Ameen Qudir

Published:
2020-01-09 18:32:39 BdST

ভাল ঘুমের জন্য এই পরামর্শগুলো মেনে চলুন


 

অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী
বাংলাদেশের স্বাস্থ্য সাহিত্যের পথিকৃৎ
___________________________

প্রতি রাতে একই সময়ে আমাদের ঘুম আসে, কিন্তু কেন? অ্যালার্ম দেওয়া নাই ঘড়িতে তবু সকালে একই সময়ে ঘুম ভাঙে। রাতে যদি আমরা না জাগি, ভ্রমণ করি নানা সময় অঞ্চল, তাহলে শরীর একটি সময়সূচি মেনে চলে সুনিদ্রার জন্য তা বড় প্রয়োজন।

ঘুমের সূচি ব্যক্তিবিশেষে হয় বিভিন্ন, পরিবেশ ও জীবনাচরণ অবশ্য প্রভাব ফেলে। কখন ঘড়িতে অ্যালার্ম দেওয়া হলো, দিনে কখন থাকি সবচেয়ে বেশি সক্রিয়, কখন আহার করি, কখন বালিশে মাথা ঠেকাই।


আমরা ঘুমের সূচিকে নিয়মিত নিয়মে আনতে পারি কিন্তু। দেহঘড়িকে পুনঃস্থাপিত করতে হবে। আমাদের দেহঘড়ি দৈনন্দিন ছন্দকে নিয়ন্ত্রণ করে: শারীরিক, মানসিক, আচরণগত ধরন, ঘুমের নমুনা, এগুলো নিয়ন্ত্রণ করে দেহতাপমান, হরমোননিঃসরণ, আলো অন্ধকার। (ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব হেলথ)।

দেহের ঘড়ি রয়েছে মগজের হাইপোথ্যালামাস অঞ্চলের একটি অংশ সুপ্রাকায়াজমাটিক নিউক্লিয়াসে, এটি চোখের রেটিনা থেকে আসা আলোকবার্তা গ্রহণ করে, এবং তা পাঠিয়ে দেয় মগজের অন্যান্য অঞ্চলে। এমনকি সেই গ্রন্থিতে যা ঘুমের সংকেতবাহী হরমোন ‘মেলাটনিন’ নিঃসরণ করে। নিদ্রা বিমানী রোসেলা জজুলা বলেন, ‘আলো দমন করে মেলাটনিন উৎপাদন, আর নিদ্রা আনয়নে মেলাটনিন সরাসরি যুক্ত।’

অর্থাৎ আলোক–সংকেত যা মগজে পাঠানো হয়, হোক না সূর্যালোক বা কম্পিউটার কিংবা সেলফোন স্ক্রিনের আলো, তা ঘুমের সূচির ওপর প্রভাব ফেলে।

কেন নিদ্রাসূচি পথহারা হয়ে যায়?

আমাদের নিদ্রাসূচি নিয়ন্ত্রণ করে দেহঘড়ি, এরা খুব আলো সংবেদী। দিনভর কতটুকু রোদের আলোর মুখোমুখি হলাম, কী ধরনের আলোর মুখোমুখি হলাম, রাতে সবই প্রভাব ফেলে নিদ্রাসূচির ওপর। এ ছাড়া নানা রকম সময় অঞ্চল অতিক্রম করা, রাতে স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে বেশি সময় জেগে থাকা আমাদের ঘুমের ধরনকে উল্টাপাল্টা করে দেয়।

যাঁরা পালা বা শিফট ধরে কাজ করেন, রাতভর যাঁরা কাজ করেন, যেমন ট্রাক ড্রাইভার, তাঁদের যথাযথ নিদ্রাসূচি মেনে চলা সম্ভব হয় না, ঘুমাতে সমস্যা হয়। কারণ, তাঁদের দেহঘড়ি বিভিন্ন সূচিতে চলে, যা শরীরের নিয়মের ব্যতিক্রম। দেহঘড়ি এমন বেনিয়মে চললে, ঘুমের সূচি এমন বদল হলে ভালো ঘুম আর হয় না। কালক্রমে এ থেকে ক্রনিক অনেক স্বাস্থ্য সমস্যার উদ্ভব হয়; ঘুম–বৈকল্য, স্থূলতা, ডায়াবেটিস, বিষণ্নতা আরও অনেক মানসিক অসুখ।

কী করে নিদ্রাসূচি পুনঃস্থাপন করা যায়?

এমন এক নিদ্রাসূচিতে আছেন, যা ঠিকঠাক কাজ করছে না। সকালে ঘুম থেকে ঠিক সময়ে ওঠা হচ্ছে না, রাতে দেরিতে ঘুম আসে, তাহলে? ঘুমের নমুনাকে ঠিক পথে আনতে আছে কিছু পরামর্শ।

• ঘুমানোর সময় মানানসই করতে হবে, হবে মনমতো, তবে ধৈর্য ধরতে হবে।

• রাতে আগে ঘুমানোর ইচ্ছা হলে, ঘুমানোর সময় ধীরে ধীরে এগিয়ে আনুন। একসময় কাঙ্ক্ষিত সময়ে পৌঁছে যাবেন। যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের নিদ্রা বিশেষজ্ঞ রাকেল প্যালেও বলেন, ‘পাঁচ মিনিট করে করে প্রতি দুই-তিন দিন করে এগিয়ে আনুন ঘুমাবার সময়, একসময় চলে আসবে কাঙ্ক্ষিত সময়।’

• ক্লান্তিবোধ করলেও দিবানিন্দ্রা নয়। দিবানিন্দ্রা করলে রাতে ঘুমের ব্যাঘাত হয়। প্যালে ওর পরামর্শ—দিনে ঘুম এলে ব্যায়াম করুন সে সময়। ব্যায়াম ঘুমের ভাবকে তাড়িয়ে নিয়ে যায় দূরে। তাহলে ঘুমের ইচ্ছাকে রাতের সূচিতে আনতে পারবেন।

একই সময় ঘুম একই সময় ওঠা

ঘুমের সূচি হবে অবিচল: মগজের ঘড়ি চায় নির্দেশ, জানতে চায় ঘুম থেকে ওঠার কাঙ্ক্ষিত সময় কখন। মগজ চায় প্রতিদিন একই সময় ঘুম থেকে উঠবেন। সপ্তাহান্তে ছুটির দিনে এলোমেলো ঘুম বা নানা সময় অঞ্চল ভ্রমণ করা মগজের কাছে অপরিচিত। এভাবে ঘুমের সূচিতে ঘটে ব্যতিক্রম।

ঘুমের সূচিতে লেগে থাকবেন কঠোর নিয়মে

একসময় যখন নির্ধারিত ঘুমের সূচি মানে, ঘুমাতে যাওয়া আর ঘুম থেকে ওঠা নিয়মে পৌঁছাবে, তখন এ থেকে বিচ্যুৎ হওয়া যাবে না। এমনকি এক রাতে দেরিতে ঘুমালেও সব বিশৃঙ্খল হয়ে যেতে পারে।

ঘুমানোর আগে আগে আলোর মুখোমুখি নয়

গবেষকেরা দেখেছেন, সন্ধ্যার আলোর মুখোমুখি হলে নিদ্রাসূচি পিছিয়ে দেয় দেহঘড়ি। ঘুমানোর সময়ে আগে আগে ঘরে আলো কমিয়ে আনুন, থাকুক ম্লান আলো, নয়তো আবছা অন্ধকার তাহলে ঘুম আসে সময়মতো। যদি আগে ঘুমাতে চান তাহলে ঘুমানোর সময়ের আগে উম্বল আলো, বা‌ইরের আলো এড়িয়ে যান (সেলফোন, ল্যাপটপ, টিভি পর্দার আলো) আর রাতে চারপাশে থাক ম্লান আলো।

ঘুমের সময়ের আগে আগে আহার বা ব্যায়াম করা এড়িয়ে যান। ব্যায়াম আমাদের জাগ্রত করে। খাদ্য দেয় বুকজ্বালা, এতে ঘুম আসে না। ধূমপান, চা পান, কফি পান করবে জাগরণে যায় বিভাবরী।

ঘুমের মেজাজ আনুন

রচনা করুন শুয়ে যাওয়ার শিথিল হওয়ার চর্চা। নিন উষ্ণধারা জলে স্নান, সঙ্গে গুনগুনানি স্নানঘরে। বাজুক প্রিয় যন্ত্রসংগীত। শয্যা যেন হয় আরামের, ঘর অন্ধকার, তাপমান এত উষ্ণ নয়। ঘুমের দিকে মন যেন যায়, ঘুম যেন না হয় ক্লান্তিকর কাজ।

মেলাটনিন ব্যবহার করা যেতে পারে, চিকিসৎকের পরামর্শে অবশ্যই। মেলাটনিন সাপ্লিমেন্টে কারও কারও জন্য উপকারী হতে পারে, তবে তা হবে চিকিসৎকের পরামর্শে।

দেহ ছন্দ আনতে লাইট থেরাপি

উজ্জ্বল আলো থেরাপি বা সকালে কিছু সময় উজ্জ্বল আলোর মুখোমুখি হলে, ঘুম থেকে ওঠার পরপরই গায়ে লাগান রোদের আলো। মগজ বুঝবে, ‘ভোর হলো, তাই ঘুম থেকে ওঠার সময় হলো’।

চিকিসৎক ও নিদ্রাবিশেষজ্ঞের দর্শন

ঘুমের সূচিকে পোষ মানাতে পারছেন না? এসব চর্চা আর নিয়ম মেনেও হচ্ছে না? হলো না ঠিকমত ঘুম ও জাগা, তাহলে যাবেন চিকিৎসকের কাছে অবশ্যই।

সময় অঞ্চল অতিক্রম করলে, নিদ্রাসূচি ফিরিয়ে আনতে হলে লাগে এক-দুই দিন। তবে খুব দূরের ভ্রমণ হলে, কারও লেগে যায় সপ্তা দুয়েক। শৃঙ্খলা মেনে চর্চা করলে ঘুম আসবে, জেগে ওঠা হবে নিয়মমতো। এই নিয়ে মন খারাপ নয়, ক্রমে ক্রমে ঘুম আসবেই চুপি চুপি।

অধ্যাপক ডা. শুভাগত চৌধুরী

 

আপনার মতামত দিন:


প্রেসক্রিপশন এর জনপ্রিয়