Ameen Qudir

Published:
2018-02-23 06:19:59 BdST

"ডাক্তারকে ধাওয়া"র ছবিটা পশ্চিমবাংলার স্বাস্থ্য চিত্রের নগ্নতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে


 

 

ডা. রেজাউল করীম


_______________________________

আনন্দবাজারে প্রকাশিত "জুনিয়ার ডাক্তারকে ধাওয়া করছে জনতা" ছবিটা পশ্চিমবাংলার স্বাস্থ্য চিত্রের নগ্নতাকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। হাসপাতালে খেটে খাওয়া অর্ধাহারী মানুষের অন্তহীন ভিড়ে চিকিৎসকদের নাভিশ্বাস আর উল্টোদিকে মুমূর্ষুর প্রতিটি মৃত্যুর জন্য চিকিৎসককে দায়ী করে খাপ পঞ্চায়েতে কাজীর বিচার! চিকিৎসক সবাইকে বাঁচাতে পারেন না, শতকরা ৬ ভাগ মানুষ নানা কারনে মারা যান, চিকিৎসকের আপ্রান পরিশ্রমের পরও মানুষের মৃত্যু আটকানো যায় না। অথচ, বিগত সাতদিনে প্রায় মহামারীর মত চিকিৎসক নিগ্রহ ও হাসপাতালে হামলার ক্রমবর্ধমান ঘটনার পরও সরকার নিরব। এই উপুর্যুপরি অন্যায়ের বিস্ফারিত প্রকাশ তো আসলে রাজনৈতিক দাবার চাল, যে চালে "ঘোড়া গুলো বাঘের মত খেলে", যে চালের মোক্ষম আঘাতে অমনোযোগ ও অবহেলার রাজনৈতিক পাপের গুরুভার অক্লেশে প্রতিরোধহীন দুর্বলের কাঁধে চাপিয়ে দেওয়া যায়। চিকিৎসকরা তো আসলে দুর্বল প্রতিপক্ষ- তারা দুর্বল কারন তারা ঐক্যবদ্ধ নয়, তাই কখনো দিদির হাতে কখনো মোদির হাতে লাঞ্ছিত হন। কিন্তু তারচেয়েও গুরুতর কারন আছে। প্রথমত: উচ্চশিক্ষার এই বন্ধ দুয়ার খুলেছে মেধাবী, উচ্চাকাঙ্খী ছাত্রছাত্রীদের যারা হয়ত "ঐক্য বাক্য মানিক্য" পড়লেও ঐক্যের অর্থ সম্যক উপলব্ধি করতে পারে না। দ্বিতীয়ত: মানুষ আর তাদের যোগ্য জননেত্রীরা যা-ই ভাবুন বিবেকের ডাকে সাড়া দিয়ে চিকিৎসকরা মুমূর্ষু মানুষকে ফেলে পালাতে পারেন না। তৃতীয়ত: মেডিক্যাল এথিকসের জন্য সরকারকে ব্লাকমেল করার মহাজন পন্থা অনুসরন করতে তাদের স্পষ্ট অনীহা ও চতুর্থত: বেশির ভাগ মানুষ চিকিৎসকদের সাথে সহৃদয় ব্যবহার করেন বলে একের দোষে দশকে সাজা দেওয়া অনুচিত বলে তারা মনে করেন।


অথচ, বাস্তবে সংবাদপত্রের পাতায়, ফেসবুকের দেয়ালে আর রাজনৈতিক বুলিতে চিকিৎসকরা গনশত্রু। দুচারটে ডাক্তারের বাড়ীতে সি আই ডি রেড করে দেখুক না বিগড়ে যাওয়া মেয়ের বাড়ীর মত টাকার বান্ডিল আর সোনার পাহাড় পাওয়া যায় কিনা!! ডাক্তাররা নাকি দিবারাত্র টাকার পেছনে দৌড়ান। একজন নেত্রী তো বলেই দিয়েছেন ডাক্তাররা এত টাকা নিয়ে কী করেন!?! কেউ বলেন না একজন নিম্নমেধার যুবক কি করে খারাপ মানের বিদ্যে দিয়ে কোটি কোটি আয় করেন। তবে এসব গুহা কথা প্রকাশ্যে না বললেই ভালো। অর্থ এখানে অনর্থের কারন নাও হতে পারে। আসল হচ্ছে রাজনীতি-খল,ক্রুর, আত্মঘাতি রাজনীতি। নয়ত ডাক্তারের প্রতিদিনকার যাপনের জন্য এ কটি লাইনে বেশিরভাগ চিকিৎসকের যপমন্ত্র-" মনে মনে প্রতিজ্ঞা রোজ করি/ দোহাই পতিতপাবন হরি,/ আর নয়, আমার লম্পট প্রবৃত্তিগুলিকে,দস্যু লোভগুলিকে, চালান করো আন্দামানে তার মানে, স্বার্থ, অর্থ, জমিদারী অনর্থ, টাকা, টাকা আর টাকা,সমস্ত দিনের হীন বাণিজ্যটাই ফাঁকা |"
তাহলে এই অন্তহীন বিলাপ করেই যাবো আর অনুপ্রেরনার ঘায়ে ডাক্তারের জীবন কি অতিষ্ঠ হতেই থাকবে? আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় জানাতে চাই- মুখ্যমন্ত্রী এই সব গুন্ডাগিরির বিরুদ্ধে কড়া বার্তা দিন, চিকিৎসক নিগ্রহের প্রতিটি ঘটনার বিচার হোক মেডিকেয়ার ২০০৯ অনুসারে। চিকিৎসকরাও জনসংযোগ বাড়ান, আরো বেশি করে পেশাদারী দক্ষতার সাথে অবস্থা সামাল দিন। সব রকম ব্যক্তিগত অসূয়া ত্যাগ করে পরস্পরের পাশে দাঁড়ান, ইস্পাত কঠিন ঐক্যের স্তম্ভ গড়ে তুলুন। আমি সব সময়ে বলি এ আমাদের চরম দু:সময় কিন্তু এই সময় আমাদের চূড়ান্ত সুযোগের ও সময়। জনগনের সাথে সুসম্পর্ক পুনপ্রতিষ্ঠা করার সুসময়, সব মানুষের চিকিৎসার অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবীতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের সুবর্ন সুযোগ, সর্বজনীন চিকিৎসা পরিষেবার দাবীতে জনমত তৈরী করার ও সুবর্ন সময়।


আমি অনুপ্রেরনা পাই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিগত জীবন থেকে যখন তার আন্দোলন মুখী মন শানানো সঙীনের মত ঝলসে উঠত- সেই আপোষ হীন সংগ্রামে আমাদের ও লিপ্ত হতে হবে। হয়ত মেডিক্যাল কাউন্সিল, আই এম এ সহ সব গতানুগতিক প্রতিষ্ঠান গুলিতে অরাজনৈতিক চিকিৎসকদের প্রতিনিধিত্ব বাড়াতে হবে, হয়ত চিকিৎসকদের সর্বত্রগামী হতে হবে- গ্রামে, শহরে, কলকারখানা সর্বত্র তাদের যেতে হবে। "যারা মধ্যরাত্রে অগাধ নীলিমা চষে নিরীহ ঘুম ভাঙায়, যারা তোমার আমার অবসরের গান ভেঙে চুরমার করে,মুক্ত প্রাণে মুক্ত ইচ্ছার সিন্দুকে তালা পড়ে" তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে পথে এবার নামতে হবে, পথেই হবে এ পথ চেনা!

__________________________

 

Rezaul Karim's Profile Photo, Image may contain: Rezaul Karim, sitting, eyeglasses and indoor

 

ডা. রেজাউল করীম।
পশ্চিম বাংলার প্রখ্যাত লোকসেবী চিকিৎসক ; চিন্তক ।


ক্যাম্পাস এর জনপ্রিয়