড করেছে, দোষ মেয়েরও ছিল, মেয়ের পরিবারের দোষ ছিল... ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু আমাকে অন্যায় করতে বাধ্য করল কে? কে প্রথম ও প্রধান অন্যায়কারী? তাঁর বিচার কি হওয়া উচিত নয়?
আমি এখনো শুনি ওই শিক্ষিকা ভর্তি পরীক্ষার জন্য কোচিং ব্যাচ পড়ান। হলিক্রসে ভর্তি পরীক্ষার জন্য উনার কাছে পড়ে কোন লাভ নাই, তারপরো ঊনার কোচিং বানিজ্য চলছে। আমার পরিচিত এক মা তাঁর বাচ্চাকে উনার ব্যাচে পড়াতে নিয়ে যায় কারন ওই শিক্ষিকা আশা দিয়েছেন ওই মেয়ে ভর্তি পরীক্ষায় খারাপ না করলে ঊনি ওই মেয়েকে ভর্তি করিয়ে দেবেন। এর মানে আবার আরেকটা বাচ্চা ফ্যামিলি এর তোপের মুখে পড়বে "তুই ভর্তি পরীক্ষায় খারাপ করেছিস, নাইলে ঊনি হলিক্রসে তকে ভর্তি করাতে পারত"
এই সব জঘন্য শিক্ষক শিক্ষিকা থেকে বাচ্চাদের বাচান।
অরিত্রির হত্যার বিচার করুন।
অরিত্রি কেন নকল করেছে? কেন মোবাইল নিয়েছে? শিক্ষক শিক্ষিকাদের কাছে জানুন।
আর শিক্ষক শিক্ষিকারা আপনারা যদি মনে করেন শিক্ষকতা পেশার ইনকামে আপনারা ভাল নাই আপনি তাহলে আপ্নারা অন্য কোন প্রফেশন খুজে নিন। আমি তো ঘুষ খাইনা, কোচিং বানিজ্য করিনা... আমার মত অনেকেই আছে ঘুষ খায়না, ছাত্র ছাত্রীদের জিম্মি করে কোচিং বানিজ্য করেনা। তারা ভাল আছে। আপনারাও নিজে ভাল থাকুক।স্কুলের বাচ্চাদের আপনাদের নির্মম ব্যবহারের বলি বানানো বন্ধ করুন।

_____________________________

ডা. নুসরাত বিনতে রব্বানী
প্রাক্তন হলিক্রস স্কুল এন্ড কলেজ।

Studied Medicine at Bangladesh Medical College & Hospital


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়