Ameen Qudir

Published:
2018-10-22 11:50:21 BdST

আমাদের কিরিকেট


 

 

দেবব্রত তরফদার
_______________________________


ক্লাবে আমাদের ঘরটি ছিল মলিন নোংরা অগোছালো কিন্তু ট্রফি ছড়িয়ে থাকতো এদিক ওদিক । তারপর একসময় সব কুড়িয়ে বস্তা বোঝাই করে বাসনের দোকানে বিক্রি করে পাওয়া গেল কিছু টাকা আর ওই ট্রফিগুলোর পিছনের ইতিহাস পরে বলা হবে।
১৯৭০ সালে চোখ দেখাতে কৃষ্ণনগর এসে প্রথম ক্রিকেট খেলা দেখি পাঠাগার মাঠে । লীগ না টুর্নামেন্ট তা জানতাম না । ছোটকাকু খেলতেন পাঠাগার এবং ডিস্ট্রিক্ট টিমে। পরে কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হবার পর ব্যাটবল ধরার সৌভাগ্য হলো কিন্তু ছিলাম নেহাতই আনাড়ি।অরিন্দম বাসু অচিন্ত্য এরা ছিল সব ভালো প্লেয়ার । প্রথম টেস্ট খেলা শোনার অভিজ্ঞতা ১৯৭৪ - ৭৫ সালের ভারত ওয়েস্ট ইন্ডিজের তৃতীয় কলকাতা টেস্ট । ক্লাইভ লয়েডের চার বোলারের ভয়ঙ্কর টিম, সঙ্গে রিচার্ডস ফ্রেডরিক গ্রিনিজ ডেরেক মারে কালিচরনের মত প্লেয়ার । সেটা ছিল বছরের শেষ । মনসুর আলী খান এর শেষ টেস্ট , একটি ছয় মারলেন শুনতে পাইনি , দুপুরের খবরের সময়ে । সেই টেস্টে গাভাস্কার খেলেননি , রিচার্ডস এর সেঞ্চুরি হয়েছিল। ইন্ডিয়া জিতে গেল সেই টেস্টে । পরের টেস্ট মাদ্রাজ , গাভাস্কার ইঞ্জিনিয়ার ওপেনে ফার্স্ট ডাউনে সোলকার । ইন্ডিয়ান ক্যাপ্টেন ছিল বোধহয় বেদী । সেই টেস্টেও ইন্ডিয়া জিতলো । সবে ক্লাস সেভেন উঠেছি ।টিফিনের পর হঠাৎ স্কুলে চকলেট বোম ফাটতে শুরু করলো । স্কুল ছুটি হয়ে গেল।

তখন রাস্তায় রাস্তায় ঘরে ঘরে রেডিওতে পুস্পেন অজয় আর কমল আর কার্তিকবাবুর গলা। রাস্তার মোড়ে মোড়ে জটলা । ধনীপুত্রদের হাতে ছোট ছোট রেডিও । তখন দেশবাসীর অগাধ বিশ্বাস গাভাস্কারের উপর । গাভাস্কার আউট হয়নি তাহলেই আশার আলো আছে । অনেকেই স্কোর জিজ্ঞেস না করে জিজ্ঞেস করতো , গাভাস্কার আউট হয়েছে কি। অনেক টেস্টেই ইন্ডিয়া তলানিতে কিন্তু দু ইনিংসেই গাভাস্কারের সেঞ্চুরি। গাভাস্কার ছিলেন ভারতীয়দের প্রথম হিরো । তার ভগ্নিপতি বিশ্বনাথ ছিলেন শিল্পী ব্যাটসম্যান । রঞ্জন ছিল গাভাস্কারের এমন ভক্ত যে তার সমস্ত রেকর্ড ছিল ওর নখদর্পনে। আজহারউদ্দিন বিশ্বয়বালক খেলতে এসেই প্রথম তিন টেস্টেই সেঞ্চুরি। তখন অলরাউন্ডার কি তা ভারতীয় ক্রিকেট জানতো না । কপিলদেব আসলেন , খেললেন আর ভারতীয়দের মন জয় করলেন। টেস্টে এমন ম্যাচ উইনার ভারতীয় ক্রিকেট পেয়েছে কি ?
পাড়ার টেনিস বলে খেলা ক্রিকেট ছিল খুব পপুলার । আমাদের আমবাগান কেটে তখন জমি বিক্রি শুরু হয়েছে। মাঝে ফাঁকা জায়গায় ক্রিকেট খেলা চালু আছে। বিশ্ব ছিল তবলাবাদক আর তার গুরু সাবির খানের এমন ভক্ত যে সব সময়ে পায়জামা পাঞ্জাবি পরতো , শীতকালে এর উপর একটা জহর কোট । চপ্পল পায়ে এই ড্রেসেই কিপিং , খেলতে নেমে পড়লো, শুধু শীত গ্রীষ্ম যাই হোক না কেন মাথায় কানঢাকা শীতে পরা একটা টুপি । মানিক রায় ছিল খিঁচ প্রকৃতির , মুখে বিরাট আওয়াজ । আউট অপছন্দ হলেই ইয়ে টিয়ে খুলে ফেলতো ।

ওস্তাদ প্লেয়ার তেমন কেউ ছিল না । টুর্নামেন্ট খেলতে গেলেই হায়ার প্লেয়ার , হয় আমার ছাত্র না হলে প্রশান্তর। ক্লাবের একজন দুজন । আমাদের মানে আমার আর প্রশান্তর ছাত্ররাই হায়ারে খেলতে যেত । ক্রিকেট টিমমটাকে বলা হতো প্রশান্তদার টিম। ক্যাম্বিসের সব স্টার প্লেয়াররা খেলতো। এন্ট্রি ফি প্রশান্তর । জিতলে প্রাইজ মানি ভাগ করে দিত । পাড়ার বাচ্চারা ঝেটিয়ে খেলা দেখতে গেলে তাদের খাওয়া দাওয়া বাবদ টাকা দিত সন্দীপের কাছে । সন্দীপ হয়তো ডালভাত খাইয়ে নিজেরা দারু টেনে মাঠে। শিমুলতলা মাঠে টুর্নামেন্ট , ক্লাব খেলছে আর বদমাসগুলো তাড়ির ভাঁড় নিয়ে মাঠের বাইরে। আবার টুর্নামেন্ট জিতলে রাতে পিকনিক। সে খরচও প্রশান্তর। এইভাবে বছরে চল্লিশ পঞ্চাশ হাজার টাকা খরচ করে গুটিকয়েক ট্রফি। তা কয়েক বছরের ট্রফি জমে হয়েছিল এক বস্তা । প্রশান্তটা ছিল খুব বোকা । "প্রশান্তদার টিম খেলছে " এই ব্যাপারটি ওর কাছে উপভোগ্য ছিল ওর কাছে।অনেক খেলায় ও উপস্থিত থাকতে পারতো না । ওর প্রতিনিধি মানে সন্দীপরা যেত মাঠে । নিজে কি খেলতো সেটা বড় কথা নয়। আর ওর খেলা নিয়ে যারা হাসাহাসি করেছে তারাই মার খেয়েছে ওর কাছে ।কচি বা অলোক কিছু বলেই পালিয়ে যেত , সেদিন আর মুখোমুখি হতো না । আজ প্রশান্ত নেই , নেই ওর টিমও । অচিন্ত্য বিপ্লব শ্যামল গোপাল হাজারী এই সব স্টার প্লেয়ার রা ছিল ওর টিমের । কাকতলীয়ভাবে এরা সবাই আমার ছাত্র ছিল। প্রশান্ত চলে যাবার পর ট্রফিগুলো এদিক সেদিক গড়ায় , একদিন সব কেজিদরে বিক্রি করে দিয়ে আসলাম।

আমাদের ক্লাবের চিরশত্রু আমবাগান পাড়া।ভারত পাকিস্তানের মতো। সুকান্ত ( বাখাই ) আর শ্রীকান্ত ( ভুতো ) দুই ভাই ছিল ওই ক্লাবের স্টার । আমরা ওদেরকে বলতাম ফ্লাওয়ার ব্রাদার ।সারা সিজন ওদের সঙ্গে সিরিজ চলতো । বেশির ভাগ আমরাই জিতেছি। সন্দীপ এদের বোন টেপির সঙ্গে প্রেম করতো। এরা সবাই আমার ছাত্র ছাত্রী। আমাকে তাই সবসময় ব্যালেন্স করে চলতে হতো । সুকান্ত ছিল খুবই নরম স্বভাবের , সন্দীপের হরিহরআত্মা বন্ধু। খেলার মাঠে কিন্তু ছাড়ান নেই।। ভুতোটা ছিল একটু রগচটা , সন্দীপের সঙ্গে বাধলেও সামনে কিছু বলতো না। এদের বাবা সুকুমারবাবু ছিলেন খেলাপাগল মানুষ ।অফিসে যাওয়ার জন্য বেরিয়ে দেখলেন ছেলেরা ম্যাচ দিচ্ছে এমনি অফিস বন্ধ । ভুতো ছিল সেরা গোলকিপার । আমরা অবশ্য এদের খুব ভালোবাসতাম এখনো বাসী। সুকান্ত বিদেশে বহুবছর থেকে কৃষ্ণনগরে স্থিতু হয়েছে । ভুতো এখনো দুবাইতে ।

একদিন আমাদের সঙ্গে ম্যাচ দিতে আসলো স্কুলে পড়া বাচ্চা কিছু ছেলে , আমাদের পাড়ার সঞ্জয়ের বন্ধু। ছেলেগুলো একটু রক স্টাইলের । ক্যাচ ধরলে সমারস্লট দিচ্ছে । সহ খেলোয়াড়দের বাহবা দিচ্ছে অন্য স্টাইলে , বল মিস করলে শুয়ে পড়ছে পিচের মধ্যে । এদের মধ্যমনিটি বাবুন , শুনলাম কোন দিদিমনির ছেলে , বাঁ হাতে কাটা দাগ । কার সঙ্গে ছুরি মারামারি করেছে ,শুনলাম। সন্দীপ ওদের নামকরণ করলো গ্রেগরি , হেগরী , অন্দ্রিয়ানো , মার্কোপোলো এইসব । একমাত্র গ্রেগরি নামটাই থেকে গেছে। সে সঞ্জয় । পাড়ার ছেলে , এখন ঘোরতর সংসারী । ওকে নিয়ে একদিন লিখতে হবে , অনুরোধ আছে। আর দিদিমনির সেই বজ্জাত ছেলেটার সঙ্গে বছর কয়েক পর পরিচয় হয়। পড়তে আসে আমার কাছে। পরে ঘনিষ্ঠতা হয় । একদম ভাইয়ের মত। সে দেবাঞ্জন বাগচী , মাস্টার ডিগ্রি এম বি এ করে ব্যাঙ্কের ভালো চাকুরে। কলম আর ক্যামেরা চলে সমান তালে। আমার লেখাজোখার ক্ষেত্রে অনেক ওর ভূমিকা উপেক্ষা করার মতো নয় । অনেক উৎসাহ পাই ওর কথায়। জীবন যেমন চলে।

ছোটবেলায় ক্রিকেট খেলার প্রতি আকর্ষণ জাগলো যখন তখন একটু অসুবিধেই পড়লাম। নিজেদের কোনো রেডিও ছিল না এখানে। পরীক্ষার পর বাড়ি চলে যেতাম , সেখানে নিজেদের রেডিওতে খেলা শুনতাম। বাবা দোকানে রেডিও নিয়ে গেলে জেঠিমার দ্বারস্থ কিন্তু আমার জ্যাঠাতো ছোট বোনটি ছিল এমন হিংসুটে , তার তখনই অন্য কিছু শোনার ইচ্ছে করতো। এখানে এসে পাশের বাড়ির ইমানআলী মেসোমশাই রিকশা চালাতেন , তিনি বাড়িতে থাকলে খেলা শোনা হতো কিন্তু না থাকলে রেজিনা মাসি ঢাকা চ্যানেল খুলে এন্ড্রু কিশোর বা সাবিনা ইয়াসমিনে মেতে যেতেন। ছুটির দিনগুলো অবশ্য বাঘাডাঙার বাবুলদের ভাঙা রেডিওতে ।যেটা ছিল দড়ি দিয়ে বাধা , কখনো আজাদদের বাড়ির সামনে রাস্তায় দাঁড়িয়ে।
প্রথম আর দ্বিতীয় বিশ্বকাপের কথা মনে নেই , রিলেও হয়নি বোধ হয়। তৃতীয় বিশ্বকাপের প্রথম খেলা , ওদিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজ।তখন ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি । রেডিও নেই কি যে করি দুপুর দুটোই খেলা শুরু । তখন এগারোটা বাজে কি যে করি । কিছুক্ষণ পর স্নান করে দুটো মুখে দিয়ে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম চব্বিশ কিলোমিটার দূরে নিজের গ্রামের উদ্দেশ্যে । প্রথম বল থেকেই শুনতে হবে , সাইকেলেই টিকিয়া উড়ান । সেটা ছিল জুন মাস , ঘেমে নেয়ে যখন বাড়ি পৌঁছলাম , মা অবাক , বাবা খেতে বসেছেন , না খেলা তখনও শুরু হয়নি। প্রথম ম্যাচেই ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে শুরু হলো ভারতের জয়যাত্রা। বিশ্বকাপে ভারতের প্রথম জয়। বাড়িতে ফিরে বিজয়দার কাছ থেকে রেডিও ম্যানেজ করলাম। জিম্বাবুয়ের সঙ্গে খেলা, একুশ রানে পাঁচ উইকেট ,কপিলদেব খেলতে নামলো। সেদিন ছিল শনিবার , হতাশ হয়ে সুবলদার বাড়ি পড়তে চলে গেলাম। আর সাড়ে সাতটায় যখন পড়ে বেরিয়েছি , পানের দোকানে রেডিওতে শুনি কপিলদেব তখনো খেলছে , সেই বিখ্যাত ১৭৫ নট আউট। সেমি ফাইনাল খেলা ইংল্যান্ডের সঙ্গে , গাভাস্কার সেদিন দারুন একটা ইনিংস খেলেছিল। আমি আর দিদি অন্ধকারে ভাঙাচোরা মেঝের উপর বসে খেলা শুনছি। ভারত ফাইনালে উঠলো। ফাইনালে সবাই ঠিক করলাম সবাই মিলে খেলা দেখতে যাবো টেলিফোন এক্সচেঞ্জ অফিসে। ভারত শেষ করলো ১৮৩ রানে। পরে পোস্ট অফিসের মোড়ে গিয়ে দেখি রাস্তায় তিল ধারণের জায়গা নেই। সবার হাতে হাতে রেডিও । সেদিন অমরনাথ আর মদনলাল হয়ে উঠেছিল বাঘের বাচ্চা । ওয়েস্ট ইন্ডিজ শেষ করলো ১৪৩ রানে । মনে হলো ভারত যেন স্বাধীন হল সবাই পাগলের মত করছে , কেউ মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছে কেউ কাঁদছে একা একাই। ঝমাঝম বৃষ্টি শুরু হলো , আর তার মধ্যেই আমরা নাচানাচি করছি। বাড়ি ফেরার পর সময় দেখলাম বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়েছে হাতারপাড়ার ছেলেরা । পরস্পরের জামাপ্যান্ট ছিঁড়ে একেবারে নাঙ্গাবাবা সব। আমাদের যদি এই অবস্থা করে সেই ভয়ে সাইকেলে বৃষ্টির মধ্যে টেনে মারলাম।

তখন শচীন ,সৌরভ , দ্রাবিড় , লক্ষণ কোথায় ? সে তো আর এক ইতিহাস।
____________________________

 

দেবব্রত তরফদার। দুই বাংলার হাজার হাজার পাঠক হৃদয় জয় করা লেখক। তিনি পেশায় একজন শিক্ষক। তার সদয় সম্মতিতে লেখা ডাক্তার প্রতিদিনেও প্রকাশ হচ্ছে।

আপনার মতামত দিন:


খেলা এর জনপ্রিয়