Ameen Qudir

Published:
2018-09-28 14:39:11 BdST

বাংলাদেশ ভারত ম্যাচে কি ফল হবে আজ : একটি নির্মোহ প্রেডিকশন


 

 


মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয়
____________________________

শুধুই আরেকটি ম্যাচমাত্র?

এশিয়া কাপের ফাইনাল শুক্রবার । বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি ম্যাচের আগের রাতেই প্রেডিকশন দেয়ার চর্চা করেছি এবার। ৩দিন মিলেছে, ১দিন মেলেনি। বাংলাদেশ ম্যাচ খেলেছে ৫টা, প্রেডিকশনের হিসাব দিচ্ছে ৪টা, আরেকটা গেলো কই?

ভারতের সাথেকার ম্যাচ নিয়ে কোনো প্রেডিকশন দিইনি। খেলা শুরুর আগেই যে ম্যাচের ফলাফল নিয়ে ৯৭% নিশ্চিত থাকা যায় সেই ম্যাচের প্রেডিকশনে আনন্দ কম পাই। কারণ বাংলাদেশ হারবে এটা প্রেডিক্ট করতে ইচ্ছা করে না।

ভারত ক্রিকেটখাতে কত বেশি নিবেদিতপ্রাণ এবং দূরদর্শী তাদের বর্তমান পাইপলাইনের অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়। ব্যাক আপ প্লেয়ার দিয়েই কমপক্ষে ২টা প্রফেশনাল দল সাজানো সম্ভব। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশ এখনো ২০-২১ জনের পুলের বাইরে কোনো খেলোয়াড় আনতে পারছে না যে কারণে খারাপ ফর্মের খেলোয়াড় আবারো ফেরত আসে তার জায়গায় সুযোগ পাওয়া জন অধিকতর খারাপ করায়। ক্রিকেট খেলাটা শুধুমাত্র ২ দলের ২২ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে হয় না, তাদের পূর্বসুরী-উত্তরসুরী ক্রিকেটার, অবকাঠামো, রাজনীতি-কূটনীতি প্রভৃতি প্রভাবকগুলোও সেখানে বিদ্যমান থাকে। রোহিত শর্মা যখন ব্যাট করে তাকে বলয় দেয় টেন্ডুলকার, আজহারউদ্দিন, ভেংসরকার, গাভাস্কার, হাজারে। বলয়ের অন্যপ্রান্তে থাকে লোকেশ রাহুল, রাইডুসহ আগামীদিনের ক্রিকেটাররা। তামিম যখন ব্যাট করে তার বাম বলয়ে আকরাম খান, বুলবুল, ফারুক, লিপু; ডান বলয়ে মমিনুল, মিথুন, শান্ত; শেষ। ফলে বাংলাদেশের পূর্ব অবিকশিত, উত্তরপ্রজন্ম বিনষ্ট। তামিম, মুশফিকদের প্রজন্ম অনেকটা ছিটমহলের মতো দাঁড়িয়ে আছে ঠাঁয়।।

যে কারণে বাংলাদেশ-ভারত যদি একে অপরের বিপক্ষে ১১ টা ম্যাচ খেললে ৮ বারই বিজয়ী দল হবে ভারত। পার্থক্যটা এতটাই বেশি। সাকিব- তামিম নেই একেও খুব বড় করে দেখতে চাই না। ওই দুজন নিয়েও খর্বশক্তির ভারতের বিপক্ষে পরাজয়ের দৃষ্টান্ত অহরহ। ফ্যাক্ট স্বীকার করায় লজ্জার কিছু দেখি না। কিন্তু যে ৩টা মাত্র ম্যাচে বাংলাদেশ জিততে পারে, সেই একটা হলোই বা কাল!

ক্রিকেট কি অংক মেনে চলে? হয়তো, হয়তো নয়। বাংলাদেশ প্রথমবার ভারতের বিপক্ষে জিতেছিলো ২০০৪ এ, পরের বার ২০০৭ এ, পরের বার ২০১২ তে, সর্বশেষ ২০১৫ তে। এরপরে মধ্যবর্তী ৩ বছরে একটি প্র‍্যাক্টিস ম্যাচসহ ৩ বার মুখোমুখি দুদল, প্রতিবারই বিধ্বস্ত হয়েছি আমরা। অবশ্য মাঝে ২টা নিশ্চিত জেতা টি২০ তে টেম্পারমেন্টহীনতায় হেরে গেছি আমরা।

৫ জয়ের সময়ক্রম হিসাব করলে ব্যবধান পাওয়া যায় ৩, ৫,৩ বছর। এই ক্রমধারা মানলে ২০২০ এর আগে কোনো ওয়ানডে ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে জেতার সম্ভাবনা থাকে না। কিন্তু ক্রিকেট খেলা তো খাতা- কলমে হয় না। তাই এই শিশুতোষ ধারাক্রমে না যাই।

ভারতের বিপক্ষে প্রথম ২টা জয়ই মাশরাফির একক এক্সিলিন্সের ফলাফল, ২০১২ এশিয়াকাপের জয়টি টিম এফোর্টের চূড়ান্ত পরাকাষ্ঠা, ২০১৫ এর টানা ২ জয় মুস্তাফিজের অতিমানবীয় পারফরম্যান্সের নমুনা। ফলে দল হিসেবে বাংলাদেশের সাফল্য মাত্র ১ বার!

এককালে ভারত ছিলো ব্যাটিংসর্বস্ব দল। আগে ব্যাট করে বড়ো স্কোর করতে হতো, তারপর শ্রীনাথ-প্রসাদ-কুম্বলেরা সেটা ডিফেন্ড করে ফেলতো; জহির খান- নেহরাদের যুগেও এই পরম্পরা জারি ছিলো। কিন্তু কোহলি আর ধোনি ভারতীয় ক্রিকেটের কালচারটাই বদলে দিয়েছে।

ভারতের এখনকার ম্যাচগুলো খেয়াল করলেই চোখে পড়বে, তারা চেজিংয়ে কতটা পারদর্শী হয়ে উঠেছে। টসে জিতলে তারা ফিল্ডিং নিবে, এরপর দুর্দান্ত কিছু ফিল্ডিংয়ে হাফ চান্সকে ফুল চান্স বানাবে, অতর্কিত রান আউট করে বসবে; দেখে মনে হবে না তাদের বোলাররা ত্রাস সৃষ্টি করেছে যেটা করতো ব্রেটলি-গিলেস্পি যুগের অস্ট্রেলিয়া, কিন্তু ক্রমাগত ডট বল দিতে দিতে তারা ব্যাটসম্যানের টেম্পারমেন্টের পরীক্ষা নিবে, এবং তাদের উইকেটগুলো দেখে মনে হবে ব্যাটসম্যান উইকেট গিফট করেছে। একারণে মুশফিক তাদের বিপক্ষে স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে টপ এজ করে, কিংবা রিভার্স সুইপে অন্য দলের বিপক্ষে চার পেলেও তাদের ক্ষেত্রে ক্যাচ দিয়ে ফেলে, মাহমুদুল্লাহ অন্যান্য ম্যাচে স্লগ করলেও তাদের বিপক্ষে মিসটাইম করে। এগুলো কি কাকতালীয়? বেশিরভাগ দলেরই এই অভিজ্ঞতা হয়।

২৫০ এর নিচে স্কোর রাখার পর তাদের দুই ওপেনার ঝড়োগতিতে শুরু করে, এরা না পারলে কোহলি৷ তারও নিচে ধোনি। ৪ জন একই ম্যাচে ব্যর্থ হয় সেই ঘটনা খুব বেশি ঘটে না। ফলে ম্যাচগুলো একপেশে লাগে।

কিন্তু দৃশ্যপট একটু বদলে ফেলা হোক, মানে ভারত আগে ব্যাটিং করুক। রান ডিফেন্ড করতে গেলে তখন আর তাদের বোলারদের বিধ্বংশী লাগে না। প্রতিপক্ষের প্রথম ১-২টা জুটি জমে যায়, যখনই মনে হতে থাকে ভারতের হারার সম্ভাবনা বাড়ছে তখনই খেলার ধারার বিপরীতে উইকেট পড়বে, এবং প্রতিপক্ষের ব্যাটিং কলাপ্স করবে। ভারতের সর্বশেষ ১৭টি ম্যাচ মনে করার চেষ্টা করুন, প্যাটার্নে মিল পাবেন। এটা কি দৈবযোগ?

একদমই না। তারা স্পোর্টস সাইকোলজি বোঝে, তাদের নার্ভ সিস্টেম অন্যদের চাইতে আলাদাভাবে কাজ করে। এগুলো ভাবা হয় না বলেই ভারতের ম্যাচগুলোতে বোলারদের কৃতিত্বের চাইতে বিপক্ষ দলের ব্যাটসম্যানদের সুইসাইডাল শট খেলাকে দায়ি করা হয়। কিংবা ব্যাটসম্যানদের স্কিলের চাইতে ফ্ল্যাট পিচের দোষকে সামনে আনা হয়।

২০১৫ তে ভারত সিরিজ হেরেছিলো কীভাবে? ম্যাচের প্রথম ১০ ওভারে তামিম আর সৌম্য এমন বেধড়ক পিটুনী শুরু করেছিলো, এই ট্রিটমেন্টের জন্য ভারতীয়দের কোনোরকম প্রস্তুতিই ছিলো না। ধাওয়ান-রোহিত শর্মা তখন যেভাবে খেলতো, এখনো সেরকমটাই আছে। তবে কোহলি হয়ে গেছে অতিমানব। তখনো পর্যন্ত অফস্ট্যাম্পের বেশ বাইরের বলে তাড়া করতে গিয়ে কট বিহাইন্ড হওয়াটা কিংবা স্পিন বলে কাট করতে গিয়ে ক্যাচ দেয়া তার ট্রেডমার্ক ডিসমিসাল ছিলো। সর্বশেষ কয়েক বছরে কোহলিকে এভাবে কেউ আউট হতে দেখেছেন?

কিন্তু বাংলাদেশ ২০১৫ থেকে খুব বেশি বদলায়নি। সৌম্য প্র‍্যাক্টিস করে কিনা সন্দেহ, ইনজুরিতে মুস্তাফিজের ক্যারিশমা হয়ে পড়েছে সীমিত, কেবলমাত্র মুশফিক ইনকামিং বলে বোল্ড হওয়ার প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে বিগ হিটিংয়ে পারদর্শীতা বাড়িয়েছে, মিরাজ দিনে দিনে অপরিহার্য হয়েছে।

এই যখন সমীকরণ তখন বাংলাদেশ কীভাবে জিতবে পথ খুঁজে পাচ্ছি না। আমাদের টপ অর্ডার বলতে কিচ্ছু নেই।১১ ওভারের আগেই ৩ উইকেট পড়ে যাওয়া নিয়ম। শ্রীলংকা বা পাকিস্তানের বিপক্ষে ধ্বস সামাল দেয়া গেছে, ভারতের বিপক্ষে কখনোই যাবে না।

অন্যদিকে পাকিস্তানের ভঙ্গুর ব্যাটিং লাইন আপ ৫ম বোলারের বড় পরীক্ষা না নিলেও ভারতের ব্যাটিং শুধু পরীক্ষাই নেবে না, রেকর্ড পরিমাণ নম্বরে ফেল করিয়ে দেবে।

সুতরাং, ভারতকে চেজ করতে দেয়া মানে বিপদ। তাই শুক্রবার মাশরাফির টসে জেতা এবং আগে ফিল্ডিং নেয়া জরুরী। মাশরাফির বোলিংয়ের যা লেন্থ ওটা রোহিত শর্মার জন্য আইডিয়াল পিকিং। পক্ষান্তরে মুস্তাফিজের বল খেলতে গিয়ে এইজ করার বহু দৃষ্টান্ত তার রয়েছে। সঙ্গে বাঁহাতি স্পিনার অপুকে দিয়ে বোলিং ওপেন করাতে হবে। একমাত্র তাহলেই যদি ওপেনিং জুটিকে দ্রুত ফেরানো সম্ভব হয়। ধাওয়ান অবশ্য মুস্তাফিজকে অবলীলায় খেলতে পারে। মাশরাফির লেন্থ তার জন্য সমস্যা ক্রিয়েট করে।
মিরাজকে রোহিত শর্মার সামনে এক্সপোজ না করাই সঙ্গত।

একাদশে তাই একটি পরিবর্তন অনিবার্য। সৌম্য বা মমিনুলের মধ্যে একজনকে বসিয়ে সেখানে অপুকে খেলাতে হবে। ৭ নম্বর ব্যাটসম্যানের কাজটা যদি মিরাজ করতে না পারে, অতিরিক্ত কাউকে খেলিয়েও লাভ হবে না বিশেষ। সেক্ষেত্রে মমিনুলের চাইতে সৌম্যকে বসানোই বেটার হবে। তার কনফিডেন্সহীনতা চরমে। তবে মমিনুলকে কেন কোচরা ওয়ানডেতে নিতে চায় না, গতকালকের আউটটাই সব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছে। লিটন যে বলে বোল্ড হয়েছে, ওই লেন্থের অন্তত ৭টি বল মুশফিক নির্বিঘ্নে ডিফেন্ড করেছে। এরকম স্ট্রেইট বলের লাইন মিস করলে তার ওয়ানডে ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবা উচিত। শুধু বাইক চালিয়ে শহর চক্কর দিলেই ব্যাটসম্যান হওয়া যায় না, বাইকের পেছনে স্পোর্টস কিটও রাখা উচিত যাতে বাইকযোগে দ্রুত প্র‍্যাক্টিসে পৌঁছানো যায়।

এগ্রেসিভ ব্যাটিংয়ের বিকল্প নেই। ভুবনেশ্বর আর বুমরাহকে দেখে খেললেই তারা পেয়ে বসে, কিন্তু ১টা-২টা চার হাকালেই তারা প্রসাদ- রবিন সিং মানের বোলার হয়ে যায়।

কিন্তু কে করবে সেই এগ্রেসিভ ব্যাটিং?

প্রেডিকশনের চাইতে প্রত্যাশা শব্দটা লিখি বরং, এটা আনন্দ বাড়াতে সহায়ক।
বাংলাদেশ শুক্রবার ৪ উইকেটে অথবা ২৩ রানে জিতুক। ম্যান অব দ্য ম্যাচ হোক মুস্তাফিজ অথবা মাহমুদুল্লাহ।

কাপ জয়ের চাইতেও এগ্রেসিভ ক্রিকেট দেখার ব্যাকুলতা বেশি কাজ করছে। বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের প্রতি ততটুকুই আস্থাশীল যতটুকু আস্থা ফরমালিনমুক্ত ফল পাওয়ার ব্যাপারে।

তবু ভারতের একটা মাত্র অফ ডে- ই বাংলাদেশকে হাসি তে হাস্যোচ্ছ্বল করতে পারে। হাসতে চাই, জিততে চাই। জিতলে গল্পসারথি টিমের সদস্য Mahmudul Hasan Sadi কে মিরিন্ডা ও ৩ কেজি ধুন্দল উপহার দেয়ার প্রতিশ্রুতি রইলো।

____________________________

 

মাহফুজ সিদ্দিকী হিমালয় । সুলেখক।

আপনার মতামত দিন:


খেলা এর জনপ্রিয়