Dr. Aminul Islam

Published:
2021-11-14 15:10:16 BdST

ডায়বেটিস এবং হাইপারটেনশন নিয়ন্ত্রণে করণীয়


লেখক

 

ডা. আজাদ হাসান
_____________________

আমাদের দেশে প্রতি বছর ব্যাপক সংখ্যক রোগী ডায়বেটিস এবং হাইপারটেনশনে আক্রান্ত হয়ে উক্ত রোগের কমপ্লিকেশনের কারণে অকালে মৃত্যু বরণ করেন। তাছাড়া অনেকে কর্মক্ষম মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়েন। একদিকে এসব রোগীরা উপার্জনহীন হয়ে পড়েন আবার অন্যদিকে এসব রোগীদের চিকিৎসার জন্য প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। এতে করে এই ব্যাপক জনগোষ্ঠী আমাদের অর্থনীতির উপর বিশাল বোঝা সৃষ্টি করে। উন্নয়ন পরিকল্পনাকে বাঁধাগ্রস্থ করে।

কিন্তু ব্যাপক জন সচেতনতা বৃদ্ধি ও
সময় মতো কতিপয় পদক্ষেপ নেয়ার মাধ্যমে এই দুটি রোগকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে দেশের অর্থনীতি ব্যাপক চাপ হতে মুক্তি পেতে পারে।

কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং শৃঙ্খলাবোধ মেনে ডায়বেটিস রোগটাকে একটা পর্যায় পর্যন্ত প্রতিরোধ করা যায়।
তবে যদি রোগ ধরা পড়ে তখন তাকে নিয়ন্ত্রণে রাখার চেষ্টা করতে হবে।
আর ডায়বেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারলে ডায়বেটিস জনিত কমপ্লিকেশন প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ডায়বেটিস সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে পাঠ্য পুস্তকে একটি টপিক যুক্ত করতে পারলে ভালো হয়।

একই কথা হাইপারটেনশন এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। আমরা যদি জনসচেতনতার মাধ্যমে জনগণের লাইফ স্টাইল বা জীবনাচারে পরিবর্তন আনতে সক্ষম হই তা হলে হাইপারটেনশনকেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং এই রোগীর জটিলতাও কমিয়ে আনা সম্ভব।

আমরা যখন নবীন চিকিৎসক হিসেবে সরকারী চাকুরীতে জয়েন করি, তখন সরকারী - ভাবে বেশ কিছু ক্লিনিক্যাল সাবজেক্টে "ন্যাশনাল গাইড লাইন" অনুযায়ী চিকিৎসা দেয়ার জন্য ট্রেনিং প্রাপ্ত হই। যেমনঃ
১) এআরআই।
২) ডায়রিয়া।
৩) ম্যালেরিয়া।
৪) টিবি ও ল্যাপ্রোসী।
৫) চাইল্ড ইমিউনাইজেশন।
৬) রেবিস
৭) এজমা ইত্যাদি।।
উল্লেখ্য, টিবি ও ল্যাপ্রোসী এবং ম্যালেরিয়া প্রকল্পের অধীনে ল্যাব. টেকনিশিয়ান -দেরও ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করা হয়।

কিন্ত দুঃখ জনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের একটা উল্লেখ যোগ্য সংখ্যক রোগী ডায়বেটিস এবং হাইপারটেনশন- এর মতো "নীরব ঘাতক" রোগে আক্রান্ত হয়ে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ধাবিত হলেও এই মরণ ব্যাধিকে নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারি পর্যায়ে তেমন কার্যক্রম চোখে পড়ে না।

এখন পর্যন্ত ডায়বেটিস রোগীদের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বারডেম এর কার্যক্রম প্রশংসনীয় তবে সেটাও শহর কেন্দ্রিক।
অথচ সরকার চাইলে অতি সহজে এই সব ক্রনিক ডিজিজ বা দীর্ঘস্থায়ী রোগ সম্পর্কে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী সম্পর্কেও সচেতনতা বৃদ্ধি করে এই রোগের চিকিৎসা এবং রোগ নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে কমপ্লিকেশন (জটিলতা) কমাতে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করণ সম্ভব।

ডায়বেটিস এবং হাইপার-টেনশন নিয়ন্ত্রণে সরকার যে সব কার্যক্রম গ্রহন করতে পারে সে সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করার চেষ্টা করছি।
প্রথমতঃ আমেরিকান ডায়বেটিস এসোসিয়েশন এবং ব্রিটিশ ডায়বেটিস এসোসিয়েশন এর আলোকে আমাদের দেশের এক্সপার্টদের সমন্বয়ে ডায়বেটিস-এর উপর একটি ন্যাশনাল গাইড লাইন তৈরী করতে হবে। সেই সাথে জেএনসি এবং নাইস গাইড লাইনের আলোকে আমাদের দেশের এক্সপার্টদের সমন্বয়ে হাইপার- টেনশনের উপরও একটি ন্যাশনাল গাইড লাইন তৈরী করতে হবে।

এরপর করণীয় হলো~
প্রতিটি উপজেলা হতে পর্যায়ক্রমে প্রত্যেক মেডিক্যাল অফিসার, নার্সিং স্টাফ এবং ল্যাব. টেকনিশিয়ানদের জন্য থিউরটিক্যাল, প্রাকটিক্যাল এবং স্ট্যাটেস্টিক-এর উপর ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ক্রনিক ডিজিজ (ডায়বেটিস এবং হাইপারটেনশন) রোগী রেজিষ্ট্রেশন করবে। ক্রনিক ডিজিজ রেজিষ্ট্রেশন করা রোগীদের একটি করে ক্রনিক ডিজিজ বই সরবরাহ করা হবে।
প্রতি ১ মাস অথবা ২ মাস পর পর রোগীরা হেলথ কমপ্লেক্সে নিয়মিত ফলোআপের জন্য আসবেেন।
প্রতিটি হেলথ কমপ্লেক্সে ক্রনিক ডিজিজের ঔষধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতিটি হেলথ কমপ্লেক্সের ল্যাবে ক্রনিক ডিজিজের জন্য রুটিন টেস্ট এর সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে।
প্রতি বছর প্রত্যেক রোগীর বাৎসরিক হেলথ চেকআপ-এর ব্যবস্থা করতে হবে। অথবা আর একটি কাজ করা যেতে পারে, তা হলো প্রতি ২ মাস অন্তর অন্তর এনুয়াল চেক-আপ এর পরীক্ষা হতে ২-৩টি করে টেস্ট করা, যাতে করে বছরে অন্ততঃ একবার শরীরের প্রয়োজনীয় নূন্যতম ইনভেস্টিগেশন গুলো কমপ্লিট হয়ে যায়।
হেলথ কমপ্লেক্স হতে ক্রনিক ডিজিজ-এর জন্য বিনা মূল্যে ঔষধ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে।
রোগীদেরকে স্বাস্থ্য সচেতন করতে এবং স্বাস্থ্য সম্মত ভাবে জীবন পরিচালনা করতে উদ্বুদ্ধ করতে "কাউন্সিলর" বা "হেলথ এডুকেটর" এপয়েন্ট করতে হবে।
রোগীদের বিষয়ে পরিসংখ্যান রাখার ব্যবস্থা করতে হবে।
ক্রনিক ডিজিজ-এর কার্ড দেখিয়ে উক্ত রোগী যে কোনো সরকারী হাসপাতাল বা হেলথ কমপ্লেক্স হতে ঔষধ যেনো পায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

আমরা যদি এভাবে ক্রনিক ডিজিজ নিয়ন্ত্রণের পদক্ষেপ নিতে পারি তাহলে এসব রোগের কমপ্লিকেশন কমানোর মাধ্যমে হাসপাতালের বেড অকুপেন্সি কমাতে পারবো, চিকিৎসা ব্যয় কমাতে সক্ষম হবো আর এর মাধ্যমে ডায়ালাইসিস এবং হার্ট ডিজিজ- এর রেগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হারে কমিয়ে আনতে সক্ষম হবো।।

আশা করি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনায় নিবেন।।

আপনার মতামত দিন:


প্রেসক্রিপশন এর জনপ্রিয়